মোঃ আবদুল আলীমঃ
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবর্তে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদেরকে জিম্মি করে এক ধরনের দূর্বিত্তায়ন চলছে। ঢাকা মহানগরির যাত্রাবাড়ি থানাধীন শহীদ জিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ তার অন্যতম উদাহারন। অভিযোগ রয়েছে অধ্যক্ষ ফাতেমা রশিদ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে হাত করে তার একক ক্ষমতা বিস্তার করে চলছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়। এসব অভিযোগের মধ্যে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা আবেদনপত্র জমা দেয়ার শেষ তারিখের আগেই যোগদান করা, স্কুল সংলগ্ন দেয়াল ঘেঁষে ৪ টি দোকান নির্মান করে দেকানগুলো থেকে প্রতি মাসে প্রচুর টাকা হাতিয়ে নেয়া, দোকান নির্মান বাবদ কলেজ তহবিল থেকে টাকা উত্তোলন করে খরচের ভাউচার কলেজ কর্তৃপক্ষকে জমা না দেয়া, ছাত্রীদের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করে তা কলেজ ফান্ডে জমা না করে আত্মসাৎ করা, তার স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপকর্মের বিরুদ্ধে একটি শব্দ পর্যন্ত কোন শিক্ষক উচ্চারন করলে তাকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা, যেসব শিক্ষক দেড় বছর ধরে বেতন পাচ্ছে না তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ে নিশ্চুপ থাকা, গাড়ি ক্রয় করে ক্রয় মূল্যের চেয়ে কয়েক গুন মূল্য দেখিয়ে কলেজ ফান্ড থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়া, ছাত্রীদের ক্লাসরুম ভেঙে নিজের কামরা সম্প্রসারন করে সেখানে হাই কমোড বসানো ও এয়ার ফ্রেসনার লাগানো, ছাত্রীদের টয়লেট ব্যবহারের অনুপযোগি করে রাখা, ছাত্রী ও অভিভাবকদের সাথে কোন প্রকার সাক্ষাৎ না দিয়ে হয়রানি করা, গণমাধ্যম কর্মীদেরকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো অন্যতম। ইতিমধ্যে তার বিশালাকারের অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিবাদ করতে গিয়ে বেশ কয়েকজন শিক্ষক অন্যায়ভাবে বরখাস্ত হয়েছেন ও লাঞ্চিত হয়েছেন বলে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। সর্বপ্রথম তিনি স্কুল শাখায় ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন ০১-১১-৯৩ ইং তারিখে। তার বিরুদ্ধে উথ্যাপিত অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দৈনিক পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ি আবেদনপত্র জমা দেয়ার শেষ তারিখের আগেই প্রভাষক পদে যোগদান করা। আভিযোগ থেকে দেখা যায় ০১-১১-৯৪ ইং তারিখে দৈনিক ইনকিলাবে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। বিজ্ঞাপনে উল্লেখ ১০-১১-৯৪ ইং এর মধ্যে আবেদনপত্র সভাপতির নিকট পৌঁছতে হবে। অথচ তিনি ০৩-১১-৯৪ ইং তারিখে যোগদান করেন প্রভাষক, ইসলামি শিক্ষা হিসেবে। অর্থাৎ আবেদনপত্র জামা দেয়ার শেষ তারিখের আগেই তিনি যোগদান করেন। অভিযোগে আরও জানা যায় ১০-১০-১৬ ইং তারিখে দৈনিক নয়া দিগন্তে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয় অধ্যক্ষ পদে নিয়োগের জন্য। নভেম্বর/২০১৬ ইং তারিখে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। তখনও তিনি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পদে বহাল। ২৫-১১-১৬ ইং তারিখে অধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন। তদন্তে দেখা যায় যে, তিনি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পদে থাকা অবস্থায় অধ্যক্ষ পদের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেন, তিনিই আবার অধ্যক্ষ পদে পরীক্ষা দেন ও তিনিই অধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন যা রুপকথার গল্পের মত। অর্থাৎ তিনি গোটা নিয়োগ প্রক্রিয়া এককভাবে পরিচালনা করেন। তিনি ৫ লাখ টাকা