অপরাধ বিচিত্রাঃ
তাকসিম এ খান। ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। অনেকটা নিজের ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের মতোই পরিচালনা করেন রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠানকে। ওয়াসার কর্মকান্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে কারও ধার ধারেন না সরকার থেকে নিয়োগ পাওয়া এই এমডি। নিজেকে পরিচয় দেন প্রধানমন্ত্রী পরিবারের আত্মীয় হিসেবে। এমনকি ওয়াসা সরকারের যে মন্ত্রণালয়ের অধীন সেই স্থানীয় সরকার বিভাগের মন্ত্রীও এমডির কর্মকান্ড স¤পর্কে কিছুই জানেন না। তাকে জানানো হয় না। বরং মন্ত্রীকে পাশ কাটিয়ে চলে এমডির কর্মকান্ড। নিজের এমডি নিয়োগও হয়েছে মন্ত্রীকে বাইপাস করে। আর ওয়াসাতে যত নিয়োগ হয় সেগুলোও করেন তিনি নিজে। তার অত্যাচারেই চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে যেতে হয়েছে প্রকৌশলী রহমতুল্লাকে। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় তাকসিম এ খানের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ শুরু থেকেই। তবুও ওয়াসার লাগামহীন এই এমডি বহাল তবিয়তে। মন্ত্রণালয় এবং ওয়াসা সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, তাকসিম এ খান ওয়াসার এমডি হিসেবে প্রথম নিয়োগ পান মহাজোট সরকারের সময় ২০০৯ সালের ১৩ অক্টোবর। ওই সময়ে তার নিয়োগ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠে। নিয়োগের শর্ত ভঙ্গ করে স¤পূর্ণ অনিয়মতান্ত্রিকভাবে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এমডি নিয়োগের ক্ষেত্রে যেসব শর্ত ও অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয় সেই শর্তের কোনোটিই তাকসিম এ খানের নেই। তারপরও রহস্যজনকভাবে ওয়াসা বোর্ড তাকসিম এ খানকেই নিয়োগ দেয় এমডি হিসেবে। সূত্র জানায়, নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই ওয়াসাতে নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য ও প্রভাব বিস্তার করেন এমডি তাকসিম। বেপরোয়া হয়ে ওঠা এমডি ওয়াসার সব ধরনের কর্মকান্ডে শুরু করেন স্বেচ্ছাচারিতা। তার কথা ছাড়া ওয়াসার কোনো কর্মকান্ডই চলে না। আর তৃতীয় দফায় নিয়োগ পেয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন ওয়াসার চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রহমতুল্লাহর সঙ্গে। শুধু তাই নয়, একপর্যায়ে তিনি চেয়ারম্যানের বেতন ভাতা, গাড়িসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বন্ধ করে দেন। অথচ ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী মো. রহমতুল্লাহ ২০১২ সালের ৮ মে ঢাকা ওয়াসার চেয়ারম্যান পদে যোগ দিয়েছিলেন। ওয়াসা ও মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, যোগদানের পর থেকেই ওয়াসার বিভিন্ন পর্যায়ে নানা অনিয়ম ও এমডির একচ্ছত্র আধিপত্যের বিষয়টি নজরে আসে চেয়ারম্যানের। অভিযোগও জমা থাকে তার কাছে। এ নিয়ে চেযারম্যান ও এমডির মধ্যে দ্বন্দ্ব দীর্ঘায়িত হতে থাকে। কিন্তু এমডির প্রভাব ও আধিপত্যের কাছে অসহায় হয়ে পড়েন চেয়ারম্যান। যার ফলে স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনের পথে নানা প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়। তখন একপর্যায়ে বাধ্য হয়েই মো. রহমতুল্লাহ নিজের পদ থেকে অব্যাহতি চেয়ে তৎকালীন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। ওই পত্রে তিনি উল্লেখ করেন, ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে পুনঃনিয়োগে বোর্ডের সিদ্ধান্ত মানা হয়নি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আমাকে অব্যাহতি দেওয়া হোক।
তৃতীয় দফা নিয়োগের বিষয়ে জানেন না মন্ত্রী ঃ
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০১২ সালের ১৩ অক্টোবর ওয়াসার এমডি হিসেবে প্রথম দফায় তিন বছরের নিয়োগের মেয়াদ শেষ হলে স্বীয় পদে থাকতে মরিয়া হয়ে ওঠেন তাকসিম এ খান। তিনি পুনরায় তিন বছরের জন্য একই পদে নিয়োগ পেতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। যার ফলে ওয়াসা আইনকে পাশ কাটিয়েই ওয়াসা বোর্ড তিন বছরের পরিবর্তে এক বছরের জন্য তাকসিম এ খানকে দ্বিতীয়বারের মতো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়। ওই বছরের ১৩ অক্টোবর এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। তারপর আবারও তোড়জোড় শুরু করেন তাকসিম এ খান। মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আবারও ওয়াসার আইন ও নিয়ম ভেঙে কোনো ধরনের বিজ্ঞপ্তি এবং পরীক্ষা ছাড়াই তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। যদিও এমডি নিয়োগ না করার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ওয়াসা বোর্ডের ওপর চাপ ছিল। এ কারণে ১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ওয়াসা বোর্ডের সভায় এমডি নিয়োগের সিদ্ধান্ত স্থগিত করা হয়। