অপরাধ বিচিত্রাঃ
স¤পদের মান উন্নয়ন ও নিত্যনতুন কৌশলে আবার ঘুরে দাঁড়াতে চায় রূপালী ব্যাংক। ব্যাংকের নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আতাউর রহমান প্রধান রূপালী ব্যাংককে দেশের দ্বিতীয় শীর্ষ ব্যাংক হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ব্যাংকটিতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা রয়েছেন। তাঁদের কাছ থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন সূচক বিশেষ করে আমানত সংগ্রহ, শাখা বিস্তার, বিনিয়োগ, ঋণ প্রদানসহ নানা সূচকে উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে চাই। দেশের শীর্ষস্থানীয় রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক সোনালী ব্যাংকের পরেই অবস্থান হওয়ার কথা ছিল রূপালী ব্যাংকের। কিন্তু সেই অগ্রগতি কিছুটা থেমে গিয়েছিল। সেটাকে কাটিয়ে সবার সহযোগিতায় ব্যাংকটিকে সামনে এগিয়ে নিতে চাই। আগে শিল্প-কারখানা হতো খুলনায় আর ঋণ নেওয়া হতো ঢাকার কোনো ব্যাংকের শাখা থেকে। আবার যেমন শিল্প স্থাপন হতো ঢাকায়, ঋণ নেওয়া হতো ঢাকার বাইরের কোনো ব্যাংকের শাখা থেকে। এখন এই পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানালেন আতাউর রহমান প্রধান। তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে ঝামেলা কম পোহাতে ও শিল্প মালিকদের ঋণ প্রদান সহজীকরণের স্বার্থে যেখানে শিল্প-কারখানা স্থাপন করা হবে সেখানের ব্যাংকের শাখা থেকেই ঋণের প্রস্তাব আসতে হবে। এই পদ্ধতি ইতিমধ্যেই চালু করেছে রূপালী ব্যাংক। আগামীতে এই পদ্ধতিটি স্থায়ীভাবে অনুমোদন করার চেষ্টা চলছে। এটি করা গেলে ঋণ নিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি বা ঋণখেলাপি অনেকটা কমে আসবে। ব্যাংক নিয়ে নিজের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে এমডি আরো বলেন, ব্যাংকটির নেতিবাচক যেসব সূচক রয়েছে সেগুলো কমিয়ে আনার চেষ্টা করব। সিদ্ধান্তহীনতা, নতুন করে ঋণ না দিতে পারা, বিনিয়োগ বাড়ানোয় অক্ষমতা ইত্যাদির কারণে রূপালী ব্যাংক পিছিয়ে ছিল। ওই সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠে যথাসম্ভব এগোনো যায় সে চেষ্টাই করব। একনিষ্ঠ, একাগ্রতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করলে ভালো কিছু করা সম্ভব।
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক থেকে চলতি বছরের গত ২৮ আগস্ট রূপালী ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও এমডি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন আতাউর রহমান প্রধান। ১৯৮৪ সালে ফিন্যানশিয়াল অ্যানালিস্ট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে সোনালী ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সোনালী ব্যাংক ইউকে শাখার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও মহাব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ ৩৩ বছরের অভিজ্ঞ এই ব্যাংকার বলেন, খেলাপি ঋণ শ্রেণিবিন্যাস ও পুনর্বিন্যাস করে কমানো হবে। মন্দ ঋণকে ভালো ঋণে রূপান্তর করা আমার কাছে প্রধান বিবেচ্য বিষয়। প্রভিশন ঘাটতি, ক্যাপিটাল শর্টসব কিছুর মূলে হলো নন-পারফর্মিং লোন তথা মন্দ ঋণ। এটিকে যত তাড়াতাড়ি কমিয়ে সহনীয় মাত্রায় আনতে