রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বৈরী সম্পর্ক অনেক পুরোনো। এই সম্পর্ক কখনো খানিক ভালো হলেও ইতিহাস বলে, রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্ব চিরকালের। আর তার প্রমাণ বিদায়ী শতাব্দীর বিভিন্ন যুদ্ধ। সর্বত্র তারা বিপরীত পক্ষে। এবার দুই দেশের বিবাদের নতুন ইস্যু তৈরি হয়েছে ভেজালসামগ্রী নিয়ে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার বেশকিছু এলাকায় নকল ও ভেজাল খাদ্যসামগ্রীতে সেখানকার বাজার ভরে গেছে। বিষয়টি রুশ কর্তৃপক্ষ ও ভোক্তাদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনটাই খবর প্রকাশ করেছে সংবাদ সংস্থা এএফপি। রাশিয়ার সংবাদবিষয়ক ওয়েবসাইট ফনতানকা জানিয়েছে, সেন্ট পিটার্সবার্গের কাছে কোথাও কোথাও এমন চিজ বিক্রি হচ্ছে, যাতে দুধের কোনো বালাই নেই। এসব চিজ শুধু কেরোসিন বাতি জ্বালানোর উপযোগী বলে ফনতানকা জানায়। কদিন আগে এ ওয়েবসাইটে একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। এতে এক টুকরো চিজে আগুন ধরানোর পর তা মশালের মতো জ্বলতে দেখা যায়। রুশ কর্তৃপক্ষ নকল খাদ্যসামগ্রী প্রস্তুতের অভিযোগে কয়েকটি কারখানা বন্ধ করেছে। কিন্তু তার পরও এসব পণ্য ঠেকানো যাচ্ছে না।
অর্থনৈতিক মন্দা ও নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার দোকানগুলোয় পশ্চিমা দেশে তৈরি কোনো খাবার পাওয়া যায় না। স্থানীয় খাদ্যসামগ্রী প্রস্তুতকারকেরা অনেকটা নিরুপায় হয়ে অসাধু পন্থা অবলম্বন করছে বলে ফনতানকা প্রতিবেদক ভিনিরা গালিয়েভা জানান। ক্রিমিয়া ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার জবাবে মস্কো পাল্টা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। ২০১৪ সালের আগস্ট থেকে এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে। সম্প্রতি রুশ প্রধানমন্ত্রী দিমিত্রি মেদভেদেভ নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ ২০১৭ সালের শেষ নাগাদ বাড়িয়েছেন।
পশ্চিমা দেশগুলোর চিজ, সসেজ আমদানি বন্ধ থাকায় স্থানীয় খাদ্যসামগ্রীর চাহিদা ভীষণ বেড়েছে। কিন্তু দুধ, মাংস ইত্যাদি উৎপাদন বৃদ্ধি না পাওয়ায় খাবার প্রস্তুতকারকদের অনেকে অসাধু উপায়ে ঝুঁকছেন ও ক্রেতাদের প্রতারিত করছেন। মস্কোর ইনস্টিটিউট অব অ্যাগ্রিকালচার মার্কেট স্টাডিজের ভøাদিম সেমিকিন জানিয়েছেন, বাজারে দুধের ঘাটতি রয়েছে। গত বছর দুধ ঘাটতির পরিমাণ ৮০ লাখ টন ছিল বলে তিনি জানান। দুধের সরবরাহ ঘাটতির বছরে পাম অয়েল আমদানি বেড়েছে। ২০১৫ সালে পাম অয়েল আমদানির পরিমাণ ২৫ শতাংশ বৃদ্ধির কথা জানিয়ে ভøাদিম সেমিকিন বলেন, ‘দুধের বিকল্প হিসেবে কোম্পানিগুলো পাম অয়েল ব্যবহার করে।’
রাশিয়া দাবি করে, নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশের কৃষি খাতের উপকারই হচ্ছে। নতুন করে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বৃদ্ধির আগের দিন প্রধানমন্ত্রী মেদভেদেভ বলেছেন, আমাদের কৃষকদের জন্য অনুকূল ও সহজ পরিস্থিতি সৃষ্টির প্রয়োজনে নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ আরও ১৮ মাস বৃদ্ধি করা হচ্ছে। তবে রুশ সরকারের বাজার পর্যবেক্ষণ সংস্থার মতে, নিষেধাজ্ঞার কারণে স্থানীয় ভোক্তাদের ক্ষতি হচ্ছে। রাশিয়ার এ সংস্থা পণ্যমানের অবনতি ও বাজারে নকল চিজ পণ্যের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করেছে। সমস্যার তীব্রতা বোঝা যায় আরেকটি ঘটনায়। সরকারের কৃষি বিভাগ চলতি বছর ‘ভালো কোম্পানির তালিকা’ প্রকাশ শুরু করেছে, যারা দুগ্ধজাত খাদ্য তৈরিতে দুধ ও মাখন ব্যবহার করে। অসাধু কোম্পানিগুলো দুধের পরিবর্তে ‘ভাতের মাড়, চক, সাবান, বেকিং সোডা, চুন, প্লাস্টার’ থেকে পানি পর্যন্ত যেকোনো কিছু ব্যবহার করে বলে কর্তৃপক্ষ উল্লেখ করেছে।
ভোক্তাস্বার্থবিষয়ক এনজিও রসকন্ত্রোলের মুখপাত্র ইরিনা তিখমিয়ানোভা বলেন, স্থানীয় খাদ্যসামগ্রী প্রস্তুতকারকদের বেশির ভাগ বাজারে প্রতিযোগিতাহীনতার সুযোগ নিচ্ছে। সম্প্রতি রাশিয়ার বাজারে পাওয়া ৪৬টি দুগ্ধজাত পণ্য পরীক্ষা করে বেসরকারি সংস্থাটি। ইরিনা তিখমিয়ানোভা বলেন, ৬০ শতাংশ পণ্যেই দুধ নয়, এমন মিশ্রণ পাওয়া গেছে।
রাশিয়ার বাজারগুলোর বর্তমান সমস্যা নিরসনে সমাধানে উপায় খুঁজছে দেশটির প্রশাসন। তবে কীভাবে এটির নিরসন সম্ভব, সে বিষয়ে কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ দিতে পারেননি বিশেষজ্ঞরা। আগামী বছর পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়ালেও সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাত দিয়ে বলা হয়েছে রুশ প্রধানমন্ত্রী দিমিত্রি মেদভেদেভ অভ্যন্তরীণভাবে এ বিষয়ে শিগগিরই সমাধানের চেষ্টা করছেন। সেই সঙ্গে দেশের ভেতরে ভেজাল খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও ভাবছে রুশ প্রশাসন।

