এস এম মোরশেদ
বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ-খ্রীষ্টানসহ বিভিন্ন নৃগোষ্ঠী অসাম্প্রদায়িক, উদারপন্থী এবং গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন। সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে তারা যুগ যুগ ধরে একত্রে অংশগ্রহণ করে আসছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও আমন্ত্রণ অংশগ্রহণ, কুশলাদি বিনিময়,পারস্পরিক সহযোগিতা এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বিশ্বব্যাপী প্রশংশিত। কিন্তু‘ সাম্প্রতিক জঙ্গিবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতার আড়ালে অসম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের সুদুরপ্রসারী চক্রান্ত দানবীয় ভয়াল মূর্তি ধারণ করছে দিনে দিনে। এই ভয়ঙ্কর আতঙ্ক দেশপ্রেমিক নাগরিকদের ভাবিয়ে তুলছে। মানবতার জন্য এই অপশক্তি এখন বিশ্বব্যাপি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বদরবারে দেশের ভাবমর্যাদা বিনষ্ট এবং স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে হুমকিগ্রস্ত করার সুদুরপ্রসারী চক্রান্তে মেতে উঠেছে স্বার্থান্বেষী মহল। মসজিদ-মন্দির-উপসনালয়ে ধ্বংসযঞ্জ, ভিন্নধর্মাবলম্বীদের হত্যা, বাড়ি ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, লুট এমন কী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধিয়ে সার্বভৌমত্ব ও ভৌগলিক অখন্ডতাকে হুমকিগ্রস্ত করার দুরভিসন্ধি অমুলক নয়।

আধুনিক বিশ্বসভ্যতায় কোন ধর্ম সন্ত্রাসবাদ-জঙ্গীবাদকে সমর্থন করেনা। মানবতাবিরোধী কাজের কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে প্রত্যেক ধর্মে। ইসলাম ধর্র্মে সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গীবাদের শাস্তি মৃত্যুদন্ড। কিন্তু সাম্প্রতিক হলি আটিজেন মর্মান্তিক হত্যাকান্ড, ষোলকিয়া কেলেংকারিসহ নানা ধরণের ন্যাক্কারজনক ঘটনা দেশের সুদীর্ঘ শান্তিময় সহাবস্থানের ঐতিহ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। মুক্ত চিন্তার লেখক হত্যা, শিক্ষক হত্যা এবং বিদেশী নাগরিক হত্যাকান্ডের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার ফন্দিফিকিরে ব্যস্ত রয়েছে জঙ্গীগোষ্ঠি। দেশজুড়ে সাম্প্রতিক ধর্মীয় নৃগোষ্ঠীর ওপর সংঘটিত হামলা, তাদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ দেশপ্রেমিকদের ভাবিয়ে তুলছে। এর পেছনে দেশি-বিদেশী ষড়যন্ত্র থাকলে তার শেকড় এখনই উপড়ে ফেলতে হবে দেশের স্বাধীনতা, অখন্ডতা এবং সাবভৌমত্বকে নিরাপদ রাখতে।
দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মগজ ধোলাই করে ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে নাশকতামুলক কর্মকান্ড চালানোর তৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে। এ জঙ্গিগোষ্ঠী তাদের অপকর্মের রসদ জোগানদিতে ব্যাংক ডাকাতির মত ঘটনাও ঘটিয়েছে। দেশ জাতি সমাজ স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব এবং ইসলামসহ সকল ধর্মের শান্তিময় মর্মার্থ এই দানব শক্তির কাছে আমরা পরাভুত হতে দিতে পারিনা। জাতিধর্ম নির্বিশেষে এই দানব শক্তিকে রুখে শান্তিময় বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বজ্রকঠিন শপথ নিতে হবে।

