প্রিয় মা তুবা,
যখন তোর ছোট্ট চেহারাটি দেখেছি টিভি পর্দায় তৎক্ষণাৎ আমি আমা’র মেয়েটির কথা ভেবেছি! ঠিক তোর মতো ছোট্ট একটি মেয়ে আছে আমা’র!
জানিস, তুবা তোর আর আমা’র মাঝে অনেক মিল মা। আবার অনেক অমিলও আছে…
আমি পরিবারের সবচেয়ে ছোট সন্তান তুই ও ছোট্ট তাইনা মা? আমা’র বাবা নেই, তোর বাবা থেকেও নেই! আমি মা হা*রিয়েছি আজ থেকে তিন বছর আগে ঠিক এই জুলাই মাসে, তুইও মা হারালি জুলাই মাসে। আমি প্রতি বছর ২২ জুলাই মায়ের মৃ’ত্যুবার্ষিকী’ পালন করি এখন থেকে তুইও করবি তবে দু’দিন আগে, ২০ জুলাই।
তোর অনেক প্রশ্ন আছে আমি জানি, সবাই মনে করছে তুই কিছুই বুঝছিস না! তুই মনে মনে মায়ের ফিরে আসার প্রতীক্ষা করছিস, তাই নাহ্? জানিস আমিও প্রতীক্ষা করি… আমাদের দুজনের কারো প্রতীক্ষাই শেষ হবে না! তুই অবশ্য প্রশ্ন করতে পারিস আমাকে, আমা’র মা কিভাবে চলে গেলেন? আমা’র মা আমাকে প্রতিষ্ঠিত করে স্বাভাবিকভাবেই ওপারে চলে গেছেন!
তুই কি তোর মা কিভাবে চলে গেছেন, তাও জানতে চাস মা? তোর মাও তোকে ঠিক আমা’র মত প্রতিষ্ঠিত করতে স্কুলে ভর্তি করাতে চেয়েছিলেন! ওখানে হলো কি মা, কিছু মস্তিষ্ক বিবর্জিত ঠাণ্ডা মাথার খু’নি খেলার ছলে তোর মাকে মা’র, মা’র, মা’র…. বলে মা’রতেই থাকলো… মনে করলো এটা যেন একটা পুতুল! অবিকল মানুষের চেহারার মতো কতগুলো অমানুষ শুধু মে’রেই গেছে তোর অভাগিনী মাকে….. তুই হয়তো তাদের কাউকে দেখলে চাচা, মামা বলে ডাকতি! হয়তো কাছে থাকলে বলতি, আমা’র মাকে মেরো না, আমা’র মাকে মেরোনা.. ওই পাষণ্ডদের কানে তোর মা ডাক পৌঁছাত কিনা তাতে সন্দেহ আছে আমা’র। ওই অমানুষগুলো একটিবারের জন্য তোর কথা ভাবেনি মা! ওদের অনেকের ঘরেই তোর মত তুবা আছে। ফুলের মতো সাজিয়ে রাখে নিজেদের তুবাকে! তুই তুবাকে নিয়ে ওদের ভাবনার একটুকুও সময় নেই মা!
জানিস মা, তোর এই চাচারা রাস্তায় অনেক অন্যায় হয়ে গেলে টু শব্দটিও করে না! তখন মুখে কুলুপ এঁটে, হাতে চুড়ি পড়ে বসে থাকে। এরা কেউ কেউ তখন উট পাখির মতো মুখ লুকিয়ে ফেলে। এরা সোচ্চার হয় অসহায়, সম্বলহীন, দুর্বলের উপর! তখন এদের পুরুষত্ব খুব জেগে উঠেরে মা….!
তুবা মা, ওখানে তোর একটা চাচাও ছিল না যে প্রতিবাদ করে বলবে না মা’রিস না, আইন ভঙ্গ করিস না! একটা চাচাও তোর মায়ের নিথর দেহের উপরের আ’ঘাতগুলো ফিরায়নি মা…
তোর মাতো তোকে একটুও ব্যথা পেতে দেয়নি কখনো? আ’ঘাত পেলেও হয়তো আদর করে দিতেন খুব করে তাই না? তুই মা নিজের মায়ের নিথর দেহটা ছুঁয়ে একটু আদর করে দিস কেমন! পারলে একটু জড়িয়ে ধরিস মা…যদি পারিস জড়িয়ে ধরে একটু চি’ৎকার করে কাঁদিস মা……..! তাতে তোর ছোট্ট বুকটা একটু হালকা হবে কিনা জানিনা আমি..আর কখনো তো জড়িয়ে ধরতে পারবি না মাকে, তাই একটু বেশি করে মমতাময়ী মায়ের দেহটা ছুঁয়ে দিস..
