স্টাফ রিপোর্টার ঃ শনিবার বেলা পৌনে তিনটা। রাজধানীর পূর্বাঞ্চলীয় এলাকা কদমতলা পানির পা¤প। হাঁড়ি, কলসি, বোতল হাতে নারী-পুরুষের ভিড়। এঁদের দলে হঠাৎ যোগ দিল সাত বছরের শিশু নির্ঝর। তার হাতেও বোতল। নির্ঝর জানায়, স্কুল ছুটি শেষে মায়ের সঙ্গে সরাসরি সে এখানে এসেছে। প্রতিদিন আসে। কারণ, তাদের বাসায় পানি নেই। কদমতলার মতো রাজধানীর মিরপুরের ইব্রাহিমপুর, বউবাজার, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের অ্যাপার্টমেন্ট এলাকা, মোহাম্মদপুরের শেখেরটেক, কাঁঠালবাগান ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, পুরান ঢাকার গোপীবাগ, শাঁখারীবাজার, পানিটোলা, রাজার দেউড়ি, পূর্বাঞ্চলীয় এলাকার মুগদাসহ অনেক এলাকাতেই নিয়মিত পানির সংকট চলছে। এমনকি অভিজাত এলাকা বলে পরিচিত ধানমন্ডিরও অনেক এলাকায় গত এপ্রিল থেকে নিয়মিত পানির আকাল। এসব এলাকায় ঢাকা ওয়াসার গভীর নলকূপ সচল বা বিকল যা-ই থাকুক, পানির সমস্যা থাকেই। এসব স্থানে পানির পা¤েপ গ্রাহকদের প্রতিনিধিদের লম্বা লাইন দিতে হয়। সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, বাস্তবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পানির সংকট রয়েছে। তবে ঢাকা ওয়াসার দাবি, রাজধানীতে পানির কোনো সংকট নেই। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে সায়েদাবাদ পানি শোধনাগারের দ্বিতীয় পর্ব চালুর পর থেকে ওয়াসা এই দাবি করে আসছে। শোধনাগারের প্রথম পর্ব থেকে প্রতিদিন সাড়ে ২২ কোটি লিটার পানি উৎপাদিত হতো। দ্বিতীয় পর্ব চালুর পর যোগ হয় আরও সাড়ে ২২ কোটি লিটার। এতে শোধনাগারের উৎপাদন দাঁড়ায় প্রতিদিন ৪৫ কোটি লিটার। শোধনাগারের এই পানিসহ এখন গভীর নলকূপ ও অন্য উৎস থেকে প্রতিদিন মোট ২৪২ কোটি লিটার পানি উৎপাদিত হচ্ছে। ওয়াসার হিসাবে ঢাকায় রোজ পানির চাহিদা ২২৫ কোটি লিটার। তাদের দাবি, চাহিদার তুলনায় ১৭ কোটি লিটার বেশি পানি তারা উৎপাদন করছে।
১০ আগস্ট সাংবাদিকদের সঙ্গে ঢাকা ওয়াসার মতবিনিময় সভায় ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান দাবি করেন, কিছু পকেট এলাকা ছাড়া রাজধানীতে পানির কোনো সংকট নেই। গতকাল শনিবার ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এডিএম কামরুল আলম চৌধুরী বলেন, ওয়াসা চাহিদার চেয়ে উদ্বৃত্ত পানি উৎপাদন করলেও পুরোপুরি বিতরণ করা যায় না। হঠাৎ করে কোথাও কোনো গভীর নলকূপ বিকল হলে সমস্যা হয়। বর্তমানে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে পানির নতুন লাইন বসানোর গর্ত খোঁড়ার কারণে পাইপ ফেটেও সরবরাহে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। ওয়াসা যে প্রতিদিন ২৪২ কোটি লিটার পানি উৎপাদন করে, তাও পুরোপুরি সত্য নয়। বর্তমানে ওয়াসার ৭১০টি গভীর নলকূপ রয়েছে। ওয়াসারই দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীতে প্রতিদিন ঢাকা ওয়াসার অন্তত ১০টি গভীর নলকূপ যান্ত্রিক ও কারিগরি সমস্যার কারণে