দিয়ে স্কুলের জন্য প্রাইভেট কার ক্রয় করেন যার নম্বর ঢাকা মেট্রো-চ-৫৩-২৭১৯। গাড়িটির মূল্য ১৬ লাখ টাকা দেখিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়েছেন। গাড়িটি ব্যক্তিগত কাজে কিছুদিন ব্যবহার করার পর পরিত্যাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। অধ্যক্ষ ফাতেমা রশিদ স্কুল ভবন সংলগ্ন ৪ টি দোকান নির্মান করে প্রতি মাসে ভাড়া বাবদ হাজার হাজার টাকা তুলে নিচ্ছেন। ভাড়ার টাকা কলেজ তহবিলে জমা হচ্ছে না। দোকান নির্মান বাবদ কলেজ তহবিল থেকে ১৫ লাখ টাকা উত্তোলন করেন বলে সূত্রে জানা গেছে যার কোন ভাউচার অদ্যাবধি প্রতিষ্ঠানে জমা হয়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শিক্ষক এ প্রতিবেদককে জানান ফাতেমা রশিদ ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে শাহীন আসমা নামে একজন সহকারী শিক্ষককে সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদে নিয়োগ দেন। উল্লেখ্য শাহীন আসমা সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে অক্টোবর/২০১৬ পর্যন্ত সরকারী বেতন উত্তোলন করেন। আবার নভেম্বর/২০১৬ তে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে বকেয়া বেতন সহ ১ লাখ ৮৫ হাজার সাত শত ছয় টাকা উত্তোলন করেন যাতে অধ্যক্ষ ফাতেমা রশিদ পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতা করেন। বিষয়টি নভেম্বর/২০১৬ এর বেতন স্টেটম্যান্ট থেকে প্রতিয়মান হয়। ২০১৬ সালের বেতন স্টেটম্যান্ট থেকে দেখা যায় ফাতেমা রশিদ কলেজ থেকে প্রতি মাসে ৩০, ২৫৬ টাকা এবং এমপিও থেকে প্রতি মাসে ৩৪, ৮৭০ টাকা সহ মোট ৬৫, ১২৬ টাকা উত্তোলন করেন। আরও অভিযোগ রয়েছে তিনি কলেজের ইসলামী শিক্ষার প্রভাষক হিসেবে কলেজ থেকে অন্যান্য প্রভাষকদের মত প্রতি মাসে বেতন নেন যার পরিমান ১৪ হাজার টাকা। অথচ তিনি ইসলামী শিক্ষার কোন ক্লাস সপ্তাহে একদিনও নেন না। বরং ঐ পদে অন্য একজন শিক্ষক দিয়ে ক্লাস পরিচালনা করেন। কলেজ সূত্রে আরও জানা গেছে তিনি সপ্তাহে দুদিনের বেশি কলেজে আসেন না। অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারনে ছাত্রীর সংখ্যা কমতে কমতে বর্তমানে প্রায় ৪ শতের মতো দাঁড়িয়েছে। এ ধ্বসের পেছনে রয়েছে ফাতেমা রশিদের লাগামহীন স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতি। তার বিরুদ্ধে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব সহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে ভুক্তভোগীরা লিখিত অভিযোগ প্রদান করেন। এসব অভিযোগের ব্যাপারে এ প্রতিবেদক তার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি স্বাক্ষাতে কথা বলতে বলেন। তার সাথে কলেজে গিয়ে স্বাক্ষাতে কথা বলতে গেলে তিনি দাপটের সাথে বলেন অনেক সংবাদকর্মী এসেছিল তার সাথে এ ব্যাপারে কথা বলতে। তিনি কোন সাংবাদিককে পাত্তা দেন নাই। তার বিরদ্ধে অভিযোগের ব্যপারে কথা বললে তিনি বলেন সব অভিযোগই মিথ্যা। এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন তার বিরুদ্ধে কেউ কোথাও অভিযোগ করেননি। অধ্যক্ষ ফাতেমা রশিদের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারনে অভিভাবকসহ এলাকাবাসীও অতিষ্ট। এ ব্যপারে ঢাকা দক্ষিন সিটি করপোরেশনের ৪৮ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবুল কালাম অনুর সাথে যোগাযোগ করলে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, অধ্যক্ষ ফাতেমা রশিদের বিরুদ্ধে উথ্যাপিত অভিযোগগুলো সবই সঠিক। ওয়ার্ড কাউন্সিলর আরও বলেন তার বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়। এসব অভিযোগের সঠিক তদন্ত হলে তিনি উক্ত পদে থাকতে পারবেন না। অধ্যক্ষ ফাতেমা রশিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে অপরাধ বিচিত্রার তদন্ত অব্যহত আছে। আগামি সংখ্যায় এ ব্যপারে আরও বিস্তারিত থাকছে। (চলবে)
