নতুন প্রজন্ম যেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভুলে না যায় : প্রধানমন্ত্রী

0
712

বঙ্গবন্ধুহত্যার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল সমালোচকরাই * মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর থাকবে জেলা-উপজেলায়ও

Advertisement

2_117899রাজধানীর আগারগাঁওয়ে রোববার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নিজস্ব ভবন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ভবনের চিত্র গ্রহণ করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, নতুন প্রজন্ম যেন মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভুলে না যায়। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এ দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখবে। এর মাধ্যমে প্রজন্মের পর প্রজন্ম জানতে পারবে, কত ত্যাগের বিনিময়ে এ দেশের স্বাধীনতা অর্জন হয়েছে। সেই স্মৃতিচিহ্নগুলো তারা দেখবে, অন্তরে ধারণ করবে এবং সেভাবেই নিজেদের চরিত্র গঠন করবে। রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর উদ্বোধন করে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নিঃশেষ করে দিতে পঁচাত্তরে জাতির জনককে সপরিবারে হত্যা করা হয়। তারপর ইতিহাস পাল্টে গেল, অনেকে ঘোষক হয়ে গেল; যেন বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে দিল, যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। কিন্তু জাতির জনক দীর্ঘ সংগ্রাম করে স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন, দেশকে স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন। এ সময় শেখ হাসিনা মন্তব্য করেন, বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর তাকে ঘিরে সমালোচনাই হত্যাকাণ্ডের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল।
এর আগে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে ‘শিখা চির অম্লান’ প্রজ্বালনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন শেখ হাসিনা। এ সময় ছোট শিশুরা ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই’ গানটির সঙ্গে নৃত্য পরিবেশনার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানায়। পরে প্রধানমন্ত্রী জাদুঘরের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন। ব্যতিক্রমী স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত ৯ তলা জাদুঘর ভবনটি আগারগাঁও পঙ্গু হাসপাতালের বিপরীত দিকে অবস্থিত। দুই বিঘা জায়গাজুড়ে নির্মিত ভবনের ব্যবহারযোগ্য আয়তন ১ লাখ ৮৫ হাজার বর্গফুট। ২০১১ সালের ৪ মে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নতুন ভবনটির নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন শেখ হাসিনা। এ জাদুঘরে মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহার করা বিভিন্ন সামগ্রী, মুক্তিযুদ্ধের দলিল ও চিঠি মিলিয়ে প্রায় ২৫ হাজার স্মৃতিস্মারক রয়েছে। চারটি গ্যালারিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের সময়ের মূল্যবোধের নানা দিক। ১৯৯৬ সালের ২২ মার্চ প্রতিষ্ঠার পর থেকে এতদিন জাদুঘরটি সেগুনবাগিচার একটি ছোট্ট দোতলা বাড়িতে ছিল। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, জাদুঘরের ট্রাস্টি ও সদস্য সচিব জিয়াউদ্দিন তারিক আলী প্রমুখ। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি অভিনেতা আলী যাকের, স্থপতি ও কবি রবিউল হুসাইন, লেখক মফিদুল হক, অভিনেত্রী সারা যাকের, বিএমএ’র সাবেক মহাসচিব ডা. সারওয়ার আলী এবং আক্কু চৌধুরী অনুষ্ঠান মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন।
