: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ভারত সফরে দেশটি সবকিছু দিয়ে এসে বিনিময়ে ‘কিছুই নিয়ে আসতে পারেননি’ দাবি করে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘এটি চরম ব্যর্থ এক সফর।’ বুধবার বিকেলে রাজধানীর গুলশানে নিজের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ভার সফর নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই মন্তব্য করেন তিনি। বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীকে কতগুলো আশ্বাস নিয়ে খালি হাতে ফিরে আসতে হয়েছে। শুধু তাই নয়, অতীতের ধারাবাহিকতায় ভারতের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ও প্রস্তাবিত বিষয়গুলোতেই কেবল অনেকগুলো চুক্তি ও সমঝোতা সই করা হয়েছে। এই সফরকে দেশবাসী কেবলই দেওয়ার এবং কোনো কিছুই না পাবার এক চরম ব্যর্থ সফর বলেই মনে করে।’ তিনি বলেন, ‘জনসাধারণের মতামতকে উপেক্ষা করে এ ধরনের স্পর্শকাতর বিষয়ে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক সই করা হয়েছে। এর সুদূরপ্রসারী বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে বলে বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে আমরাও শংকিত।’ ‘জাতিকে অন্ধকারে রেখে’ দু’দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষার মতো চুক্তি বা সমঝোতা অবিশ্বাসকে আরো ঘণীভূত করা হয়েছে বলেও মনে করেন প্রাক্তন এই প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ভারত সফরকালে শেখ হাসিনা জাথীয় স্বার্থ সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে দৃঢ় ভূমিকা পালন করলে আমরা অকুণ্ঠ চিত্তে তার সেই ভূমিকার প্রতি সমর্থন জানাতাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তিনি তা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। বরং তিনি বাংলাদেশকে ভারতের সামরিক পরিকল্পনার অংশ করে এসেছেন।’ বিএনপি নেত্রী বলেন, ‘শেখ হাসিনা নিজেই স্বীকার করেছেন যে, তিনি দিল্লিতে কিছু চাইতে যাননি। কেবল বন্ধুত্বের জন্য গিয়েছিলেন এবং সেটা তিনি পেয়েছেন। এই কথার মাধ্যমে শেখ হাসিনা প্রকারান্তরে মেনে নিয়েছেন যে, ভারত থেকে তিনি দেশের জন্য কিছুই নিয়ে আসতে পারেননি। বরং ভারতের চাহিদা মোতাবেক সবকিছুই দিয়ে এসেছেন।’ চুক্তি ও সমঝোতার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী প্রতি আস্থা রাখার আহ্বানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘দুঃখের বিষয়, তার উপর আস্থা রেখে দেশবাসী আজ পর্যন্ত কোনো কিছুই অর্জন করতে পারেনি। বরং ভোট দেয়ার অধিকারসহ বিভিন্ন অধিকার হারিয়েছে। তার ওপর আস্থা রেখে অতীতে জনগণ দেখেছে তিনি একের পর এক জাতীয় স্বার্থবিরোধী অসংখ্য চুক্তি করেছেন। ভারতকে একতরফাভাবে কেবল দিয়েই এসেছেন। বিনিময়ে কিছুই আনতে পারেননি।’ “এবারেও জনগণ চরম হতাশা ও বেদনার সঙ্গে লক্ষ্য করলো যে, নিরাপত্তা সহযোগিতা, অস্ত্র ক্রয়, লাইন অব ক্রেডিট ঋণ, পারমাণবিক প্রকল্পে সহযোগিতা, ডিজেল ও বিদ্যুৎ আমদানিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি যে সব চুক্তি ও সমঝোতায় সই করেছেন; তাতে বাংলাদেশের ওপর ভারতের সামরিক, রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্যই কেবল বাড়বে”, বলেন বিএনপি প্রধান। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা, গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্প, সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং বাংলাদেশী রফতানি-পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর করার মতো বিষয়গুলোতে কোনোই অগ্রগতি না হওয়ায় এর সমালোচনা করেন খালেদা জিয়া। সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয় বলেই চুক্তি বা সমঝোতার ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ করতে পারেনি মন্তব্য করে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ‘শেখ হাসিনা বলেছেন, এই সফরে তিনি তৃপ্ত। