রোজার শুরু থেকে ঈদ পর্যন্ত আমাদের খাবারের তালিকায় আসে ব্যাপক পরিবর্তন। খাবার গ্রহনের সময় এবং খাবারের ধরন দুটোই পরিবর্তন হয়। দীর্ঘ একটা সময় আমাদের পাকস্থলি ফাঁকা রাখার পর আমরা তা পূরণ করি ভাজা পোড়া সব তৈলাক্ত খাবার দিয়ে। আবার মাঝে মধ্যে অনেক ক্ষুধার কারণে একটু বেশি খেয়ে ফেলি ফলে অনেকেই এই সময়টাতে হয়ে পরেন অসুস্থ্য। তবে চলুন দেখি এই সময়টাতে কি খাবো আর কি খাবোনা ?
রোজার সময় কি হবে আমাদের সাস্থ্যকর খাবার মেনু এই নিয়ে আমাদের সবারই কম বেশি দুশ্চিন্তা থাকে। তাই রমজান এর সময় আমাদের খাবার তালিকা কেমন হওয়া দরকার সেই বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এর মেডিসিন বিভাগ এর অধ্যাপক অধ্যাপক ডাঃ এ বি এম আব্দুল্লাহ এর আলোচনা তুলে ধরছি।
ইফতারিতে কী খাবেন :
আমাদের সবচেয়ে পরিচিত ইফতার আইটেম গুলোর মধ্যে রয়েছে ছোলা, মুড়ি, পেঁয়াজু, বেগুনি, ডালবরা, সবজি বরা, আলুর চাপ, খোলা খেজুর, হালিম, জালি কাবার, জিলাপি, বুইন্দা ইত্যাদি। আরও রয়েছে বিভিন্ন ফল ও ফলের রস, আখের গুড়ের শরবত, নানা রং মিশ্রিত বাহারি শরবত। এছাড়া মুখরোচক বিরিয়ানি ও তেহারি সহ নানান রকম ভাজাপোড়া তো আছেই।
কিন্তু আমাদের মধ্যে সব সময়ই সঙ্কা থাকে মুখরোচক এসব খাবার স্বাস্থ্য সম্মত উপায়ে তৈরি করা হয়েছে কিনা। ভেজাল তেল, বেসন ও কৃত্রিম রং মেশানো হয়েছে কিনা, সেদিকে নজর দেয়া উচিত। যে তেলে ভাজা হয়, সেই তেল এক বারের বেশি ব্যবহার উচিত নয়। কারণ একই তেল বারবার আগুনে ফুটালে কয়েক ধরণের রাসায়নিক দ্রব্য তৈরি হয়, যেমন পলি নিউক্লিয়ার হাইড্রোকার্বন, যার মধ্যে বেনজা পাইরিন নামক ক্যান্সার হতে পারে এমন পদার্থের মাত্রা বেশি থাকে। তা ছাড়া অপরিষ্কারভাবে ইফতারি তৈরি করলে পেটের পীড়া হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সুস্থভাবে বাঁচার জন্য যত্রতত্র খোলা খাবার না খাওয়াই উচিত। খুব কম ফলই পাওয়া যায়, যা ভেজাল মুক্ত, শরবতের কথাতো বলাই বাহুল্য। রাস্তা ঘাটে, হাটে বাজরে রকমারি শরবত তৈরি করা হয়। আমাদের জানতে হবে, এসব শরবত যে পানি দিয়ে বানানো হয়, সে পানি বিশুদ্ধ কিনা। এছাড়া ইফতারের জন্য তৈরি প্রায় সব খাবার তেলও উচ্চ চর্বিযুক্ত সাধারণত: এসব খাবার মান সম্মত তেলে এবং সঠিক নিয়মে ভাজা হয় না, তাই এসব স্বাস্থ্য সম্মত নয়। একজন রোজাদার ইফতারে কি খাবেন তা নির্ভর করবে তার স্বাস্থ্যের অবস্থা ও বয়সের