শেখ হাসিনা আরও বলেন, আমরা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স করছি। সেখানে ছোট পরিসরে হলেও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর থাকবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার ৬ বছর পর দেশে ফিরে দুঃসহ পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আমাকে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতেও ঢুকতে দেয়া হয়নি। রাস্তায় বসে মা-বাবার জন্য দোয়া করেছি। এমনকি বাড়ি ভাড়াও করতে পারিনি। পরে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে রাতযাপন করতে হয়েছে। তিনি বলেন, যখনই বাড়ি ভাড়া করতে যেতাম, কেউ ভাড়া দিত না। ছোট ফুফুর বাড়িতে এক রাত, মেজো ফুফুর বাড়িতে … এভাবে আমাকে থাকতে হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা দুই বোন পৈতৃকসূত্রে ৩২ নম্বরের বাড়িটি পাই। এ বাড়ি আমরা ব্যবহার করব, সেটা কখনও সম্ভব ছিল না। এ বাড়ি থেকেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। আবার এ বাড়িতেই তিনি জীবন দেন। ভেবেছিলাম, এখানে কিছু একটা করব, যা ইতিহাস হয়ে থাকবে। বাংলাদেশে আর কোনো নেতার ছেলে-মেয়ে কিন্তু সম্পত্তি দেয়নি। সবাই ভোগ দখল করেছে। তিনি বলেন, আমাদের সিদ্ধান্ত ছিল, আমরা এটা (বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর) করব এবং করেছি।
বঙ্গবন্ধুহত্যা শুধু ক্ষমতা দখলের জন্য নয় : বঙ্গবন্ধুহত্যা নিছক ক্ষমতা দখলের জন্য ছিল না বা এটি শুধু একটি পরিবারকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়া ছিল না বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দিনের পর দিন যখন গেছে, তখন অনেকেই উপলব্ধি করেছে- এটা কোনো পরিবারের ওপর আঘাত ছিল না বা শুধু ক্ষমতা দখলের জন্য ছিল না। এটা ছিল একটা চেতনাকে ধ্বংস করা, মুক্তিযুদ্ধের বিজয়কে নস্যাৎ করা, স্বাধীন বাংলাদেশকে ধ্বংস করাই ছিল এ হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য। তা আরও বেশি সবার কাছে প্রমাণিত হল যখন ৩ নভেম্বর কেন্দ্রীয় কারাগারে চার জাতীয় নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হল। বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার পর তার অন্যায্য সমালোচনা হয় বলে অভিযোগ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি দাবি করেন, এ সমালোচনাই তাকে হত্যার সুযোগ তৈরি করে। শেখ হাসিনা বলেন, সে সময় যারা জাতির জনকের সমালোচনা করেছে, তারা কি সেটা উপলব্ধি করেনি- এটা একটা প্রদেশ ছিল। এ দেশে একটা টাকা রিজার্ভ মানি ছিল না। রাস্তাঘাট, পুল-ব্রিজ সব ছিল ভাঙা; স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসা থেকে শুরু করে সবই ধ্বংসপ্রাপ্ত। সেই ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে শূন্যহাতে যাত্রা শুরু করেন জাতির জনক। আজ যখন রাষ্ট্র পরিচালনাকালে একটার পর একটা কাজ করতে যাই; তখন দেখি, প্রতিটি কাজই তিনি করে দিয়ে গেছেন। আমি নিজে অবাক হয়ে যাই, এত অল্প সময়ের মধ্যে কীভাবে তিনি এত কাজ করেছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদ পূরণ করা, কমনওয়েলথ থেকে শুরু করে জাতিসংঘের সদস্যপদ তিনি করে দিয়ে গেছেন। আমাদের ল্যান্ড বাউন্ডারি চুক্তি তিনিই করেছেন। ছিটমহল বিনিময় হয়েছে যে আইনে, সেই ইন্দিরা-মুজিব চুক্তির কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এ চুক্তির পর খালি গালিই খেয়ে গেছেন আমার বাবা। গোলামি চুক্তি, গোলামি চুক্তি, কত কথা, কত আন্দোলন, কত লেখালেখি। আর এ চুক্তির কারণেই তো আমরা স্থল সীমানা চুক্তি বাস্তবায়ন করেছি। যারা সমালোচনা করেছে, তারা ভাবেনি সেই চুক্তিই বাস্তবায়ন হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, মাঝে মাঝে মনে হয়, এ লেখালেখি ও সমালোচনা ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া আর স্বাধীনতাবিরোধীদের ক্ষমতায় আসার সোপান তৈরি করে দিয়েছিল তাদের এ বোধশক্তিটার অভাবের জন্য। আজ তারা নিশ্চয় উপলব্ধি করতে পারছে, কত ভুল চিন্তা তাদের ছিল।

Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here