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ এই সফরের ফলাফলে তৃপ্ত তো নয়ই বরং আতঙ্কিত। তারা জাতীয় স্বার্থবিরোধী একগাদা চুক্তি ও সমঝোতা চায়নি। হিসাবের পাওনা চেয়েছে।’ বিএনপি ভারতের সঙ্গে কোনো বৈরিতা চায় না জানিয়ে দলটির প্রধান বলেন, ‘‘আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে ভারতের সহযোগিতার কথা আমরা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি। সেই স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তুলতে বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সব বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার নিরসনের নীতিতে আমরা বিশ্বাসী।’ “কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক দেশ হওয়া সত্বেও প্রতিবেশী বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ব্যাহত করতে ভারতের বিগত শাসকদের একতরফা ভূমিকায় বাংলাদেশের মানুষ ক্ষুব্ধ। আমরা আশা করি, ভারতের বর্তমান সরকার অতীতের সেই ভুল থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশের গণতন্ত্রপ্রিয় জনগণের মনোভাবের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবেন”, বলেন তিনি।
পানির ন্যায্য হিস্যা অধিকার
ভাটির দেশ হিসাবে পানির ন্যায্য হিস্যা বাংলাদেশের অধিকার উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘তিস্তার পানি বন্টনের বিষয়টি দুই সার্বভৌম দেশের মধ্যকার বিষয়। এ জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকেই বিষয়টি ফয়সালা করতে হবে। তৃতীয় পক্ষ হিসেবে ভারতের একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে দুই দেশের মধ্যেকার আলোচনায় সংশ্লিষ্ট করায় বাংলাদেশের সার্বভৌম মর্যাদা ক্ষুন্ন হয়েছে।’
ভারতের অস্ত্র মানসম্মত হবে না
ভারত থেকে অস্ত্র আমদানি করলে সেই অস্ত্র মানসম্পন্ন হবে না জানিয়ে বিএনপি নেত্রী বলেন, ‘আমাদের সশস্ত্রবাহিনী এখন বিভিন্ন দিক দিয়ে আন্তর্জাতিক উচ্চমান অর্জন করেছে। কোনো অস্ত্র আমদানিকারক দেশ থেকে এই বাহিনীর জন্য অস্ত্র সংগ্রহ করলে সেই মানের উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি রয়েছে। এক্ষেত্রে তৃতীয় কোনো দেশের সম্পৃক্ততার ফলে বাংলাদেশের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।’
সরকার ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছে
সরকার ধর্ম নিয়ে রাজনীতি শুরু করেছে মন্তব্য করে খালেদা জিয়া বলেন, ‘তিনি (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) নিজেই ধর্ম নিয়ে রাজনীতি শুরু করেছেন। অতীতেও ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করার লক্ষ্যে দেশে ইসলামী শরিয়তী আইন চালুর জন্য একই ধর্মভিত্তিক দলের সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন। এখন কওমী মাদ্রাসা সনদকে স্বীকৃতি দেয়ার কথা বলে ধোঁকা দিচ্ছেন।’
এ সময় তার সরকারের শামনামলে মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়নে নেওয়া পদক্ষেপ তুলে ধরেন বিএনপি প্রধান।
প্রধামন্ত্রীর বক্তব্য অসত্য
‘বিদেশীরা এদেশে বিএনপিকে ক্ষমতায় বসাতে চক্রান্ত করেছিল বলে’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে বক্তব্য রেখেছেন সেটিকে ‘সম্পূর্ণ অসত্য’ হিসেভে অভিহিত করেন খালেদা জিয়া।
তিনি বলেন, ‘বিদেশী চক্রান্তে নয়, জনগণের ভোটেই বিএনপি সবসময় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। বরং আওয়ামী লীগই ভোট ছাড়া বিদেশী মদদ নিয়ে ক্ষমতায় আসার খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। শেখ হাসিনার অভিযোগের জবাবে আমি বলতে চাই, সশস্ত্রবাহিনীকে রাজনৈতিক স্বার্থে বিএনপি কখনো ব্যবহার করেনি। তারাই করেছেন। তারা সশস্ত্র বাহিনী সদস্যদের বাধ্যতামূলকভাবে একমাত্র রাজনৈতিক দল বাকশাল-এর অন্তর্ভূক্ত করেছিলেন।’