পারব তত তাড়াতাড়ি আমার ব্যাংকের স¤পদ ভালো হবে। আতাউর রহমান প্রধান বলেন, কিভাবে মন্দ ঋণ নন-পারফরমিং ঋণকে পারফরমিং করা যায় ও ঋণ বৃদ্ধি করা যায় সেটি নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। অতীতে যা-ই ঘটুক না কেন এখন থেকে ওইগুলো আর ওইভাবে ঘটতে দেওয়া যাবে না, সেই রকম পদক্ষেপ আমরা নিয়েছি। যে ঋণগুলো কুঋণ হয়ে গেছে, সেই ঋণগুলো শ্রেণিবিভাগ করে আমরা বিভিন্নভাবে আদায় করার চেষ্টা করছি। সর্বশেষ আমরা আইনের আশ্রয় নিচ্ছি। কর্মকর্তারা ঋণ দিতে ভয় পান, সেটির পেছনে নানাবিধ কারণ আছে। প্রথমে শক্তি, সুযোগ, দুর্বলতা ও হুমকি বিবেচনা করে এবং সার্বিক বিষয় বিশ্লেষণ করে লক্ষ্য ও কৌশল নির্ধারণ করতে চান। রূপালী ব্যাংকের নবনিযুক্ত এমডি বলেন, আমার প্রধান নীতি হবে সততা। আর সেটি আমার নিজের কাছ থেকেই শুরু করব। আমার সহকর্মী যদি জানেন আমি নৈতিকভাবে সৎ বা শক্তিশালী নই, তাহলে তিনি কেন আমাকে মানবেন। এখানে বিষয়টি হলো, যারা অনিয়ম বা অনৈতিক কাজের সঙ্গে স¤পর্কিত, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু তারা একজোট। যারা সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের মধ্যে কোনো জোট নেই এবং তাদের কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই। এখন আমি চেষ্টা করছি কিভাবে তাদের অনুপ্রাণিত করে একটি সঠিক জায়গায় নিয়ে যাওয়া যায়। ব্যাংকের ঋণ বিতরণ কার্যক্রম নিয়ে ব্যাংকের এই শীর্ষ নির্বাহী বলেন, কয়েকটি শাখার মাধ্যমে মোট ঋণের বেশির ভাগই বিতরণ করা হচ্ছে। বিকেন্দ্রীকরণের ওপর আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি। আমরা একটি ভারসাম্যপূর্ণ ঋণ পোর্টফোলিও তৈরি করতে চাচ্ছি। সরকার আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে, কর্মকর্তাসহ সবাই সহায়তা করলে রূপালী ব্যাংক একদিন ঘুরে দাড়াবে। আমি মনে করি সোনালী ব্যাংকের পরে রূপালী ব্যাংক হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু হয়নি। তবে আমরা চেষ্টা করব ওই ধারাটা ঠিক রাখা যায় কি না। কর্মকর্তাদের কাজের বিচার বিশ্লেষণ করে পদোন্নতি ও পুরস্কারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে জানিয়ে এমডি বলেন, অন্যদিকে কেউ অসদুপায় অবলম্বন কিংবা সামর্থ্যের প্রয়োজনীয়টুকু না দিলে তাদের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রতিষ্ঠানের প্রতি আকৃষ্ট করা, আগ্রহীদের মধ্য থেকে যোগ্যদের খুঁজে বের করে দায়িত্ব প্রদান করা, কর্মীদের অনুপ্রাণিত করা ও তাদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সুস¤পর্ক বজায় রাখা, তাদের কর্মজীবনে উত্তরোত্তর উন্নয়নের দিক উন্মোচিত করা, প্রয়োজনে কঠোর হওয়াসহ সব ধরনের পদক্ষপ গ্রহণ করা হবে। ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে নিয়ে আসার বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে আতাউর রহমান প্রধান বলেন, সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনতে না পারার পেছনে নন-পারফর্মিং ঋণ একটা বড় বাধা। আমরা যেদিন এই ঋণকে পারফর্মিং করতে পারব সেদিনই আমরা সিঙ্গেল ডিজিটে আসতে পারব। রূপালী ব্যাংকের যে রেমিট্যান্স প্রবাহ আছে তা একেবারে কমে যায়নি। কিভাবে রেমিট্যান্স বাড়ানো যায় সে বিষয়ে