উপর। পারত পক্ষে দোকানের তৈরি ইফতারি ও সেহেরী না খাওয়াই ভালো। সুস্থ, স্বাস্থ্যবান রোজাদারের জন্য ইফতারিতে খেজুর বা খুরমা, ঘরের তৈরি বিশুদ্ধ শরবত, কচি শসা, পেঁয়াজু, বুট, ফরমালিন অথবা ক্যালসিয়াম কার্বাইড মুক্ত মৌসুমি ফল থাকা ভালো। কারণ ফলে ভিটামিন ও মিনারেল পাওয়া যায়। ফল খেলে কোষ্ঠ কাঠিন্য দুর হয় এবং সহজে তা হজম হয়। রুচি অনুযায়ী বাসার রান্না করা নুড়ুলসও খেতে পারেন। বেশি ভাজি, ভুনা, তেহারি, হালিম না খাওয়াই ভালো। কারণ এতে বদহজম হতে পারে। রুচি পরিবর্তনের জন্য দু একটা জিলাপি খেতে পারেন। এছাড়া গ্রীষ্মকালীন রমজানে পরিমাণ মতো বিশুদ্ধ পানি পান করা উচিত। এশা ও তারাবির নামাজের পর অভ্যাস অনুযায়ী পরিমাণ মত ভাত, মাছ অথবা মুরগির মাংস, ডাল ও সবজি খাওয়া ভালো।
কী খাবেন সেহেরীতে:
শরীরটাকে সুস্থ রাখার জন্য সেহরী খাওয়া অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ। মনে রাখতে হবে, সেহরীর খাবার মুখরোচক, সহজ পাচ্য ও স্বাস্থ্য সম্মত হওয়া প্রয়োজন। অধিক তেল, অধিক ঝাল, অধিক চবির্ জাতীয় খাবার খাওয়া একদম উচিত নয়। ভাতের সঙ্গে মিশ্র সবজি, মাছ অথবা মাংস খাবেন। অনেকেই মনে করেন যেহেতু সারদিন না খেয়ে থাকতে হবে, তাই সেহেরীতে সময় প্রয়োজনের অতিরিক্ত বেশী বেশী খাবার খেতে হবে। তা মোটেই ঠিক নয়, কারণ চার পাঁচ ঘন্টা পার হলেই খাদ্যগুলো পাকস্থলী থেকে অন্ত্রে গিয়ে হজম হয়ে যায়। তাই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি না খাওয়াই বরং ভালো। মাত্রাতিরিক্ত খেলে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশী থাকে।
পিপাসা নিবারণ হয়, সেই পরিমাণ পানি নিজের অভ্যাস অনুযায়ী পান করতে হবে। দীর্ঘ সময় অভুক্ত থাকার কারণে শরীরে পানি শূন্যতা দেখা দিতে পারে এবং পানি শূন্যতার কারণে শরীরে নানা জটিলতা দেখা দেয়। তাই ইফতার থেকে সেহরী পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে অন্তত: দেড় থেকে দুই লিটার পানি পান করবেন। অনেকে পানির পরিবর্তে লেমন অথবা রোজ ওয়াটার, ফ্রুইট ওয়াটার, নানা ধরণের শরবত, ভিটামিন ওয়াটার সহ নানা ধরণের প্রক্রিয়াজাত পানীয় পান করেন। এ ব্যাপারে বৈরুতের আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউট্রিশনিস্ট ফারা নাজার এর অভিমত: রোজাদারদের শুধুমাত্র বিশুদ্ধ পানি পান করাই ভালো। তার মতে, কার্বোনেটেড ও সুগার ড্রিংক, চা ও কফি পান করলে শরীর থেকে অধিক পানি বের হয়ে যায়। তাই কার্বোনেটেড, বেভারেজ সুগার ড্রিংক বা নানা ধরণের শরবত পরিহার করা উচিত। এছাড়া কফি ও চায়ের ডাই ইউরেটিক ইফেকট-এর কারণে ইফতার ও সেহরীতে চা কফি পরিহার করা বা কম পান করা ভালো। রোজাদারদের প্রচুর সবুজ শাক সবজি, ফলমুল আহার করা উচিত।
