নিজস্ব প্রতিবেদক ঃ
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে রেজিস্ট্রেশন রিপ্লেস, সার্টিফিকেট জালিয়াতি, কেন্দ্র প্রদান, পরীক্ষা না দিয়েই পাস, মাস্টার রোলে কর্মী নিয়োগ ও স্থায়ী নিয়োগ নিয়ে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এসব দুর্নীতির সঙ্গে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সচিব (যুগ্ম সচিব) মোঃ নায়েব আলী মন্ডল ও তার আশীর্বাদপুষ্ট গুটিকয়েক কর্মকর্তা-কর্মচারী সিন্ডিকেটের সম্পৃক্ততার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, নায়েব আলী মন্ডল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একজন সক্রিয় সমর্থক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জসীমউদ্দীন হলে থাকাকালীন তিনি ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত মতিউর রহমান নিজামীর গ্রামের বাড়ি আর নায়েব আলী মন্ডলের গ্রামের বাড়ি পাবনার বেড়া উপজেলায় হওয়ায় নিজামী ছিলেন নায়েব আলী মন্ডলের গডফাদার। নিজামী মন্ত্রী থাকা অবস্থায় নায়েব আলী যখন যে দপ্তরে কর্মরত ছিলেন, সে দপ্তরের সকল নিয়োগ প্রক্রিয়ায় তিনি হস্তক্ষেপ করতেন। নিজামী ও নায়েব আলী মন্ডলের যৌথ প্রচেষ্টায় তখন যত নিয়োগ হয়েছে তার ৯৫ শতাংশই পূরণ করা হয়েছে ছাত্রশিবিরের ক্যাডারদের মধ্য থেকে। নিজামীর ফাঁসি হয়ে যাওয়ার পর নায়েব আলী মন্ডল এখন একাই এই দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের আওতাধীন কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে এ পর্যন্ত মাস্টাররোলে যত নিয়োগ হয়েছে, তাদের অর্ধেকেরও বেশি জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। মাস্টাররোলে কাজ করা এই শিবির ক্যাডারদেরই এখন স্থায়ী নিয়োগ দেয়ার প্রক্রিয়া চালাচ্ছেন নায়েব আলী মন্ডল ও তার আস্থাভাজন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অভিযোগ রয়েছে, নায়েব আলী মন্ডল কর্তৃক নিয়োগকৃত মাস্টাররোলে কর্মরতদের স্থায়ীকরণের লক্ষ্যে চলতি মাসে যে নিয়োগ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে যাচ্ছেন তাদের দু-এক জন বাদে সবাই জামায়াত-শিবিরের সক্রিয় কর্মী ও নেতা।
স্বল্প সময়ের ব্যবধানে নায়েব আলী মন্ডল ছাত্রদলের ক্যাডার ও তেজগাঁও থানার ৩৭নং ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি সাত্তার মোল্লার ছেলে আব্দুল বাসেত ও ছাত্রশিবির নেতা কমপিউটার অপারেটর হারুন মুন্সি, জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের ঢাকা মহানগর কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক মুহম্মদ হারুন উর রশিদ ভূঁইয়া (যিনি বর্তমানে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সেকশন অফিসার হিসেবে কর্মরত) এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদল কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ইউনিট কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. হারুনুর রশিদ (যিনি বর্তমানে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ক্যাশিয়ার হিসেবে কর্মরত) যোগসাজশে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের আওতাধীন বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে প্রায় ৪০ জন লোককে নিয়োগ দিয়েছেন যাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে নিয়োগ বাবদ ২ থেকে ৩ লাখ টাকা করে নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৫ জন নায়েব আলী মন্ডলের সরাসরি আত্মীয় হওয়ায় তাদের কাছ থেকে টাকা নেয়া হয়নি। নায়েব আলী মন্ডলের