বন্ধ থাকছে। একটি নলকূপ থেকে প্রতি মিনিটে তিন হাজার লিটার পানি উৎপাদন হয়। গরমের মৌসুমে একটি নলকূপ প্রতিদিন গড়ে ১৫ ঘণ্টা থেকে ১৮ ঘণ্টা চলে। সেদিক থেকে ১০টি নলকূপ অচল হলে প্রতিদিন কম-বেশি তিন কোটি লিটার পানি উৎপাদন কম হয়। সায়েদাবাদ দ্বিতীয় পর্যায়ের শোধনাগার নির্মাণের কারণে রাজধানীর পানির সংকট শেষ হয়ে গেছে বলা হলেও সব স্থানে এই পানি যায় না। কারণ, এর জন্য পানি সরবরাহের নতুন পাইপলাইন বসানো হয় মাত্র ১০ কিলোমিটার। এসব লাইন রয়েছে রাসেল স্কয়ার থেকে কল্যাণপুর টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট, তেজগাঁও ও রামপুরায়। কল্যাণপুরের পাইপলাইনের সঙ্গে মিরপুর বাঙলা কলেজের পাইপলাইন যুক্ত করে দেওয়ায় এখন মিরপুর ১-এর কিছু এলাকায় পানি যাচ্ছে। গুলশানের কিছু এলাকায় পানি যায়। কিন্তু মিরপুরের ২ থেকে ১৪ নম্বর, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া কোথাও এই পানি সরবরাহ হচ্ছে না। উত্তরায়ও যাচ্ছে না। এসব এলাকা গভীর নলকূপের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে ২০০২ সালে সায়েদাবাদ শোধনাগারের প্রথম পর্ব চালুর পর পূর্বাঞ্চলীয় কিছু এলাকা, জুরাইন, পোস্তগোলা, নাজিমউদ্দিন রোড, লালবাগের কিছু অংশ, ঢাকেশ্বরী রোড ও বকশীবাজারে পানি যায়। ওয়াসার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, ওয়াসা এলাকায় পানির চাহিদা নিরূপণ হয় প্রায় পৌনে চার লাখ গ্রাহকের ওপর ভিত্তি করে। গ্রাহকসংখ্যা তৈরি হয় এক একটি বাড়ির ভিত্তিতে। কিন্তু একটি অ্যাপার্টমেন্টে যে ২০টি ফ্ল্যাট থাকে এবং ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের পানির চাহিদা থাকে, ওয়াসা তা বিবেচনা করে না। পানির সংকট নেই বলা হলেও গোপীবাগ, রামকৃষ্ণ মিশন রোড, অভয় দাস লেন, পেয়াদাপাড়া এলাকার বাসিন্দারা ঘর থেকে বেরোবার সময় হাতে খালি বোতল বা কলস হাতে নিয়ে বের হন, বলে জানা যায়। বিশেষ করে গোপীবাগ ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের বিপরীত দিকে অবস্থিত পেয়াদাপাড়া এলাকার প্রতিটি ঘরের মানুষকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে ঢাকা রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন এবং বালুর মাঠ পা¤প থেকে। গতকাল বিকেল সাড়ে চারটায় রামকৃষ্ণ মিশনে গিয়ে দেখা যায়, প্রবেশপথের ঠিক পশ্চিমে স্থাপিত কল থেকে পানি সংগ্রহে ভিড় করেছে নারী-পুরুষ শিশু-কিশোর। পানি সংগ্রহ চলছে কলসি, বালতি, রাসায়নিক রাখার ব্যবহারিক পাত্র ও জারিকেনে। অনেকের হাতে এক বা দুই লিটারের ক্যান। দেখা গেল কেউ কেউ রিকশা ভ্যানে, এমনকি ব্যক্তিগত গাড়িতে করেও পানি নিয়ে যাচ্ছেন। বালুর মাঠ পানির পা¤েপ আরও বেশি ভিড়। পা¤প অপারেটর মো. ফোরকান জানান, গভীর রাতেও এখান থেকে এলাকাবাসী পানি সংগ্রহ করেন। রাজারবাগ পুলিশ লাইনস পা¤েপও গভীর রাতে পানি সংগ্রহের জন্য এলাকাবাসী ভিড় করেন। একই অবস্থা সিদ্ধেশ্বরী রোড ও লেনের পানির পা¤েপ।