রমজান মাসে রোজা রাখার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি সহজেই তার স্বাস্থ্যের উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটাতে পারে, যদি ঠিক ডায়েট অনুসরণ করা হয়। কখনোই শুধু পানি খেয়ে রোজা রাখবেন না। অতিভোজন থেকেও বিরত থাকুন। খাবার ভালো ভাবে চিবিয়ে ধীরে ধীরে খান, যা আপনার হজমে সহায়ক হবে। ইফতার ও সেহরীর সময়ের মধ্যে অন্তত:পক্ষে আট গ্লাস পানি পান করুন। গ্লাস গুনে পানি খেতে অসুবিধা হলে, সমপরিমাণ পানি বোতলে ভরে রাখুন এবং ইফতার থেকে সেহরীর সময়ের মধ্যে তার পুরোটা পান করুন। এনার্জি, কার্বনেটেড ড্রিংক এবং সোডা জাতীয় পানিগুলো বর্জন করুন। এগুলো গ্যাস্ট্রিক এসডিটি বাড়িয়ে দেয়।
তরল খাবার:

রোজা ভাঙা হয় যে খাবারটি দিয়ে সেটি হলো তরল খাবার। আজানের পর পানি মুখে দিয়ে ৫ থেকে ১০ সেকেন্ড বিরতি দিয়ে তরল খাবারটি খেতে হয়। এ ক্ষেত্রে আস্তে আস্তে তরলটি গ্রহণ করতে হয়। খুব তাড়াহুড়া না করে বা গড় গড় করে না খাওয়াই ভালো। তরল হিসেবে লাচ্ছি, তাজা ফলের রস, ডাবের পানি, তোকমার শরবত, আখের গুড়ের শরবত ও লেবু পানি অনেক উপকারি। শরবত বা তরল তৈরিতে তাল মিছরি, গুড়, মধু ও ব্রাউন সুগার ব্যবহার করা যেতে পারে।
ফল:

যেকোনো মৌসুমী ফল অবশ্যই ইফতারির মেনুত রাখতে হবে। মিক্স ফ্রুটস বা ফল দিয়ে তৈরি ডেজার্ট খাওয়া যেতে পারে। যা ফলের ভিটামিন এবং মিনারেলের চাহিদা পূরণ করে থাকে এবং প্রয়োজনীয় খাদ্য আঁশ জোগায়।
সবজি:
শুধু বেগুনি না খেয়ে বিভিন্ন সবজি দিয়ে স্বাস্থ্যকর রেসিপি তৈরি করলে তা অনেক উপকারে আসে। সবজি, স্যান্ডউইচ, সবজি নুডলস, সবজি রোল, সবজি মম, সবজি পাকোরা ইত্যাদি। বয়স্কদের সবজি স্যুপ দিলে ভালো হয়। তবে মনে রাখতে হবে সবজি দিয়ে প্রস্তুত রেসিপিতে যেন অনেক কম তেলের ব্যবহার করা হয়।
ছোলা :

ছোলা অতি প্রিয় এবং রোজার পরিচিত খাবার। যদিও ছোলা প্রোটিনের ভালো উৎস। তবে দেখা যায় অনেক তেল ও মসলায় ভুনা ছোলা খেয়ে উপকারের থেকে অপকার বেশি হয়। ছোলা সারারাত ভিজিয়ে রাখলে ভালো এবং সিদ্ধ ছোলার সাথে পেঁয়াজ, মরিচ, শশা, টমেটো ইত্যাদি মিশিয়ে অথবা সামান্য তেলে ছোলার খাবার করে খেলে তা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। কাঁচা ছোলা খেলেও অনেক খাদ্য আঁশ ও প্রোটিন পাওয়া যায়।