এই ৫ আত্মীয় হলেনÑবাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের দ্বিতীয় তলায় কর্মরত ড্রাইভার মোঃ জাকির হোসেন, পঞ্চম তলায় কর্মরত মোঃ আমির হোসেন, পঞ্চম তলায় কর্মরত অফিস সহকারী মুরাদ হোসেন মোড়ল, দ্বিতীয় তলায় কর্মরত অফিস সহকারী মোঃ মনছুর ও পঞ্চম তলায় কর্মরত কমপিউটার অপারেটর মোঃ শিহাব হাসান। এর বাইরে দশম তলায় কর্মরত শিশির আহম্মেদ ও ফরিদ, অষ্টম তলায় কর্মরত এনামুল হক, ইউসুফ আলী, বিপ্লব হোসেন, কাজী ফরিদ, মিজানুর রহমান, সুমনা ইয়াসমিনসহ অন্যান্যদের কাছ থেকে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা করে নিয়েছেন নায়েব আলী মন্ডল ও আব্দুল বাসেত সিন্ডিকেট।
নায়েব আলী মন্ডল চলতি বছরের মার্চে ৪ জন লোককে মাস্টাররোলে নিয়োগ দিয়েছেন। এরা হলেনÑসেকশন অফিসার মোস্তাফিজের ভাই, এমএলএসএস ওবাইদুল হক হাওলাদারের ছেলে ও এমএলএসএস আব্দুল জব্বারের মেয়ে। অভিযোগ রয়েছে সংশ্লিষ্ট সেকশন অফিসার ও এমএলএসএসদ্বয় প্রত্যেকেই বিএনপি-জামায়াতের রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী। তাদের ছেলে-মেয়ে ও ভাই যে একই ঘরানার রাজনীতিতে বিশ্বাসী, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
জানা গেছে, মামলা ও গ্রেপ্তারের ভয়ে যেসব শিবির ক্যাডার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি, তাদের পরীক্ষায় অংশ না নিয়েই পাস করিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন নায়েব আলী মন্ডল। এ জন্য তিনি বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে শিক্ষার্থী রেজিস্ট্রেশন বিষয়ক একটি দুষ্টচক্র গড়ে তুলেছেন। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি না হয়ে এবং পরীক্ষায় অংশ না নিয়েই শিবির ক্যাডাররা পাস করে যাচ্ছে নায়েব আলী মন্ডলের বদান্যতায়। ২০১৬ সালের এসএসসি ভোকেশনাল পরীক্ষাতেই এমন ১৫ শিক্ষার্থীর সন্ধান মিলেছে; যারা নায়েব আলী মন্ডল চক্রের রেজিস্ট্রেশন জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে পরীক্ষা না দিয়ে পাস করে ইতোমধ্যে সনদও তুলে নিয়ে গেছে। জানা গেছে, প্রতি বছরই নায়েব আলী মন্ডল চক্রের সদস্যরা নবম শ্রেণিতে ভুয়া নাম ঠিকানায় কিছু শিক্ষার্থী রেজিস্ট্রেশন করে রাখে। দুই বছর পর পরীক্ষা অনুষ্ঠানের আগে রাতারাতি সেই সব নাম-ঠিকানা পাল্টে যায়। এছাড়া ফেল করা শিক্ষার্থীদের পাস দেখানোর মতো অবিশ্বাস্য অনিয়মও পাওয়া গেছে। জালিয়াতি করতে গিয়ে মহিলা মাদ্রাসার নামে পুরুষ শিক্ষার্থীদের পাস দেখানোর ঘটনাও এ বোর্ডে ঘটেছে। জাল-জালিয়াতির পুরো ঘটনা ধামাচাপা দিতে বোর্ডের কমপিউটার থেকে সব ডাটা মুছে ফেলা হয়েছে। এসব ঘটনা ধরা পড়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক তদন্তে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে সব মিলিয়ে ৮ ধরনের জালিয়াতি খুঁজে পেয়েছে। এগুলো হলোÑকারিগরি শিক্ষা বোর্ড একজনের পরিবর্তে অন্যজনকে রেজিস্ট্রেশন করিয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ছাত্র নয় এবং প্রতিষ্ঠানপ্রধান রেজিস্ট্রেশনের জন্য নাম পাঠাননি, তবু বোর্ড এমন ছাত্রদের নাম রেজিস্ট্রেশন করেছে, একই রোল ও রেজিস্ট্রেশনের বিপরীতে একাধিক নামে প্রবেশপত্র ইস্যু করা হয়েছে, এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় ফল জালিয়াতির মাধ্যমে পাস করানো হয়েছে, নবম শ্রেণির ফাইনাল পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকলেও দশম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ করা হয়েছে এবং নিয়ম না থাকলেও তিন বিষয়ের অধিক বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীদেরও দশম শ্রেণিতে তোলা হয়েছে।