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ও মন্ত্রীকে উপেক্ষা করে অদৃশ্য শক্তির ইশারায় স্থানীয় সরকার বিভাগের তৎকালীন সচিব আবু আলম মো. শহিদ খান ২৮ আগস্ট ওয়াসার এমডি নিয়োগের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি সারসংক্ষেপ পাঠান। তথ্য গোপন করে ওই সারসংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়, ঢাকা ওয়াসার দৈনন্দিন কাজ পরিচালনার ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ আইনের বিধান অনুসারে প্রকৌশলী তাকসিম এ খানকে স্বীয় পদে বোর্ডের সুপারিশ অনুযায়ী অবশিষ্ট দুই বছরের জন্য নিয়োগ করা যায়। বর্ণিত প্রেক্ষাপটে, ঢাকা ওয়াসা পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে প্রকৌশলী তাকসিম এ খানকে ১৫ অক্টোবর, ২০১৩ থেকে ১৪ অক্টোবর ২০১৫ সাল পর্যন্ত দুই বছরের নিয়োগের জন্য প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর সদয় বিবেচনা ও অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হলো। মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো ওই প্রস্তাবে তথ্য গোপন করা হয়েছে। ওই প্রস্তাবনায় ২১০তম বোর্ড সভার স্থগিত সিদ্ধান্তকে পাশ কাটিয়ে ১৯৮তম তামাদি বোর্ড সভার কথা উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীতে ওই প্রস্তাবনায় প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দিয়ে সই করেন। একই দিনে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকেও এ সংক্রান্ত চিঠি ইস্যু করা হয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, তৃতীয় দফায় অনিয়মতান্ত্রিকভাবে দুই বছরের জন্য তাকসিম এ খানকে ওয়াসার এমডি নিয়োগ করা হলেও এখন তার মেয়াদ তিন বছর করিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়টিও মন্ত্রী জানেন না। জানা গেছে, তৃতীয় দফা নিয়োগ পেয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন তাকসিম এ খান। তিনি এখন কাউকেই পরোয়া করছেন না। স্থানীয় সরকার বিভাগের একজন পদস্থ কর্মকর্তা জানান, তাকসিম এ খানের ফাইলপত্র রহস্যজনকভাবেই অনুমোদন হয়ে যাচ্ছে মন্ত্রণালয় থেকে অথচ মন্ত্রী এসবের কোনো কিছুই জানে না। ওই কর্মকর্তা বলেন, ওয়াসা এমডি বিদেশ যাওয়ার জন্য কোনো ফাইল সকালে পাঠালে বিকালেই সেটি রহস্যজনকভাবে অনুমোদন হয়ে যাচ্ছে। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় মন্ত্রী যখন দেশে থাকেন না তখনই এমডির ফাইল নড়াচড়া করে। অথচ অনেক গুরুত্বপূর্ণ জনপ্রতিনিধি বা সরকারি আমলার ফাইলে মন্ত্রীর অনুমোদন পেতে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়। ওয়াসার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায়ও একচ্ছত্র আধিপত্য খাটাচ্ছেন এমডি তাকসিম এ খান। যার কোনো কিছুই মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রী জানেন না। এমডি কোথায় কী প্রকল্প গ্রহণ করেছেন, কোথায় কোন প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে, কিংবা কাকে কোথায় কী কাজ দিচ্ছেন- সবই থাকছে মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রীর নজরের বাইরে। এমডি নিজের ইচ্ছামতো এসব কাজ করছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিয়ম অনুযায়ী ওয়াসা বোর্ডের সভা হচ্ছে না। অথচ প্রতি মাসে একটি করে বোর্ড সভা +হওয়ার নিয়ম রয়েছে। এই বোর্ড সভা না হওয়ার নেপথ্যেও এমডির আধিপত্য ও স্বেচ্ছাচারিতা। ওয়াসার একাধিক সূত্র জানায়, ওয়াসা বরাবরই একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান ছিল। কিন্তু তাকসিম এ খান এমডি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটি দেনায় জর্জরিত হচ্ছে। তাদের অভিযোগ বিদেশি অনুদান ও অর্থে নেওয়া প্রকল্পগুলোর প্রায় সবগুলোই ব্যর্থ হয়েছে। সব জায়গায় এক ধরনের লুটপাট চলছে। ওয়াসা সূত্রগুলো জানায়, এমডি ওয়াসায় নিজের স্বেচ্ছাচারিতা প্রতিষ্ঠা করলেও প্রতিষ্ঠানকে সময় দেওয়ার মতো সময় তার কাছে নেই। তিনি নানা অজুহাতে বেশিরভাগ সময়ই থাকেন দেশের বাইরে। সেখানেও সরকারের অর্থ গচ্চা যাচ্ছে। কারণ তার বিদেশ ভ্রমণের খরচ ওয়াসাকেই বহন করতে হয়। একটি সূত্র জানায়, ওয়াসা এমডি তাকসিম এ খানের স্ত্রী ও ছেলে আমেরিকায় বসবাস করেন। তিনিও সেখানে থাকতে পছন্দ করেন। কখনো রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রতিকূলে গেলে তিনি সেদিকেই পা বাড়াবেন বলে তার ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে। গত মহাজোট সরকারের শেষ দিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলে তিনি আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। প্রায় এক মাস সেখানে কাটিয়ে দেশে ফিরেন রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূলে আসার পর।