মিষ্টান্ন:

শুধু জিলাপি বা বুন্দিয়া নয়, ইফতারে স্বাস্থ্যকর মিষ্টান্ন পরিমিত পরিমাণে খাওয়া যেতে পারে। জিলাপি বা বুন্দিয়া তেলে ভেজে সিরায় ফেলা হয় যা বেশি খেলে ক্ষতিকর। তাই দুধের তৈরি মিষ্টি জাতীয় খাবার যেমন ফালুদা, কার্স্টাড, পুডিং , ফিরনি ইত্যাদি খাওয়া যেতে পারে।
অন্যান্য খাবার :

চিড়া দই ইফতারের জন্য খুব ভালো। যা কার্ববোহাইড্রেট, প্রোটিন ও ক্যালসিয়াম দেয়। এছাড়া দই বড়া, নুডলস, স্যান্ডউইচ, রুটি-কাবাব, মম ইত্যাদি ইফতারের ম্যানুতে রাখা যেতে পারে। এ ছাড়া শশা থাকলে ভালো।
পরিমিত খাবার ও সহজে হজমযোগ্য খাবার ইফতারে খেলে শারীরিকভাবে ভালো থাকা যায়।
মনে রাখবেন, ঘরে তৈরি খাবার ইফতারকে অনেক স্বাস্থ্যকর করে তোলে। ভাজা-পোড়া ও বাইরের খাবার তাই অবশ্যই এড়িয়ে চলার চেষ্টা করবেন।
ইফতার ও সেহরীর খাবারে নির্দেশিকা :
- ইফতারে বেশি ক্যালরি সমৃদ্ধ এবং সহজে ও তাড়াতাড়ি হজম হয় এমন খাদ্য গ্রহণ করুন। সেহরীতেও সহজে পাচ্য হয় এমন খাবার গ্রহণ করুন
- ভাজা-পোড়া ও অতিরিক্ত মসলা যুক্ত খাদ্য বুজ জ্বালাপোড়া এবং বদহজমের সমস্যা তৈরি করে। তাই এসব খাবারগুলো এড়িয়ে চলুন
- রান্নার সময় ডালডার পরিবর্তে সয়াবিন তেল ব্যবহার করুন, তবে যতটা সম্ভব পরিমাণ কম করে ব্যবহার করা যায় ততই ভালো।
- অতিরিক্ত লবণ ও লবণাক্ত খাবার গ্রণ থেকে বিরত থাকুন। কারণ এসব রোজার সময় পানির পিপাসা বৃদ্ধি করে।
- যাদের চা, কফি, সিগারেট, মদ প্রভৃতি বাজে আসক্তি আছে তারা এগুলোকে কমিয়ে আনতে চেষ্টা করুন। হঠাত্ এগুলো ছেড়ে দিলে মাথা ব্যথা, রাষ প্রবণতা, মেজাজ খিটখিটে হওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
- ঘুমানোর আগে ও সেহরীর পর অবশ্যই দাঁত ব্রাশ করতে ভুলবেন না। রোজা রাখা অবস্থায় সকালে ব্যায়াম না করে ইফতারের পর ব্যায়াম করা উচিত।
- খাওয়া আগে অবশ্যই হাত ধুতে ভুলবেন না। এই সময়ে হাঁচি, কাশির মতো ছোঁয়াচে রোগ বেশি দেখা দেয়। তাই যারা এতে আক্রান্ত, তাদের কাছ থেকে সাবধান থাকা উচিত।
- দিনে গরম সময়ে ঠান্ডা ও ছায়াযুক্ত স্থানে থাকা উচিত। সম্ভব হলে শারীরিক পরিশ্রম কম করুন।
- দৈনিক কাজ কর্ম এমন ভাবে ঠিক করুন, যেন বেশ ভালো ভাবে ঘুম পারা যায়। –
