হাবিব সরোয়ার আজাদ
সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের সীমান্তনদী জাদুকাঁটা ও মাহারাম নদীর তীর কেঁটে এবং নদী দু’টিতে অবৈধ এবং অপরিকল্পিত ভাবে ড্রেজার, সেইভ বোমা মেশিন দিয়ে পুকুর-খাল তৈরী করে বালি-পাথর লুটের মহোৎসব চলছে। এ মহোৎসব বন্ধে ও উপজেলার ২৩ বোরো ফসলী হাওরের ধান রক্ষায় উপজেলা প্রশাসন ঢাক ঢোল পিঠিয়ে মঙ্গলবার এক গণসমাবেশের আয়োজন করলেও মূলত ভেস্তে গেছে সেই উদ্যোগ। অভিযোগ উঠেছে সরকার দলীয় সাবেক এক ইউপি চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্য এ দু’জনের প্রকাশ্য মদদ ও উস্কানিতে বুধবার থেকে প্রতিদিন কোটি টাকার বালি পাথর লুটের মহোৎসব ফের চলছে । বালি পাথর লুটের মহোৎসব ঠেকাতে উপজেলা প্রশাসন এমনকি থানা পুলিশও অনেকটা নির্বিকার।
উপজেলা প্রশাসন , থানা পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, শ্রমিক ও উপজেলা আ’লীগ বিএনপির নেতৃবৃন্ধ সহ সর্বস্থরের জনগণের অংশগ্রহনে উপজেলা ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী অফিসার মো: রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে গত মঙ্গলবার বিকেলে মাহারাম ও জাদুকাঁটা নদীর তীরে গণসমাবেশ বক্তারা অভিযোগ করেন বর্তমান সরকাররে দু মেয়াদে প্রভাবখাঁটিয়ে গত ৬ থেকে ৭ বছরেরও বেশী সময় ধরে বালি পাথর খেঁকো একাধিক চক্র সিন্ডিক্যাট তৈরী করে জাদুকাঁটা, বড়টেক এলাকা, মাহারাম নদীতে নিজেদের মালিকানা দাবি করে নদীর তীর কেঁটে , নদীতে একাধিক পুকুর, খাল তৈরী করে ড্রেজার, সেইভ ও বোমা মেশিন দ্বারা প্রতিদিন কোটি টাকার বালি পাথর লুট করে বালি পাথর বিক্রি ও চাঁদাবাজি করে আসছেন। ঐ চক্রটির কারনে নদীতে প্রায় ২০ হাজার সাধারন শ্রমিক বেলচা. বালতি ও হাতের দ্বারা বালি পাথর উক্তোলন করতে গিয়ে অসংখ্য বার হামলার শিকার হয়েছেন। বক্তারা আরো বলেন অপরিকল্পিত ভাবে কিছু সংখ্যক চাঁদাবাজ চক্রের কারনে উভয় নদীর আকার বড় হয়ে ঘেছে , নদীর তীরবর্তী কয়েকটি গ্রাম , রাস্তাঘাট, স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে, ছোট হয়ে গেছে এলাকার আবাদী জমি, আদর্শগ্রাম ও বড়টেক এলাকা। এসব কারনে পাহাড়ি ঢল ও আগাম বন্যায় উপজেলার ২৩টি বোরো ফসলী হাওরের ধান বিগত দিনে তলিয়ে গিয়ে প্রায় হাজার কোটি টাকার ফসলহানি ঘটেছে, নি:স্ব হয়েছে উপজেলার ছোট বড় অর্ধলক্ষাধিক কৃষক পরিবার। নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহের পথ বন্ধ হয়ে গিয়ে পরিবেশ বিপর্য়য় ঘটেছে। বক্তারা নদীর সীমানা চিহ্নিত করণ, নদীতে অবৈধ সেইভ. ড্রেজার , বোমা মেশিন সহ সব ধরণের যান্ত্রিক ব্যবহারের মাধ্যমে বালিপাথর উক্তোলন বন্ধে ও চাঁদাবাজ চক্রের সদস্যদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের প্রতি দাবি জানান। সমাবেশে প্রায় দু,সহ¯্রাধিক লোকজন উপস্থিত ছিলেন। উপজেলা প্রশাসন. থানা পুলিশ ও জনপ্রতিনিধিরা আশ্বস্থ করেছিলেন পরদিন বুধবার থেকে দু’ নদীতে কোন প্রকার তীর কাটা, বোমা, সেইভ, ও ড্রেজার মেশিন দ্বারা বালি পাথর উক্তোলন বন্ধে ও জমির মালিকানা দাবি করে যারাই চাঁদাবাজি করুক না কেন তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে, এমনকি সাধারণ শ্রমিকরা