কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় গ্রেফতার বাণিজ্য অসহায় নিরীহ মানুষ!

0
1320

নোমান মাহমুদ ঃ
পুলিশ জনগণের বন্ধু। কিন্তু কেরানীগঞ্জ মডেল থানা এলাকার সাধারণ নিরীহ মানুষের কাছে এখন, পুলিশ একটি আতঙ্কের নাম। বিগত কিছুদিন যাবৎ কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ওসি (অফিসার ইনচার্জ) ফেরদৌস ও এস.আই (উপ-পরিদর্শক) বাশার এর স্বেচ্ছাচারিতা ও মাদক বিরোধী অভিযানের নামে সাধারণ নিরীহ মানুষকে গ্রেফতার করে মোটা অংকের টাকা আদায়ের এই আজব গ্রেফতার বাণিজ্যের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছে কেরানীগঞ্জ মডেল থানার অন্তর্গত এলাকায় বসবাসরত এলাকাবাসী। অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকা জেলার অন্তর্গত ও বুড়িগঙ্গার নদীর তীরে অবস্থিত এই উপজেলায় প্রায় ৮ লক্ষ ৩০ হাজার মানুষের বসবাস। যার ঘনত্ব প্রতি বর্গ কি.মি. এ প্রায় ৫০০০ জন। আর এই বিপুল ঘনবসতিপূর্ণ উপজেলার সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে উপজেলাটিকে ২টি থানায় বিভক্ত করা হয়েছে, যার একটি এই কেরানীগঞ্জ মডেল থানা। বিগত দিনে এই এলাকায় কিছু ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসীর অবস্থান ও তাদের তান্ডব এলাকার সাধারণ মানুষের ঘুম কেড়ে নিলেও দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অক্লান্ত পরিশ্রমে এখানকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি হয়ে উঠেছিল অনেকটাই স্বাভাবিক। ফিরে এসেছিল এলাকার সাধারণ মানুষের চোখের ঘুম। আর সেই ঘুম আবারও হারিয়ে যেতে বসেছে কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় কর্মরত ওসি (অফিসার ইনচার্জ) ফেরদৗস ও এস.আই (উপ-পরিদর্শক) বাশারের স্বেচ্ছাচারিতায়। এলাকাবাসীর মনে সর্বক্ষণ ঘুরপাক খায়, এই বুঝি কাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় আর মুক্তির জন্য আদায় করে ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা। পরিবারের কোন সদস্যের মুক্তির জন্য একটু একটু করে স্ত্রী কিংবা সন্তানদের ভবিষ্যতের স্বার্থে জমানো কষ্টার্জিত সকল অর্থ কিংবা নিজেদের শেষ সম্বলটুকু বিক্রয় করে হলেও তাদের হাতে তুলে দিতে হবে মোটা অংকের টাকা। অন্যথায় নির্ঘাত জেল! মিথ্যা কিংবা পুরানো কোন মামলায় সারাজীবন মিথ্যা অপবাদের বোঝা নিয়ে পচে পচে মরতে হবে জেল নামক ঐ উচু দেয়ালে ঘেরা অন্ধকার কুঠুরিতে। আর এ সকল খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের মনে “পুলিশ জনগণের বন্ধু” কথাটি হয়ে উঠেছে হাস্যকর। গত ৯ই জুলাই, ২০১৬ ইং, সময় আনুমানিক রাত ১০:৩০ মিনিট। সি.এন.জি অটো রিক্সায় চড়ে এস.আই বাশার অভিযানের নামে হানা দেয় মধ্যচড়াইল এলাকায়। চড়াইল নূরুল হক উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন একটি লন্ড্রির দোকান থেকে বিদেশী মদের একটি বোতল পাওয়ার অভিযোগে আটক করা হয় চড়াইল নূরুল হক উচ্চ বিদ্যালয়ের দপ্তরী শহিদুলকে। তারপর জিজ্ঞাসাবাদের নামে ডেকে আনা হয় উক্ত লন্ড্রি দোকানের মালিক ও উক্ত বিদ্যালয়ের নৈশ প্রহরী বৃদ্ধ ইসমাইল হোসেনকে। এদের সততার পক্ষে এলাকাবাসী সাক্ষ্য দিলেও তা কানে তোলেন নি ঐ পুলিশ কর্মকর্তা। শহিদুলকে আটক দেখিয়ে ও জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলে মোঃ ইসমাইল হোসেনকে নিয়ে যাওয়া হয় থানায়। এরপর রাতভর বিভিন্ন বাড়িতে বাড়িতে হানা দিয়ে গ্রেফতার করা