মতিউর রহমান নিজামী ও নায়েব আলী মন্ডলের এলাকা পাবনার বেড়া উপজেলার বেড়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার নামে ২০১৬ সালের এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় ৬ শিক্ষার্থীকে ভুয়া রেজিস্ট্রেশন করানো হয়েছে বলে অভিযোগ পেয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটি গঠন করে। ২ সদস্যের ওই তদন্ত কমিটি তদন্ত শুরু করার পর একের পর এক জালিয়াতির ঘটনা ফাঁস হতে থাকে। তদন্তকালে শুধু এই একটি পরীক্ষাতেই এমন ১৫ জন ভুয়া শিক্ষার্থীর সন্ধান মেলে, যারা পরীক্ষা না দিয়েই পাস করে গেছে। তাদের পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা বোর্ডের কাছে চাওয়া হলেও বোর্ড কর্তৃপক্ষ তা তদন্ত কমিটিকে দিতে পারেনি। যদিও রেজিস্ট্রেশনকৃত শিক্ষার্থীদের এসব তথ্য তাদের কাছে থাকার কথা ছিল।
অভিযোগ রয়েছে, নায়েব আলী মন্ডলের নির্দেশে আগে থেকেই ভুয়া নামে কিছু শিক্ষার্থীর নাম রেজিস্ট্রেশন করে রাখা হয়েছিল। ভুয়া শিক্ষার্থী হওয়ায় সঙ্গত কারণেই তারা নবম শ্রেণির বোর্ড ফাইনাল পরীক্ষার ফরম পূরণ করেনি, পরীক্ষায় অংশও নেয়নি। কেন্দ্রেও তাদের কোনো হাজিরা শিট বা পরীক্ষা দেয়ার চিহ্ন নেই। তারপরও তারা ২০১৬ সালে এসএসসি (ভোকেশনাল) ফাইনাল পরীক্ষা দেয়। ফলাফলে তাদের পাসও দেখানো হয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে রেজিস্ট্রেশন রিপ্লেস জালিয়াতির কারণে। নায়েব আলী মন্ডলের আশীর্বাদপুষ্ট ৬ শিবির ক্যাডারের রেজিস্ট্রেশন নম্বর হলো : ৫৫১১৮৫, ৮৯০২২৭, ৫৫১১৭২, ৮৯০২২৬, ৮৯০২৩৩ ও ৮৯০২৩২। প্রত্যেকেরই সেশন ২০১৪। তাদের এসএসসি (ভোকেশনাল) ২০১৬- এর রোল হলো : ৬৬২৮৪৭, ৭৫৮৭৫৮, ৬৬২৮৯০, ৭৫৮৭৫৭, ৭৫৮৭৬২ ও ৭৫৮৮০৭। আরও বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, তাদের প্রত্যেকে ছাত্র হলেও তাদের রেজিস্ট্রেশন রিপ্লেস একটি মহিলা মাদ্রাসার নামে করা হয়েছে। সেই মহিলা মাদ্রাসাটিও নায়েব আলী মন্ডলের এলাকার। সেটি হলো পাবনার বেড়া মহিলা ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসা।
জানা গেছে, বেড়া ফাজিল মাদ্রাসা ও বেড়া মহিলা ফাজিল মাদ্রাসা দু’টি এক সময় জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামীর সার্বিক সহায়তায় পরিচালিত হতো। এই দু’টি মাদ্রাসা এখন দেখভালের দায়িত্ব পালন করছেন নায়েব আলী মন্ডল। ফলে এই দুই মাদ্রাসার মাধ্যমে নায়েব আলী মন্ডল শিবিরের যেসব ক্যাডার মামলা, গ্রেপ্তার ও জঙ্গিপনার কারণে এসএসসি পাস করতে পারেনি, তাদের পাস করানোর দায়িত্ব নিয়েছেন। তার অন্যতম সহযোগী কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কমপিউটার শাখার সিস্টেম অ্যানালিস্ট একেএম শামসুজ্জামান ও সহকারী সিস্টেম অ্যানালিস্ট হাসান ইমাম। তাদের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন আরও ৩ কর্মকর্তা। তারা হলেনÑপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক সুশীল পাল, উপসচিব (রেজিস্ট্রেশন) নূর এ এলাহী এবং ওরাকল স্পেশালিস্ট (কমপিউটার শাখা) ওমর ফারুক। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে এরা ছাড়াও দায়িত্বে চরম অবহেলা ও গাফিলতির জন্য বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মোঃ মোস্তাফিজুর রহমানকেও দায়ী করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, রেজিস্ট্রেশনের পুরো বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব সচিব নায়েব আলী মন্ডলের হলেও তিনি তা যথাযথভাবে পালন করেননি।