জনগণ ন্যায্য পাওনার বিষয়ে জানতে চায়
খালেদা জিয়া বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ভারত সফরকালে শেখ হাসিনাকে কে স্বাগত জানালো, কোথায় রাখা হলো, কেমন সংবর্ধনা দেওয়া হলো, তার এবং তার পিতার কী কী প্রশংসা করা হলো তাতেই বাংলাদেশের জনগণ খুশি নয়। বাংলাদেশের মানুষ আপ্যায়নের চাইতে তাদের ন্যায্য পাওনা কী এসেছে সেটা জানতে চায়। সেটা চুক্তি বা সমঝোতা স্মারকের সংখ্যা ও বন্ধুত্বের কথামালার উপর নির্ভর করে না।’
বিএনপি প্রধান বলেন, ‘দু’দেশের যৌথ ইশতেহারে যে গণতন্ত্রের কথা বলা হয়েছে বাংলাদেশে এখন সেই গণতন্ত্র নেই। জনগণের কোনো অধিকার নেই। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার নেই। জনগণ তাদের অধিকার ও গণতন্ত্র ফিরে পাবার জন্য সংগ্রাম করছে। গণতান্ত্রিক ভারতের অবস্থান সেই গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে থাকবে সেটাই সকলের প্রত্যাশা। তাহলেই দু’দেশের জনগণের মধ্যে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা আরো দৃঢ় ও ফলপ্রসূ হবে।’
বিএনপি ক্ষমতায় এলে চুক্তি পুনর্মল্যায়ন
চুক্তির বিষয়ে বিএনপি কোনো কর্মসূচিতে যাবে কী না এবং ক্ষমতায় এলে এগুলো পুনর্ম্যল্যায়ন করবে কী না জানতে চাইলে খালেদা জিয়া বলেন, ‘বিএনপি সময় সময় দেশের স্বাধীনতা ও স্বার্বভৌমত্ব বিরোধী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে আসছে। আসকের প্রেস বিফিংও সেই ধারাবাহিবতার অংশ।’
বিএনপি ক্ষমতায় এলে দেশ বিরোধী বা দেশের ক্ষতি হয় এমন চুক্তি ও সমঝোতা পুনর্মূল্যায়ণ করবে বলে জানান প্রাক্তন এই প্রধানমন্ত্রী।
বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে চীনের সঙ্গে অস্ত্র আমদানির চুক্তির বিষয়ে অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘চীনের অস্ত্র অত্যন্ত আধুনিক এবং তা ব্যবহার সহজ। আমাদেও বাহিনীগুলো ওই অস্ত্র ব্যভহার করেই অভ্যস্ত। তাছাড়া অস্ত্র আমদানি চুক্তির আগে সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে আলোচনা করেই অর্থাৎ তারা কি ধরনের অস্ত্র চায়-এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
সুপ্রীম কোর্ট প্রাঙ্গন থেকে গ্রীক দেবীর মুক্তি সরানোর বিষয়ে বিএনপির অবস্থান জানতে চাইলে খালেদা জিয়া বলেন, এই বিষয়ে এখনো স্পষ্ট করে তিনি কিছু জানেন না।
তিনি বলেন, এটা যখন সুপ্রীম কোর্ট অঙ্গনে স্থাপিত হয়েছে, তখন এটি সেখানকার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। কি করবেন, না করবেন ওনারাই ভালো জানেন।
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, জমিরউদ্দিন সরকার, লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া বিএনপি নেতাদের মধ্যে ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, মীল নাছির, সেলিমা রহমান, রুহুল আলম চৌধুরী, আহমদ আজম খান, আবদুল মান্নান, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, শওকত মাহমুদ, আবদুল আউয়াল মিন্টু, ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, হাবিবুর রহমান হাবিব উপস্থিত ছিলেন।
২০ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর মধ্যে জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য আবদুল হালিম, কল্যান পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, জাগপার সভাপতি শফিউল আলম প্রধান, বিজেপির সভাপতি আন্দালিব রহমান পার্থ, এনপিপি সভাপতি ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, বাংলাদেশ ন্যাপ চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান প্রমুখ।