হয় আরও অনেককে। ইসমাইল হোসেন ও শহিদুলের কাছের মানুষরা এই নিরীহ দুই খেটে খাওয়া মানুষকে ছাড়াতে ঘুরতে থাকে ঐ পুলিশ কর্মকর্তার পিছু পিছু। রাত শেষ হয়ে এক সময় সকাল হয়। অবশেষে অনেক কাকুতি মিনতির পর দর কষাকষির এক পর্যায়ে তা নেমে দাড়ায় ৪০ হাজার টাকায়। পরবর্তীতে উপর মহলের প্রশ্নের সম্মুখিন হওয়া থেকে মুক্ত থাকতে ও নিজেদের অবস্থান ঠিক রাখতে মুচলেকা খ্যাত একটি কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে ৪০ হাজার টাকার বিনিময়ে থানা হতে মুক্তি দেওয়া হয় এই দুই নিরীহ মানুষকে। হায় দেশ! যেই জনগণের সেবা করার জন্য জনগণের রচিত সংবিধান আইন প্রণয়ন করে জনগণের কষ্টার্জিত অর্থে বেতন-ভাতা নির্ধারণ করে পুলিশ বাহিনী নিয়োগ দিয়েছে, আজ সেই পুলিশ কর্মকর্তা তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুই জন নিরীহ খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তাদের পরিবার পরিজনের জন্য গচ্ছিত অর্থ তো আদায় করলোই তার উপর মুচলেকা নামক কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে তাদের বানিয়ে রাখলো অপরাধী! তারপর দিন ১০ই জুলাই, ২০১৬ ইং। কোন একটি কাজে নিজের বাড়ীর সামনে দাড়াতেই একইভাবে অর্থ আদায়ের উদ্দেশ্যে আটক করা হয় বাঁকা চড়াইল বাসিন্দা আফজালকে। সেখানেও সেই সম্মানিত এস.আই (উপ-পরিদর্শক) বাশার। কিন্তু পূর্বের ঘটনা গুলো থেকে এলাকার বাসিন্দাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে এস.আই বাশারের উদ্দেশ্য, আর তাই ঝামেলা না বাড়িয়ে দর কষাকষির এক পর্যায়ে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে এস.আই বাশারের হাত থেকে ছাড়িয়ে রাখা হয় আফজালকে। কেননা আসামী থানায় নিয়ে গেলে এর চেয়ে ৩/৪ গুণ বেশি অর্থ গুনতে হবে ভুক্তভোগির পরিবারকে। শুধু আফজাল, ইসমাইল বা শহিদুলই নয়, রয়েছে এমন অসংখ্য ভুক্তভোগি। যাদের বিনা অপরাধে ধরে নিয়ে আদায় করা হয়েছে মোটা অংকের অর্থ। পুলিশ সদস্য কর্তৃক এই জাতীয় ঘটনা নতুন নয়। ইতিপূর্বেও এমন অনেক ঘটনায় পুলিশ বাহিনী বার বার আলোচনায় এসেছে। তাদের কারও বা বিচার হয়েছে আবার কেউ কেউ অজ্ঞাত কারণে পার পেয়ে গেছেন। পুলিশ কর্মকর্তাদের এ সকল অন্যায়, দূর্নীতি ও অসদাচরণের ধারাবাহিকতা এভাবে অব্যাহত থাকলে পুলিশ বাহিনীর প্রতি সাধারণ মানুষের মনের ধারণা এক সময় কোথায় গিয়ে দাড়াবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। একদিকে সমগ্র পুলিশ বাহিনী তাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা থেকে নিজেদের জীবন বাজি রেখে দেশ ও দেশের জনগণের জানমালের নিরাপত্তা ও দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন, অন্যদিকে গুটিকয়েক পুলিশ কর্মকর্তা বা সদস্যের কর্মকান্ডের জন্য গোটা পুলিশ বাহিনীর গায়ে কলঙ্কের ছাপ লেগে যাচ্ছে। কলঙ্কের কাছে মিলিয়ে যাচ্ছে তাদের সকল ত্যাগ আর অবদান। যা কোনভাবেই কাম্য নয়। এ ব্যাপারে কেরানীগঞ্জ মডেল থানাধীন কিছু ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসীর সাথে কথা বললে তারা অতিসত্বর এ সকল দর্নীতিবাজ পুলিশ কর্মকর্তাদের পুলিশ বাহিনী থেকে অপসারণের দাবী জানান। ওসি ফেরদৌস ও এস.আই বাশারের মত পুলিশ কর্মকর্তারা শুধু পুলিশ বাহিনীরই সুনাম ক্ষুন্ন করছে না, সেই সাথে নতুন করে বীজ বপন করছে অপরাধের। যা দেশ ও জাতির জন্য অত্যন্ত কলঙ্কজনক।

Advertisement
Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here