তবে সে সময় বোর্ডের সচিব নায়েব আলী মন্ডল যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতে না পারার অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেন, যারা তদন্ত করেছে তাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা আছে। কর্মবণ্টন বলে সরকারি চাকরিতে একটি জিনিস আছে। কার কী দায়িত্ব তা নির্ধারণ করা আছে। কনস্টেবল ঘুষ খেলে এসপিকে দায়ী করার মতো সুপারিশই তদন্ত প্রতিবেদনে করা হয়েছে বলেও ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্য করেন নায়েব আলী মন্ডল। পরবর্তীতে এই মন্তব্যের কারণে নায়েব আলী মন্ডলকে শোকজ করা হয়। শোকজের জবাবে নায়েব আলী মন্ডল তার অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য অনুতপ্ত ও নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তবে রেজিস্ট্রেশন রিপ্লেস নিয়ে যে জালিয়াতি হয়েছে এবং ওই জালিয়াতির সঙ্গে যে নায়েব আলী মন্ডল সরাসরি জড়িত তা গত ২৩ জানুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব সুবোধ চন্দ্র ঢালী স্বাক্ষরিত পত্রে স্পষ্ট হয়েছে। পত্রে বলা হয়েছে, উপর্যুক্ত বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে জানানো যাচ্ছে যে, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের রেজিস্ট্রেশন রিপ্লেস জালিয়াতি বিষয়ে উত্থাপিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটির দাখিলকৃত প্রতিবেদনে বর্ণিত অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। সংঘটিত সার্বিক অনিয়ম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে আপনার অধিকতর দায়িত্বশীল ভূমিকা, নিবিড় তদারকি ও সুষ্ঠু তত্ত্বাবধানের আবশ্যকতা ছিল। প্রতিবেদনের আলোকে সে বিষয়ে যথেষ্ট অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে মর্মে উল্লেখ করা হয়েছে। এমতাবস্থায় ভবিষ্যতে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের প্রশাসনিক কার্যক্রম ও রেজিস্ট্রেশনসহ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের সার্বিক সমন্বয় ও সুষ্ঠু পরিচালনায় নিবিড় তদারকি ও মনিটরিংয়ের ক্ষেত্রে আপনাকে অধিকতর দায়িত্বশীল ও তৎপর হওয়ার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে খোঁজ নিয়ে স্বদেশ খবর প্রতিবেদক জানতে পেরেছেন, স্মারক নং ৩৭.০০.০০০০.০৭৭.১৬.০০৩.১৫-৩০ অনুযায়ী পত্র মারফত নায়েব আলী মন্ডলকে যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, সে বিষয়ে সতর্ক না হয়ে তিনি আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। চলতি এপ্রিল মাসেই তিনি একটি নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে যাচ্ছেন। প্রতিটি নিয়োগই যাতে জামায়াত-শিবিরের লোকজন পায় সে ব্যবস্থাও পাকাপোক্ত করেছেন। অন্যান্য আরো কর্মকর্তাকে দিতে হবে বলে নায়েব আলী মন্ডল জামায়াত-শিবিরের লোকজন থেকেও মাথাপিছু ১০ লাখ টাকা করে নিচ্ছেন বলে জানা যাচ্ছে। মাস্টাররোলে কোনো কর্মচারী বা চুক্তিভিত্তিক কোনো কর্মকর্তা নিয়োগে কোনো অলিখিত নিষেধাজ্ঞা থাকলেও নায়েব আলী মন্ডল এবং তার সিন্ডিকেট অনৈতিকভাবে এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের নির্দেশনা অমান্য করে মাস্টাররোলে কর্মচারী ও চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েই চলছেন। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ৩২টি পদে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় চূড়ান্তকরণের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সচিব (যুগ্ম সচিব) নায়েব আলীর নেতৃত্বে বিএনপি-জামায়াত সিন্ডিকেট কর্তৃক ইতঃপূর্বে মাস্টাররোলে নিয়োগকৃতদের বর্তমানে চলমান নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেয়ার পাঁয়তারা করছে সিন্ডিকেটটি। এ প্রক্রিয়ায় মাস্টাররোলে নিয়োগকৃতদের কাছ থেকে জনপ্রতি পুনরায় ১০ লাখ টাকা করে নিচ্ছে নায়েব আলী মন্ডলের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, সার্টিফিকেট জালিয়াতি ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম-দুর্নীতির পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের যাবতীয় সংস্কার, মেরামত, মালামাল ক্রয়-বিক্রয়, বিভিন্ন টেন্ডার প্রক্রিয়াও উল্লেখিত সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়ে আসছে। এদিকে শিক্ষামন্ত্রী বরাবরে সাভার টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজের প্রভাষক মোঃ জসিম উদ্দিনের এক অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, নায়েব আলী মন্ডলের পৃষ্ঠপোষকতায় ছাত্রদলের ক্যাডার আব্দুল বাসেত কর্মচারী ইউনিয়নের অফিস সংস্কারের নামে ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা উত্তোলন করে। কিন্তু ইউনিয়ন অফিসের সংস্কার না করে নায়েব আলী মন্ডল ও আব্দুল বাসেত পুরো ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকাই আত্মসাৎ করেছে। একই সিন্ডিকেট কর্মচারী ইউনিয়ন অফিসে টেলিভিশন ক্রয়ের নামে ৫২ হাজার টাকা উত্তোলন করে। কিন্তু টেলিভিশন না কিনেই এই চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট টাঙ্গাইলের হ্যাবিট প্রতিষ্ঠান থেকে উপঢৌকন হিসেবে একটি টেলিভিশন গ্রহণ করে। কর্মচারী ইউনিয়ন অফিসে বর্তমানে যে টেলিভিশনটি আছে, সে টেলিভিশনটির গায়ে টাঙ্গাইলের হ্যাবিট প্রতিষ্ঠানের সৌজন্যে লেখা আছে। প্রশ্ন উঠেছে, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি সৌজন্য হিসেবে টেলিভিশন প্রদান করে, তাহলে সে টেলিভিশন কেনার জন্য ৫২ হাজার টাকা উত্তোলন করা হলো কেন। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের একজন কর্মকর্তা জানান, আসলে টেলিভিশন ক্রয়ের নামে পুরো ৫২ হাজার টাকাই আত্মসাৎ করেছেন নায়েব আলী মন্ডল ও আব্দুল বাসেত। এভাবে এ সিন্ডিকেট প্রতি মাসেই ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ করছে। জানা যায়, নায়েব আলী মন্ডল কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সচিব হওয়ার সুবাধে বোর্ডের একটি গাড়ি ব্যবহার করেন; আবার সরকারের যুগ্ম সচিব হিসেবে অনৈতিকভাবে সরকারি গাড়ির সুবিধা বাবদ প্রতি মাসে ৪০ হাজার টাকা উত্তোলন করে থাকেন।
অভিযোগ আছে, নায়েব আলী মন্ডলের দাপটে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল বাসেত ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের পাশাপাশি ক্ষমতার দম্ভ দেখিয়ে বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে অশোভন আচরণ ও কটু ভাষায় গালাগালিও করে থাকেন। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সহকারী সচিব মোঃ আবদুছ ছালামের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ করলে তিনি চেয়ারম্যান বরাবর এ বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে আব্দুল বাসেতের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। কিন্তু চেয়ারম্যান এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সচিব (যুগ্ম সচিব) নায়েব আলী মন্ডলকে বিষয়টি দেখার জন্য বলেন। কিন্তু নায়েব আলী মন্ডলের সঙ্গে আব্দুল বাসেতের অনৈতিক সখ্য থাকায় আজ পর্যন্ত সহকারী সচিব আবদুছ ছালামের অভিযোগের কোনো প্রতিকার হয়নি।