এই কঠিন পৃথিবীতে দুদিন পর সবাই তুবাকে ভুলে যাবে, তোর তো বেঁচে থাকার জন্য একটা স্মৃ’তি লাগবে তাই না! মায়ের সাথে শেষ স্মৃ’তিটুকু ধরে রাখিস মা…. আমি কিন্তু ওই স্মৃ’তি নিয়েই বেঁচে আছিরে মা…..
মা তোর মায়ের হ’ত্যাকারীরা এখন ঘরে চো’রের মত লুকিয়ে আছে! দেখে দেখে এই খু’নকে যারা জায়েজ করেছে তারাও চুপ! তোর মায়ের খু’নীরা আইনের আওতায় অবশ্যই আসবে, সেটা আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বা’স করি। কিন্তু এতে আমা’র কোনো ভাল লাগা, মন্দ লাগা কাজ করছেনা! আমি জানি তুই আইন, আওতা কিছুই বুঝিস না। এসবের কোনো মানেও নাই তোর কাছে। আমি শুধু ভাবি রাতে চি’ৎকার করে কেঁদে কেঁদে তুই যখন মা বলে ডাকবি, তখন কে দাঁড়াবে তোর পাশে? কে তোর ছোট্ট মুখটা তুলে কা’ন্না মুছিয়ে দিয়ে বলবে, আয় তুবা মা, আমা’র বুকে আয়? এই বিশাল পৃথিবীতে তোর ছোট্ট আকাশকে কে আগলে রাখবে? আমা’র সাথে সাথে তোর বুকটাও খালি হয়ে গেলরে মা!
আমি যখন কেঁদে কেঁদে মায়ের জন্য বুক ভাসাতাম তখন তোর ছোট্ট বোন আমা’র বুকে এসে আমা’র বুকটা ঠান্ডা করতো! তোর ছোট্ট বুকটা কার পরশে ঠান্ডা হবে রে মা? আমি জায়নামাজে বসে তোর জন্য বারবার কাঁদছি… আমিও হয়তো ব্যস্ততায় তুই তুবাকে ভুলে যাবো, চেষ্টা করবো মনে রাখতে মা…. এই পৃথিবীটাকে এর মানুষেরা নোংরা বানিয়ে ফেলছেরে মা! স্বার্থের এই দুনিয়ায় কিছু অসভ্য, বর্বর মাথা তুলে জেগে উঠে অসময়ে! সঠিক সময়ে এরা কখনো জেগে উঠেনা মা…
তুবা জানিস, আজ আমা’র মায়ের মৃ’ত্যুবার্ষিকী’! মহান আল্লাহর কাছে আমা’র প্রতিটি প্রার্থনায় মায়ের পাশাপাশি তোকেও রাখার চেষ্টা করবো মা… তুই তো আমা’রও মেয়ে হতে পারতি? এটা ভাবলেই আমা’র পুরো পৃথিবীটা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে মা… যেভাবে পারিস নিজের ছোট্ট বুকটাকে ঠান্ডা রাখিস! আমি তোর বাবা হলে সারাক্ষণ তোকে আগলে রাখতাম মা, তোর বদনসীব বাবা কি করবেন আমি জানিনা!
মহান আল্লাহ পৃথিবীর নোংরা মানসিকতার সকল অমানুষদের থেকে তোকে নিরাপদে রাখুক মা…
তুই আমাদের মাফ করিসনা তুবা, আমাদের অ’ভিশাপ দিস! তোর অ’ভিশাপে ধ্বংস হয়ে যাক সকল অমানুষের দল…
ইতি
তোর পু’লিশ চাচ্চু
লেখক: ইফতেখায়রুল ইস’লাম, অ’তিরিক্ত উপ-পু’লিশ কমিশনার (প্রশা*সন), ওয়ারী বিভাগ, ডিএমপি, ঢাকা।