১৯৬৪ সালে তদানীন্তন আইয়ুব-মোনায়েম সরকারের সরাসরি উদ্যোগে ঢাকা ও অন্যান্য অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধে। এতেও বহু হিন্দু নাগরিক নিহত হন। কিন্তু তখন বাঙালি মধ্যবিত্ত মুসলমান এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আহ্বায়ক এবং কমিউনিস্ট পার্টির আলী আকসাদকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হয়েছিল। তাদের নেতৃত্বে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে একধরণের জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠে। বাঙ্গালী জাতির জনক হিসেবে সুযোগ্য নেতৃত্বদানের ভবিষ্যৎ অসাম্প্রদায়িক নেতা হিবেবে আগাম জানান দিয়েছিলেন দাঙ্গা দমনের অপরিসীম সাহসিকতা এবং বুদ্ধিমত্তায়। এদিকে এর আগেই হিন্দু-মুসলমানের ধর্মীয় বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে ইংরেজ শাসকেরা উচ্চবর্ণ হিন্দু ও সমভ্রান্ত মুসলমানের মধ্যেই পারস্পরিক বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল। কখনো কখনো তা গরিব শ্রেণির মধ্যে প্রসারিত হলেও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৯০৬ সালে ব্রিটিশ শাসকদের সরাসরি মদদে সৃষ্টি হয়েছিল দুটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ এবং হিন্দু মহাসভা নেতারা নেপথ্যে উস্কানি দিয়েছিলেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের মদদেই পাকিস্তান আন্দোলন হয়েছিল। ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট বাংলার মুসলিম লীগ সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়। হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের দাঙ্গাবাজেরা তাতে অংশ নেয়। অথচ সে বছরই ফেব্রুয়ারি মাসে সংঘটিত হয়েছিল ঐতিহাসিক নৌবিদ্রোহ, ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে হিন্দু-মুসলমান নাবিকদের সশস্ত্র অভ্যুত্থান। আজাদ-হিন্দ ফৌজের সৈনিকদের বিচার শুরু হলে রশীদ আলী দিবসকে কেন্দ্র করে কলকাতায় গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল। এতে হিন্দু-মুসলমান উভয় ধর্মেও লোক অংশ নেন। এর মাত্র কয়েক মাস পর ১৯৪৬ এর নভেম্বর মাস থেকে শুরু হলো গ্রামবাংলা-কাঁপানো তেভাগা আন্দোলন। আবার হিন্দু-মুসলমানের মিলিত লড়াই।

উপমহাদেশে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তন করেছিলেন সুফিবাদী ধর্ম প্রচারকগণ। সুফি মতবাদে ছিল মানবতাবাদ ও উদারনৈতিক মনোভাব। অন্যদিকে ইসলাম ধর্ম প্রবর্তনের আগেই এ দেশে সহজিয়া মতবাদ নামে একটি বেদবিরোধী লোকায়ত দর্শন ও সংস্কৃতির অপরিসীম প্রভাব ছিল। এই লোকায়ত মতবাদের শ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ শ্রীচৈতন্য, কবি চন্ডীদাস এবং বাউল সাধকেরা। তাদের গান ছিল রবীন্দ্রনাথের ভাষায় গ্রামীণ গরিব জনগণের আদরের ধন। ঐতিহাসিক সুজিত আচার্য প্রমাণসহ দেখিয়েছেন যে, মধ্যযুগে বাংলার নিম্নবর্ণের হিন্দুরা তাঁদের লোকায়ত দর্শন ও সংস্কৃতির সঙ্গে সুফি মতবাদী ইসলাম প্রচারকদের চিন্তাধারার ও জীবনাচরণের সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছিলেন।উচ্চবর্ণ হিন্দু ও তথাকথিত সম্ভ্রান্ত মুসলমানদের প্রতিক্রিয়াশীল ধারণা সাধারণ গরিব হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে কখনোই ছিল না।
পার্বত্য জনসংহতি সমিতি ও অধুনালুপ্ত শান্তিবাহিনীর একজন শীর্ষ নেতা হিন্দু সম্প্রদায়কে পার্শবর্তী দেশে যাবার সুযোগ করে দিতে রাষ্ট্রের কাছে দাবি জানিয়ে দেশি বিদেশি ষড়যন্ত্রেও সূতিকাগার উন্মোচনের সুযোগ এনে দিয়েছেণ। তাদের সঙ্গে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শান্তিচুক্তি করেছিলেন। দেশের মধ্যে গোষ্ঠীগত বিভেদের দেয়াল উপড়ে ফেলে তিনি জাতির পিতার আদর্শ অনুসরণ এবং ক্ষমার অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পার্বত্য এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন উপজাতীয় অঞ্চলে ব্যাপক উন্নয়ণ করেছেন। তাদের জীবনমান আধুনিকতার ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে অব্যাহত গতিতে। পুরনো ধ্যান ধারনা পাল্টে দিয়েছেন উন্নয়ণ এবং ভালবাসার ফল্গুধারায়। তার পরেও শান্তিপ্রিয় নৃগোষ্টীসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার অপচেষ্টার কমতি নেই ষড়যন্ত্রকারীদের। দেশে বসবাসরত বিভিন্ন ধর্মীয় সংখ্যালঘু নৃগোষ্ঠীর ওপর প্যাকেজ হামলার নেপথ্য কারণ উদঘাটন এখন সময়ের দাবি। এর নেপথ্যে স্বাধীনতা বিরোধীসহ বহির্বিশ্বের কোন অপশক্তির ইন্দন থাকলে বিষদাত উপড়ে ফেলতে হবে।
আশার কথা জঙ্গিবাদ মূলোৎপাটনে বাংলাদেশ সরকার যথেষ্ট সফলও হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তথ্যমন্ত্রী এবং তার সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল প্রতিনিয়ত জঙ্গি বিরোধী বক্তব্য দিয়ে সারা দেশের জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে চলেছেন। র্যাব, পুলিশ বা অন্যান্য গোয়েন্দা সদস্যদের পাশাপাশি সচেতনতা সৃষ্টিতে দেশের সংবাদপত্রসেবিরা সাম্প্রদায়িকতা এবং জঙ্গি প্রতিরোধে ব্যপক ভূমিকা রেখে চলেছেন। সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গি প্রতিরোধ, দেশ গঠন এবং উন্নয়ন কর্মকান্ডে সরকারের অন্যান্য সংস্থার ন্যায় গণমাধ্যম কর্মিদের ভূমিকা অপরিসীম। সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা পাচ্ছে স্বীকৃকি এবং সুবিধা। তাদের বেতন ও সুযোগ সুবিধা দ্বিগুন করেছে সরকার। অন্যদিকে সাংবাদিকদের জীবনের ঝুকিই বেড়ে চলেছে। কিন্তু অকুতোভয় সাংবাদিকতার স্বীকৃতি, আথিক নিরাপত্তা বা সামাজিক মর্যাদা বঞ্চিত থাকছেন প্রযুক্তিনির্ভর ও কলম সৈনিকেরা। বাঁচার মতো আর্থিক সুযোগ সুবিধা ক’জনের ভাগ্যে জুটছে তা কারো অজানা নয়।
‘সাপ্তাহিক পত্রিকা পরিষদ’ দেশের সকল সাপ্তাহিক সংবাদপত্রের সম্পাদক ও প্রকাশকদের ঐক্যবদ্ধ একটি রেজিষ্টার্ড সংগঠন। এই সংগঠনটি দেশের সকল সাপ্তাহিক, পাক্ষিক এবং মাসিক পত্রিকার সমস্যা সমাধানই নয় বরং দেশের আর্থসামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ণ, সন্ত্রাস, জঙ্গীবাদ এবং মানবতাবিরোধীদের রুখতে জনমত সৃস্টি করে চলেছে। সুস্থ্যসাংবাদিকতার বিকাশ, কুরুচিপূর্ণ ও অপসাংবাদিকতা রোধে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে অঙ্গীকারবদ্ধ। পাশাপাশি সাংবাদিকদের স্বার্থ সংরক্ষণের মাধ্যমে দেশ ও জাতি গঠনে অতন্দ্র প্রহরীর মত কাজ করে চলছে। দেশের নানা ক্রান্তিকালেœ এই প্রতিষ্ঠান সভা-সেমিনার, র্যালিসহ বিভিন্ন দিবস উদ্যাপন করে আসছে। সরকারের ভিষণ বাস্তবায়নে, সমাজ সচেতনতা বৃদ্ধিতে, উন্নয়ন ও দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করে সরকারের বিভিন্ন সংস্থাকে সহযোগিতার মাধ্যমে ডিজিটাল বংাংলাদেশ গড়ার নিরন্তর সংগ্রামে একযোগে নিরলসভাবে কাজ করে চলছে। রাষ্ট্রের অগ্রগতিতে এ সেক্টরের ভূমিকা অতিব গুরুত্বপূর্ণ।
এ শিল্পের সাথে জড়িত রয়েছেন সম্পাদক-প্রকাশক, সংবাদকর্মী, বিপণন কর্মী, উৎপাদন কর্মী, সাধারণ শ্রমিকসহ একটি বিশাল নেটওয়ার্কে এক কর্মযজ্ঞ জনশক্তি। বড়ই পরিতাপের বিষয় জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোর মতো ক্রোড়পত্র, টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত থাকছে সাপ্তাহিক পত্রিকা। বিভিন্ন সরকারের কাছে দাবি জানালেও সাপ্তাহিক পত্রিকার সমস্যা সমাধানে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলোতে নিয়োজিত