কাজ করা হচ্ছে জানিয়ে ব্যাংকের এমডি বলেন, বিদেশে আমাদের রেমিট্যান্স হাউস নেই। আমরা বিভিন্ন এজেন্টের মাধ্যমে কাজ করে থাকি। আমরা সার্ভে করে দেখব কোন কোন দেশে রেমিট্যান্স হাউস করলে আমাদের রেমিট্যান্স বাড়বে। কৃষিঋণ প্রসঙ্গে আতাউর রহমান প্রধান বলেন, আমাদের নন-পারফর্মিং ঋণ বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু আমরা কৃষিঋণও দিয়েছি। কৃষক উপকৃত হয়েছে, ফলে দেশের উন্নতি হয়েছে, উৎপাদন বেড়েছে, দেশ খাদ্যে স্বয়ংস¤পূর্ণ হয়েছে। একসময় আমরা আমদানি করতাম, এখন আমরা রপ্তানি করছি। এই উন্নয়নগুলো ব্যাংকের উপস্থিতিতে হয়েছে। কৃষিঋণ আরো বাড়ানোর চেষ্টা করছি। কেননা কৃষির উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নির্ভর করছে। আর কৃষিঋণের বহুমুখিতা আনতে সর্বাত্মক চেষ্টা করা হবে।

রূপালী ব্যাংকের উন্নয়নে নন পারফর্মিং ঋণ আদায়ের নির্দেশ
রূপালী ব্যাংকের ঋণ আদায় নিয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আতাউর রহমান প্রধান বলেছেন, ব্যাংকের উন্নয়নে নন পারফর্মিং ঋণ দ্রুত আদায় করতে হবে। অধিকহারে নন পারফর্মিং ঋণ আদায় করা হলে ব্যাংক ঋণের ওপর গ্রাহকদের সুদের হার হ্রাস করা সম্ভব হবে। এতে একদিকে যেমন ব্যাংকের ব্যবসা বাড়বে, অন্যদিকে দেশের আর্থিক খাতেরও উন্নতি হবে। সম্প্রতি রংপুর চেম্বার অব কমার্স এবং রূপালী ব্যাংকের গ্রাহকদের সঙ্গে এক সুধী সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। রংপুরের হোটেল নর্থ গার্ডেন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ মতবিনিময় সভায় রংপুর চেম্বার অব কমার্সের সভাপিত আবুল কাসেম, কার্যকরী সভাপতি মো. মোস্তফা, সহ-সভাপতি মোজাম্মেল হক, সহ-সভাপতি রাম কৃষ্ণ সোমানী, সোনালী ব্যাংকের রংপুর বিভাগীয় প্রধান ও জেনারেল ম্যানেজার মাহবুবুর রহমান, রূপালী ব্যাংকের রংপুর বিভাগের প্রধান ও মহাব্যবস্থাপক মো. কাইসুল হকসহ রূপালী ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের গ্রাহকরা উপস্থিত ছিলেন। আতাউর রহমান প্রধান বলেন, ব্যাংকের সুদ আগে পরিশোধ করতে হবে, পরে আসল। কোনোভাবেই সুদ মওকুফ করা হবে না। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) নিয়ে তিনি বলেন, এসএমই খাতে ঋণ বাড়াতে হবে। অঞ্চলভিত্তিক ছোট ছোট শিল্প খুঁজে বের করে ঋণ বিতরণ করতে হবে। এক্ষেত্রে সৃজনশীল উদ্যোক্তাদের ঋণগ্রহণে উৎসাহ দিতে হবে। তবে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে যথাযথ ডকুমেন্ট নিতে হবে। নতুন নতুন প্রডাক্টের বিপরীতে ঋণ বিতরণ করতে হবে। যেনো ব্যাংক ঋণ একীভূত প্রডাক্টে সীমিত না থাকে। রংপুর চেম্বার অব কমার্সের সভাপিত আবুল কাসেম বলেন, রংপুরে দারির্দ্যতা হ্রাস পেয়েছে, তবে দ্রারির্দ্যতা দূর হয়নি। যেখানে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় প্রায় এক হাজার ৩শ ৯০ ডলার, সেখানে রংপুরের মানুষের আয় মাত্র ৬শ ডলার। এর পরিবর্তন করতে হবে। আর পরিবর্তন করতে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে ব্যবসার উন্নয়ন করতে হবে। এক্ষেত্রে ব্যাংকের সার্বিক সহযোগিতা দরকার। রংপুরের উন্নয়নে তিনি রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. আতাউর রহমান প্রধানের সহযোগিতা চেয়েছেন।


