নোমান মাহমুদঃ
দেশের অভ্যন্তরীন সম্পদ আহরনে রাজস্ব আদায়ের গুরুদায়িত্ব প্রাপ্ত একটি সরকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কাস্টমস। সরকারের রাজস্ব আদায়ে এই প্রতিষ্ঠানকে প্রদান করা হয়েছে যথাযথ ক্ষমতা। কিন্তু বাস্তবে সরকারের এই প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব পালনের চিত্র চোখ কপালে ওঠার মতো। শুধু কর্মকর্তাই নয়, অফিসের পিয়ন থেকে শুরু করে পরিদর্শক, রাজস্ব কর্মকর্তা, বিভাগীয় কর্মকর্তা, সকলে ব্যস্ত অবৈধ অর্থের পাহাড় গড়তে। সাভার কাস্টমসের বিভাগীয় কর্মকর্তার কার্যালয়ের কর্মকান্ড পর্যবেক্ষনে এমন চিত্রই ফুটে ওঠে অপরাধ বিচিত্রার অনুসন্ধানে। ৬টি সার্কেলে বিভক্ত বাংলাদেশ কাস্টমসের সাভার বিভাগ। সাভার, রাজাশন, ইয়ারপুর, আশুলিয়া, ধামসোনা, হেমায়েতপুর, শিল্প নির্ভর এই ৬টি সার্কেলে সঠিক ভাবে তদারকি, সরকারের প্রাপ্য রাজস্ব আদায় সহ রাজস্ব ফাকিবাজদের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক যথাযথ ব্যাবস্থা গ্রহনের জন্য প্রায় ১৮ জন পরিদর্শক, ৬ জন রাজস্ব কর্মকর্তা, ২ জন সুপার দায়িত্ব পালন করছেন। আর শিল্পাঞ্চল খ্যাত কাস্টমসের এই সাভার বিভাগে বিভাগীয় কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন মোঃ মিজানুর রহমান। কিন্তু
দেশের অভ্যন্তরীন সম্পদ আহরনে গুরুদায়িত্ব প্রাপ্ত এই কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিকট রাজস্ব আদায় যেন অনেকটাই প্রহসন। রাজস্ব আদায়ের বদলে দিনে দিনে তারা ভারী করে তুলছেন তাদের অবৈধ সম্পদের পাহাড়। চলছে ফাইলে ফাইলে ঘুষ বানিজ্য। পিয়ন থেকে বিভাগীয় কর্মকর্তা, টাকা না দিলে সবাই অচল। শিল্প প্রতিষ্ঠানের সাথে সখ্যতা গড়ে প্রতিষ্ঠান তদারকির নামে প্রতিষ্ঠানের হিসাব কারচুপি ও গোপন করে আদায় করা হচ্ছে মোটা অংকের টাকা। আবার পদবি অনুসারে আদায়কৃত সেই অর্থ ভাগ হয়ে যাচ্ছে সবার পকেটে। এ যেন দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য ! দেশের অর্থনৈতিক ও সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে সরকার দেশের রাজস্ব আদায়ের এই খাতটির উপর অনেকাংশেই নির্ভর। রাজস্ব আদায়ের উপর নির্ভর করে দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন। কিন্তু সাভার কাস্টমসের এই কর্মকর্তারা দেশের প্রতি তাদের দায়িত্ব আর কর্তব্যের কথা ভুলে গিয়ে দেশকে বঞ্চিত করছে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব থেকে। শুধু তাই নয়, সাভার কাস্টমসের এই কার্যালয়ে কোন প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট রেজিঃ করতে গিয়েও প্রতিনিয়ত হয়রানীর স্বীকার হতে হচ্ছে। এই বিষয়ে কয়েকজন ভুক্তভোগির সাথে কথা বলে জানা যায়, সঠিক ভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে তাদের প্রতিনিয়ত হয়রানীর স্বীকার হতে হয়। ভ্যাট রেজিঃ নিতে গুনতে হচ্ছে তাদের ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা। আবার যথাযথ রাজস্ব প্রদান করলেও রাজস্ব কর্মকর্তা, পরিদর্শকদের প্রতিষ্ঠান অনুযায়ী মাসিক একটি নির্দিষ্ট অংকের টাকা ঘুষ প্রদান করতে হয়। অন্যথায় হয়রানীর স্বীকার হতে হয় কাস্টমস পরিদর্শক-কর্মকর্তাদের। তাই অগত্যা তাদের হিসাব গোপন করা ছাড়া কোন উপায় থাকেনা। এই প্রসঙ্গে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি পোশাক শিল্প কারখানার এক কর্মকর্তা জানান, প্রতিষ্ঠান অনুসারে তারা রাজস্ব কর্মকর্তাদের মাসিক হারে নিয়মিত ঘুষ প্রদান করে। আর হিসাব গোপন করার ক্ষেত্রে রাজস্ব কর্মকর্তারাই তাদের সহযোগিতা করেন। এই রাজস্ব ফাকি দিতে প্রতি ১ লক্ষ টাকায় তাদের রাজস্ব কর্মকর্তাদের প্রদান করতে হয় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। এমনকি সাভার কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তাগন তাদের এই দুর্নীতি ও ঘুষ বানিজ্যের ব্যাপারে কোন প্রকার প্রশ্নের সম্মুখিন হওয়া থেকে রক্ষা পেতে প্রতিনিয়ত এড়িয়ে চলেন গনমাধ্যম কর্মীদের।
এই প্রসঙ্গে সাভার সার্কেলের রাজস্ব কর্মকর্তা মোঃ ইমাম হোসেনের সাথে কথা বলতে চাইলে তিনি এই প্রতিবেদকের সাথে কোন কথা বলতে রাজী হননি। তিনি বলেন,“আমার সাথে কথা বলতে চাইলে বিভাগীয় কর্মকর্তা মোঃ মিজানুর রহমানের অনুমতি নিয়ে আসতে হবে”। পরবর্তীতে এই প্রসঙ্গে সাভার কাস্টমসের বিভাগীয় কর্মকর্তা মোঃ মিজানুর রহমানের সাথে কথা বলতে চাইলে টানা ৩ ঘন্টা তার কার্যালয়ে অপেক্ষা করেও তিনি এই প্রতিবেদকের সাথে সাক্ষাৎকারে বা কোন প্রকার কথা বলতে রাজী হননি। কাস্টমসের সাভার বিভাগীয় কার্যালয় ঘুষ বানিজ্যের প্রকোপে হয়ে উঠেছে রাজস্ব কর্মকর্তাদের ব্যাক্তিগত টাকা তৈরির কারখানা। অনতিবিলম্বে সাভার রাজস্ব বিভাগের এই অনিয়ম, দুর্নীতি আর ঘুষ বানিজ্য বন্ধ করা না গেলে বর্তমানের মত আগামীতেও সরকার ও দেশ বঞ্চিত হবে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব থেকে। যা দেশের উন্নয়নে বর্তমান সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপ, ভিশন ২০৪১ বাস্তবায়ন ও দেশের ভবিষ্যত অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্ভাবনাকে অসম্ভব করে তুলবে। হুমকির মুখে পড়বে দেশের ভবিষ্যত অর্থনীতি।

