২০১৯ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণে সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে অতিরিক্ত টাকা নিচ্ছে বিদ্যালয়গুলো। অতিরিক্ত টাকা দিতে না পারায় দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণ করা হচ্ছে না।
সিলেটের বিয়ানীবাজার, মৌলভীবাজারের কুলাউড়া ও হবিগঞ্জের বানিয়াচং প্রতিনিধির পাঠানো প্রতিবেদন। সিলেট মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড মানবিক বিভাগে এক হাজার ৪৪৫ টাকা, বিজ্ঞানে এক হাজার ৬৬৫ টাকা ও ব্যবসায় শিক্ষায় এক হাজার ৬৭০ টাকা নির্ধারণ করেছে। কিন্তু বিয়ানীবাজার উপজেলার জলঢুপ উচ্চ বিদ্যালয় মানবিক বিভাগে দুই হাজার ৭০০ টাকা এবং বিজ্ঞান বিভাগে দুই হাজার ৮০০ টাকা নিচ্ছে। এ ছাড়া নির্বাচনী পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগেই দুই শতাধিক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা করে কোচিং ফি নেওয়া হয়েছে। এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জালাল উদ্দিন বলেন, ‘বেতন ও সেশন ফি নিচ্ছি। এ ছাড়া এসএসসি ফির সঙ্গে সব কিছু যুক্ত করলে ২৭-২৮ শ টাকা হচ্ছে। এর বাইরে কোনো ফি আমরা আদায় করছি না। এ ছাড়া শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত ক্লাসের জন্য কিছু টাকা তুলেছে।’একজন অভিভাবক জানান, তিন মাসে কোচিং বাবদ দুই লাখ ৫৮ হাজার টাকা নিয়েছেন প্রধান শিক্ষক। এটা নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। এক পরীক্ষার্থীর বাবা সাইম আহমদ বলেন, ‘নির্বাচনী পরিক্ষার পরপরই কোচিং ফি বাবদ এক হাজার ২০০ টাকা দিয়েছি। এখন আবার দুই হাজার ৭০০ টাকা রেজিস্ট্রেশন বাবদ দিতে হচ্ছে। এর আগে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিদ্যালয়ের বেতন আদায় করা হয়েছে। কোনো রসিদ দেওয়া হয়নি।’বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও ওই বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী আতিকুর রহমান বলেন, ‘শিক্ষামন্ত্রীর এলাকায় বেশি ফি মেনে নেওয়া যায় না।’ এ বিষয়ে বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী আরিফুর রহমান বলেন, ‘কোচিং বাণিজ্যের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে উপজেলা প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে।’ এদিকে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার বিভিন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বাড়তি টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর দিয়েছে ফেসবুকভিত্তিক সংগঠন ‘কুলাউড়ার সমস্যা ও সম্ভাবনা’ গ্রুপের সদস্যরা। বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী ফরম ফির সঙ্গে বকেয়া বেতন, কোচিং, মডেল টেস্টের নামে বাড়তি কোনো টাকা আদায় করা যাবে না। বকেয়া বেতন আদায় করতে হলে নির্বাচনী পরীক্ষার আগে করে নিতে হবে। কিন্তু এই নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। সরেজমিন জানা যায়, কুলাউড়া নবীন চন্দ্র সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে ফরম পূরণ বাবদ তিন হাজার থেকে তিন হাজার ১৫০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। দেওয়া হচ্ছে না কোনো রসিদ। এ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আমির হোসেন বলেন, ‘বোর্ডের নির্ধারিত ফি অনুযায়ী মানবিকে দুই হাজার ২১০ টাকা, ব্যবসায় শিক্ষায় দুই হাজার ২১০ টাকা ও বিজ্ঞান বিভাগে দুই হাজার ৩০০ টাকা করে নিচ্ছি। সঙ্গে কোচিং ফি বাবদ আরো ৫০০ টাকা এবং দুই মাসের বেতন ২৪০ টাকা করে মোট ৪৮০ টাকা নিচ্ছি।’ মহতোছিন আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ছাত্র বলে, ‘আমাদের কাছ থেকে দুই হাজার ৯০০ থেকে তিন হাজার ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে।’ এ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফয়জুর রহমান ছুরুক বলেন, ‘বোর্ড নির্ধারিত ফিসহ কোচিং ও বকেয়া বেতন বাবদ দুুই হাজার ৯০০ টাকা থেকে তিন হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত নিচ্ছি।’ এ ছাড়া কুলাউড়ার ভূকশিমইল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ছকাপন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, অগ্রণী উচ্চ বিদ্যালয়, কর্মধা উচ্চ বিদ্যালয়, আলী আমজদ উচ্চ বিদ্যালয়, হিংগাজিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে বাড়তি টাকা আদায় করা হচ্ছে। পাশাপাশি কুলাউড়ার মনসুর মোহাম্মদীয়া মাদরাসা, চৌধুরী বাজার জিএস কুতুবশাহ মাদরাসা, শ্রীপুর জালালীয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদরাসায়ও বাড়তি টাকা আদায় করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে কুলাউড়া মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আনোয়ার বলেন, ‘বোর্ডের নির্ধারিত ফির বাইরে কোনো টাকা আদায় করা যাবে না।’ কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আবুল লাইছ বলেন, ‘আমি এ বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিয়েছি। তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।’ অন্যদিকে হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার মহারত্নপাড়া এসইএসডিপি বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, যারা নিয়মিত পরীক্ষার্থী তাদের কাছ থেকে চার হাজার ২০০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। একতা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানায়, তাদের চার হাজার টাকায় ফরম পূরণ করতে হচ্ছে। কিন্তু কাউকে প্রাপ্তি স্বীকার রসিদ দেওয়া হচ্ছে না। এ বিষয়ে বানিয়াচং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কাওসার শোকরানা বলেন, ‘ফরম পূরণের জন্য ষোলো থেকে সতের শ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়।’ সিলেট শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কবির আহমদ বলেন, ‘কোচিং ফি বা অতিরিক্ত ফি নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি আমি দেখছি।’