সংবাদকর্মীগন জীবনের ঝুকি নিয়ে, রাজস্ব ফাঁকিবাজ, চোরাচালানি, মজুদদার, সরকারি ভূমি দখলবাজ তথা ভূমিদস্যু, খাদ্যে ভেজালকারী, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের মুখোশ উন্মেচন এবং চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে। এতে করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সকল গোয়েন্দা সংস্থা, রাজস্ব বিভাগ এবং দুদকসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে সহযোগিতা করে যাচ্ছে। ফলে ভয়ঙ্কর অপরাধীদের জিঙ্গাংসার শিকার হয়ে অনেক সাংবাদিক জীবন বিসর্জন দিয়েছেন। সে সব সাংবাদিকের হত্যার বিচার আজও হয়নি। সম্পাদক বা সাংবাদিকের নামে হয়রানীমূলক মামলা বা নানা ধরণের ষড়যন্ত্রমুলক মামলায় অনেকেই আজো হয়রানী হচ্ছেন।
সরকারের যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার এবং নজরদারির অভাবে এ শিল্পটি আশানুরুপ বিকশিত হতে পারছে না। ফলে দেশের প্রায় সকল সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক পত্রিকাগুলো ভর্তুকি দিয়ে এ শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছে। এক সময় কাগজ দিয়ে, সুষ্ঠু বিজ্ঞাপন বন্টনের মাধ্যমে, ক্রোড়পত্র দিয়ে এ শিল্পকে সহযোগিতা করা হতো। এখন সাংবাদিক হয়রানীর এদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এ শিল্পের মত এত হ-য-ব-র-ল অবস্থা আর কোথাও পরিলক্ষিত হচ্ছেনা। তাই প্রেস বান্ধব সরকারের কাছে সমস্যার ন্যায়সঙ্গত ও যৌক্তিক সমাধান এখন সময়ের দাবি।
সংবাদপত্র শুধু রাষ্টের চতুর্থ স্তম্ভই নয়। এটি এখন বর্তমান সরকার কর্তৃক ঘোষিত একটি শিল্প। তাই এ শিল্পের উন্নয়নে সরকারের যথোপযুক্ত ভূমিকা রাখা আবশ্যক। জাতির বিবেক হিসাবে খ্যাত এই শিল্প খাতকে বাদ দিয়ে বা এড়িয়ে গিয়ে মধ্যম আয়ের দেশ নয়, বরং এর সঠিক প্রণোদনা ও পরিচর্যার মাধ্যমেই দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। আর এ জন্য প্রথমেই প্রেস কাউন্সিলকে যুগোপযোগী শক্তিশালীকরণ করতে হবে। সারা দেশে রাজধানী থেকে শুরু করে প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে সাংবাদিকদের সংগঠন বিরাজ করছে।
দেশে কতগুলো সংগঠন রয়েছে, কতগুলো সংবাদপত্র বের হচ্ছে, কতজন সাংবাদিক দেশে রয়েছেন, এসব সাংবাদিক এর অধিকার রক্ষা হচ্ছে কিনা, এদের কর্মের পুরস্কার বা অপরাধের তিরস্কার; এর মানসম্মত কার্যত কোন পদক্ষেপ নেই। জাতির বিবেক হিসেবে পরিচিত এসকল সাংবাদিকগনকে মানহানির মত মামলায়ও চোর, ডাকাত, খুনি অপরাধীদের সাথে আদালতে দাঁড়াতে হয়। এ সেক্টরে সারা দেশে কত সাংবাদিক কাজ করছে, কত সংগঠন রয়েছে এর প্রকৃত কোন তথ্য চিত্র তথ্য মন্ত্রণালয় বা তথ্য অধিদফতর বা কোন দায়িত্বশীল সংস্থার কাছে নেই। এ মুহুর্তে যার যার কাছে যে ধারণা রয়েছে বা যে রেকর্ড রয়েছে তার চিত্রই তিনি দিতে পারবেন। এটি প্রকৃত চিত্র নয়। দেশে কয়টি পত্রিকা বের হচ্ছে, কোথায় থেকে বের হচ্ছে, এর সঠিক চিত্র চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরেও নেই। সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সংগঠনগুলোরও একটি শৃংখলা থাকা আবশ্যক। সে জন্য উক্ত সংগঠনগুলোরও নিবন্ধন পদ্ধতি, বিধিমালা প্রনয়ন সহ জাতীয় নীতিমালা আবশ্যক। এ নীতিমালা না থাকায় অনেক অপেশাদার ব্যাক্তি যেমন-পান দোকানদার, মাদক ব্যবসায়ী, ডিম বিক্রেতা, ভূমিদস্যুগন, কালোবাজারী, নারী শিশু পাচারকারী সহ নানা পেশার নানা অনৈতিক লোকজন এখন সাংবাদিকতার কার্ড বহন করে সাংবাদিক সেজেছেন। এতে করে প্রকৃত পেশাদার সাংবাদিকদের ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে। ফলে এ পেশায় এক প্রকার নৈরাজ্য চলছে। বিভিন্ন পেশায় যেমন রেজিষ্টেশন থাকা বাধ্যতামূলক, তেমনি সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা, নৈতিকতা, বাধ্যবাধকতা, দায়বদ্ধতা থাকা আবশ্যক। তা না হলে ভবিষ্যতে এ পেশায় চরম নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে। যা জাতির বিবেক হিসাবে পরিচিত রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভকেই নয় এ শিল্পেরও ব্যাপক ক্ষতি হবে। যা সংঙ্গত কারণে রাষ্ট্রেরও ক্ষতির আশংকা থাকে।
সাংবাদিকতা পেশার উৎকর্ষসাধন এবং রাষ্ট্রীয় কল্যাণে পরিষদের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব উপস্থাপন করা হ’ল। ১. সকল সাপ্তাহিক পত্রিকা সংক্রান্ত যাবতীয় মামলা মোকদ্দমা প্রেস কাউন্সিল কর্তৃক সমাধান করতে হবে।
২.ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন কমিটি এবং বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলে সাপ্তাহিক পত্রিকা পরিষদের মনোনিত অন্তত দু’জনকে সদস্য অর্ন্তভুক্ত করতে হবে।
৩.সকল জাতীয় দিবসে সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলোকে ক্রোড়পত্রের বরাদ্দ দিতে হবে। সকল সাপ্তাহিক পত্রিকার বিজ্ঞাপনের মূল্যহার যুক্তিসঙ্গতভাবে বাড়াতে হবে। টেন্ডার বিজ্ঞাপনসহ সকল বিজ্ঞাপনের ৫০ ভাগ সাপ্তাহিক পত্রিকার জন্য বরাদ্ধ দিতে হবে। সকল সরকারী বেসরকারী, ব্যাংক বীমা, আর্থিক লগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানের ডিসপ্লে বিজ্ঞাপন বরাদ্দ দিতে হবে।
৪. বিজ্ঞাপন এর বিল থেকে সার্ভিস চার্জ ব্যাতিত সকল ভ্যাট ট্যাক্স কর্তন বন্ধ করতে হবে এবং বিজ্ঞাপন প্রদানের ক্ষেত্রে সকল প্রকার অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও হয়রানী বন্ধ করতে হবে। প্রতি বৎসর একটি জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে প্রচার সংখ্যার নিরীখে মূল্যায়ন বা প্রণোদনা প্রদান করতে হবে।
৫. সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক পত্রিকার জন্য যুগোপযোগী নীতিমালা এবং ছাপাখানা আইন যুগোপযোগী করতে হবে। প্রেস কাউন্সিল আইন যুগোপযুগি, দেশের সকল সাংবাদিক এবং সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নিবন্ধন, নীতিমালা প্রনয়ন এবং ওয়েবসাইটে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
৬. প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে সাংবাদিকদের নিবন্ধন ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা। নূন্যতম এইচ এস সি পাস হলে সংবাদদাতা এবং ডিগ্রি পাশ হলে সম্পাদক হবার নূন্যতম যোগ্যতা নির্ধারণ করতে হবে। দেশের সকল সাংবাদিক ও সংগঠনগুলোর যাবতীয় তথ্যাদি প্রেস কাউন্সিলের ওয়েব সাইটে অন্তর্ভুক্ত করা।
৭. মিডিয়া পল্লী সৃষ্টি করে পত্রিকাগুলোকে অফিস, প্রেস করার জন্য প্লট, ফ্লাট বরাদ্দ প্রদান করতে হবে। সাপ্তাহিক পত্রিকার সাংবাদিকদের আবাসনের সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে প্লট, ফ্লাট বরাদ্দ করতে হবে।
৮.অবসর ভাতা, অসচ্ছল ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, ঝুঁকি ভাতা প্রদান করা।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে গত ১৫ নভেম্বর সাপ্তাহিক পত্রিকা পরিষদ আয়োজিত “সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ দমনে মিডিয়ার ভূমিকা” শীর্ষক সেমিনারে পঠিত মূল নিবন্ধ। নিবন্ধকার পরিষদেও সাধারণ সম্পাদক এবং সাপ্তাহিক অপরাধ বিচিত্রার সম্পাদক। (সংক্ষেপিত ও সংশোধিত)।