সীমানা চিহ্নিত করে দেয়ার পর পুর্বের ন্যায় হাতে বালি -পাথর উক্তোলন করতে পারবেন। ওই দিন সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান, থানার ওসি মো: শহীদুল্লাহ, উপজেলা আ’লীগের সভাপতি আবুল হোসেন খাঁ, বড়দল উওর ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কাসেম, বড়দল দক্ষিণ ইউপি চেয়ারম্যান আজাহার আলী, শ্রীপুর উওর ইউপি চেয়ারম্যান খসরুল আলম, বাদাঘাট ইউপি চেয়ারম্যান আফতাব উদ্দিন, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিন, উপজেলা আ’লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক মোশারফ হোসেন, আ’লীগ নেতা সুজাত মিয়া, মজিবুর রহমান, প্রমুখ। এর আগে শনিবার ভ্রাম্যমাণ আদালত দু’নদীতে অভিযানে নেমে প্রায় ১৫ লাখ টাকার বোমা, সেইভ ও ড্রেজার মেশিনের সরঞ্জামাধী পুড়িয়ে ফেলেন।
ফের তৎপর চাঁদাবাজ চক্র: মাহারাম ও জাদুকাঁটা নদীর তীর কেঁটে নদীর চরে নিজেদের জমির মালিকানা দাবি করে আসা বালি-পাথর খেঁকো যে চক্রটি বিগত কয়েক বছর ধরে অবৈধভাবে ড্রেজার, সেইভ , বোমা মেশিন ও কোয়ারী তৈরীর নামে নদীর ভেতর পুকুর, খাল খনন, মৃত্যুকূপ তৈরী করে কোটিপতি বনে গেছেন সেই চক্রের সরকার দলীয় কয়েক সদস্য সমাবেশে শ্রমিক স্বার্থের অজুহাত তুলে পুরনো কায়দায় ফের বালি পাথর লুটের জন্য বক্তব্য দিতে গেলে তারা গণরোশের শিকারের আংশকায় ওই দিন বক্তব্য প্রদানে বিরত থাকতে বাধ্য হন। পরদিন ওই চক্র নদীতে ফের পুরনো অপকর্ম চালিয়ে দিনভর কোটি টাকার বালি পাথর লুটের মহোৎসব চালিয়ে গেছেন। পুলিশ বালি পাথর লুটের মহোৎসব ঠেকাতে গেলেও কার্যত নিষ্পল হয়ে ফিরে আসে। বুধবার রাতে সরকার দলীয় সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিনের বাড়িতে বালি পাথর লুটের সুবিধাভোগী দু’ থেকে আড়াইশ সেইভ ড্রেজার, বোমা মেশিনের মালিক স্থানীয় ইউপি সদস্য নোয়াজ আলীকে নিয়ে গোপন বৈঠক করেন। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই ওই দু’ নদীতে ফের বালি পাথর লুটের মহোৎসব চললেও পুলিশ নদীতেই নামতে পারেনি।
গোপন বৈঠকের কথা জানতে চাইলে উপজেলার বড়দল উওর ইউনিয়েনের ৪নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সাবেক বিএনপি নেতা ও বর্তমানে নব্য আ’লীগ নেতা নোয়াজ আলী (০১৭১৩৮৬১১৭৮) বৃহস্পতিবার বলেন, আমি রাতে বৈঠকে ছিলাম না এলাকার শ -দেড়’শ লোক সাবেক চেয়ারম্যানের বাড়িতে গেছিন কেমনে তারা নদীতে কাম কাজ কইরা খাইত এই পরামর্শ নেয়ার লাগি।
সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আ’লীগের সাধারন সম্পাদক জামাল উদ্দিনের (০১৭১১০৩৫৩৮৫) নিকট বৃহস্পতিবার বৈঠক ও নদীতে সেইভ, ড্রেজার বোমা মেশিন দ্বারা বালি পাথর লুটের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন , এলাকার কিছু লোকজন বুধবার রাতে আমার কাছে আইছিলো পরামর্শ নেয়ার জন্য। নদীতে সেইভ বোমা ড্রেজার মেশিন দ্বারা বালি পাথর লুট বন্ধ করা ও ২৩ হাওরের বোরো ফসল হুমকির মুখে পড়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমি কোন বক্তব্য দিবনা, এটা কী নিউজের বিষয় কিনা তিনি পাল্টা প্রশ্ন করে উওর দেয়ার পূর্বেই মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
