অজ্ঞাত রোগে ফুল, কাণ্ড ও গাছ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বিরুলিয়ার গোলাপচাষীদের মাথায় হাত। এ রোগে আক্রান্ত হয়ে একের পর এক বাগান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, বিষয়টি জানিয়ে কৃষি অফিসে ধরনা দিয়েও কোনো প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। তবে কৃষি কর্মকর্তারা এ রোগ শনাক্ত করতে ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেছেন। তারা এখন পর্যন্ত কোনো সমাধান দিতে পারেননি।
এর ফলে বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কায় রয়েছেন সাভারের ফুলচাষীরা। ‘গোলাপ গ্রাম’ নামে খ্যাত সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়ন। রাজধানীর বেড়িবাঁধসংলগ্ন কৃষিনির্ভর এ ইউনিয়নের ৯০ শতাংশ মানুষই নানা সবজি ও ফুল চাষে জড়িত। প্রায় ৩০ বছর ধরে এ ইউনিয়নের কালিয়াকৈর, বাগ্নিবাড়ি, সাদুল্লাহপুর, মৈস্তাপাড়া ও শ্যামপুরসহ অন্যান্য গ্রামে বছরজুড়ে বাণিজ্যিকভাবে গোলাপ চাষ হয়ে আসছে। অবশ্য গোলাপ ছাড়াও এখানে রজনীগন্ধা, গ্ল্যাডিওলাস ও অন্যান্য ফুল চাষ হয়। প্রতি বছর ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন দিবস ও অনুষ্ঠান বেশি থাকায় ফুলের চাহিদাও বাড়ে। এ সময় গোলাপের দাম ভালো থাকায় দিন-রাত পরিশ্রম করেন চাষীরা। কিন্তু এবার উল্টো চিত্র লক্ষ করা গেছে গোলাপ গ্রামে। গত মাস থেকে মড়ক লাগায় অধিকাংশ বাগানেই এখন কোনো গোলাপ নেই। ফুলচাষী সিরাজুল ইসলাম বলেন, প্রায় ১৫ বছর ধরে ১০ বিঘা জমিতে গোলাপ চাষ করে আসছেন। এ ব্যবসা থেকে ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করানোর পাশাপাশি একটি দোতলা পাকা বাড়িও করেছেন তিনি। কিন্তু এবার অজ্ঞাত রোগে তার পুরো বাগানই ধ্বংসের মুখে। কলি ধরার পর হঠাৎ সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। লাখ টাকার জৈব ও টিএসপি সার দিয়েও লাভ হচ্ছে না। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করেও মিলছে না কোনো প্রতিকার। সবজাল হোসেন, নুরু মিয়াসহ কয়েকজন ফুলচাষীর সঙ্গে কথা বলেও জানা যায় ভীতিকর পরিস্থিতির খবর। অজ্ঞাত এ রোগের হাত থেকে বাগান রক্ষায় তাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা কোনো কাজেই আসছে না। বিভিন্ন ধরনের বালাইনাশক ছিটিয়েও প্রতিকার পাচ্ছেন না। গোলাপের উৎপাদন কমেছে ব্যাপকহারে। এত দিন গোলাপ চাষ করে ভালো মুনাফা অর্জন করলেও এখন বিনিয়োগই ঝুঁকিতে পড়েছে চাষীদের। সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শীত মৌসুমে বিরুলিয়ার ছয়টি পাইকারি বাজারে প্রতিদিন ৬ থেকে ৮ লাখ টাকার গোলাপ বেচাকেনা হয়। কিন্তু এখন বিক্রি নেমে এসেছে এক/দেড় লাখ টাকায়। ফুলচাষীরা জানান, গত ডিসেম্বরে বৃষ্টির পর হঠাৎ গোলাপ গাছে এ রোগ দেখা দেয়। এতে প্রথমে ফুলের নিচের দিকের পাপড়ি কালো হয়ে যায়, পাতা নির্জীব হয়ে ঝুলে পড়ে। একপর্যায়ে কাণ্ড থেকে পুরো গাছে সংক্রমিত হয়ে গাছ মরে যায়। মৈস্তাপাড়া ফুল মার্কেটের ব্যবসায়ীরা জানান, অন্যান্য বছর এ সময় প্রতিদিন মার্কেটটিতে কমপক্ষে ১০ লাখ টাকার ফুল বেচাকেনা হতো। কিন্তু গত এক মাসে এক থেকে দেড় লাখ টাকায় নেমেছে। এ মার্কেট থেকে ফুল কিনে পাইকাররা মধ্যরাতে তা নিয়ে যান রাজধানীর শাহবাগ, আগারগাঁওসহ বিভিন্ন মার্কেটে। যেখান থেকে এ ফুল ছড়িয়ে পড়ে দেশের আনাচে-কানাচে। কিন্তু এবার অজানা রোগে গাছে মড়ক লাগায় বাজারে খুব কম গোলাপ আসছে। তবে ফুলচাষীদের সহযোগিতা না করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাভার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মফিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, এবার প্রচণ্ড ঠাণ্ডার কারণে পরিবেশের তাপমাত্রা অনেকখানি নেমে যায়। এ সময় কৃষকরা নিম্নমানের বালাই ও ছত্রাকনাশক ব্যবহার করায় কিছু বাগানে ফুলের ক্ষতি হয়েছে। তবে রোগটি শনাক্ত করতে না পারার কথা স্বীকার করেছেন তিনি; বলেছেন, বিষয়টি জানার পর আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