আরও জানা যায়, আব্দুল বাসেত সিরাজগঞ্জ জেলার একটি বি এম প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র দেয়ার কথা বলে দেড় লাখ টাকা গ্রহণ করে এবং বি এম এর দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মোঃ হান্নানকে কেন্দ্র করে দিতে বলে। মোঃ হান্নান নিয়মের বাইরে কোনো কাজ করতে না চাইলে আব্দুল বাসেত মোঃ হান্নানকে গালাগালি করে এবং মারমুখী আচরণ করে। আব্দুল বাসেত সহকারী সচিব আবদুছ ছালামকে অবৈধ ভাবে ফাইল আটকে রাখতে বলে। কিন্তু সৎ হিসেবে পরিচিত সহকারী সচিব আবদুছ ছালাম রাজি না হওয়ায় তার রুমে ঢুকে আব্দুল বাসেত ফাইল দিয়ে তাকে এলোপাতাড়ি মারপিট করে। এ ব্যাপারে সহকারী সচিব আবদুছ ছালাম বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ করলেও চেয়ারম্যান মামলাবাজ ছাত্রদল ক্যাডার আব্দুল বাসেতের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের মতো এবারও রেজিস্ট্রেশন রিপ্লেসের কার্যক্রম চলছে। রেজিস্ট্রেশন রিপ্লেসের জন্য এবার পাবনার মাদ্রাসা দু’টি বাদ দিয়ে চট্টগ্রাম ও সিলেটের বেশ কয়েকটি ফাজিল মাদ্রাসাকে টার্গেট করা হয়েছে। এ বিষয়ে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বদেশ খবরকে বলেছেন, রেজিস্ট্রেশন রিপ্লেসের ঘটনা অনেক আগে থেকেই এই বোর্ডে ঘটছে। তবে আগে টাকার বিনিময়ে যে কেউই সনদ পেতেন। এখন যে কেউ ইচ্ছা করলেই সনদ পান না। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সচিব (যুগ্ম সচিব) নায়েব আলী মন্ডলের ইচ্ছায় শুধু বয়সোত্তীর্ণ শিবির ক্যাডাররাই টাকার বিনিময়ে পরীক্ষা না দিয়েই সনদ পেয়ে যান। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন একজন দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বদেশ খবরকে বলেন, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড এখন পুরোপুরিই জামায়াত-শিবিরের নিয়ন্ত্রণে। এখানে যে মাস্টাররোলে কাজ করে সে যেমন শিবিরের লোক, নায়েব আলী মন্ডলের মতো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও জামায়াতের লোক। এরা যে জামায়াত-শিবিরের লোক, বাইরে থেকে দেখে বোঝা মুশকিল। আপনার সঙ্গে যত ঘনিষ্ঠতাই থাকুক, সাংগঠনিক কোনো কথা এরা আপনার সঙ্গে বলবে না। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের মতো অনেক বিভাগে এরা ঘাপটি মেরে বসে আছে। সময় ও সুযোগ পেলেই এরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। তখন এদের নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে যাবে। তাই এখনই এদের নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এমনকি কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে এবার ৪৬তম স্বাধীনতা দিবসে কোনো প্রকার আলোচনা সভা সহ কোনো ধরনের কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়নি জামায়াত সমর্থক নায়েব আলী মন্ডলের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেটের অসহযোগিতার কারণে। এ নিয়ে স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সাধারণ কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সচিব নায়েব আলী মন্ডলের সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তার মতামত পাওয়া যায়নি। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের জনৈক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নায়েব আলী মন্ডল সম্প্রতি তার কিছু ভুলত্রুটির জন্য অনুতপ্ত হওয়ায় এবং নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগ ভবিষ্যতের জন্য তাকে সতর্ক করেছে।

