একে তো সড়ক দুর্ঘটনা বলা উচিত নয়

0
603

ছবির মেয়েটি কাঁদছে। মেয়ে না বলে তাকে কিশোরী বলাই ভালো। পুলিশ তাকে রাস্তায় পিটিয়েছে। তার অপরাধ সে রাস্তায় বিক্ষোভ করতে নেমেছিল। তার সঙ্গে তারই বয়সী আরো অনেকেই ছিল। যারা কোনো দিন মিছিলে নামেনি। বরং তারা মিছিল এড়িয়ে চলে। মিছিল দেখলে ভয় পায়। অথচ তারাই এবার মিছিলে নামল। তাদের দাবি—‘নিরাপদ সড়ক চাই।’ তাদের দাবি কি অযৌক্তিক? কলেজের ক্লাস শেষে বাসায় যাওয়ার উদ্দেশে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল তাদেরই একদল সহপাঠী।

Advertisement

হঠাৎ যমদূতের মতো ঘাতক বাস তাদের চাপা দিয়ে চলে যায়। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় ফুলের মতো সুন্দর দুই শিক্ষার্থীর। একজনের নাম মীম, অন্যজনের নাম রাজীব। একে তো সড়ক দুর্ঘটনা বলা উচিত নয়। বলতে হবে নারকীয় হত্যাকাণ্ড। কারণ ঘাতক ড্রাইভার ইচ্ছা করে বাস উঠিয়ে দিয়েছে ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর। অথচ এই নির্মম-নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড নিয়ে একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী তুচ্ছতাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে প্রচারমাধ্যমে কথা বললেন। এমন পরিস্থিতিতে কি বিবেকবান মানুষের নিশ্চুপ থাকার কথা? নাকি নিশ্চুপ থাকা যায়? বিশেষ করে যারা তাদের সহপাঠীকে হারিয়েছে, তারা কি নিশ্চুপ থাকতে পারবে? ক্ষোভ, বিক্ষোভ তো হবেই। কিন্তু ক্ষোভ, বিক্ষোভ দমনেরও তো একটা মানবিক বিবেচনা আছে? ক্ষোভ-বিক্ষোভ দমনের বেলায় পুলিশ যেভাবে নির্দয়, নিষ্ঠুর কায়দায় কোমলমতি ওই কিশোর-কিশোরীদের পিটিয়েছে, তা মেনে নেওয়া যায় না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। ফেসবুকে এক জোড়া রক্তাক্ত জুতার ছবি পোস্ট করা হয়েছে। রক্তাক্ত জুতা জোড়া দেখে বুকের ভেতরটা কষ্টে হাহাকার করে উঠল। আমাদের প্রায় সবার বাড়িতেই এমন এক জোড়া অথবা তারও বেশি জুতা আছে। সংসারের কনিষ্ঠতম সদস্যের জুতা। যারা বড়ই আদরের সন্তান। আহা রে, তারাও রক্তাক্ত হলো। ফেসবুকে ছাত্র-ছাত্রীদের মিছিলে পুলিশের হামলার তিনটি ছবি পোস্ট করেছেন কবি ইজাজ আহমেদ মিলন। একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, কিশোরী চারজন ছাত্রীর ওপর অসুরের মতো ভয়ংকর চেহারা নিয়ে লাঠি উঁচিয়ে ধরেছে দুজন পুলিশ কর্মকর্তা। অন্য একটি ছবিতে এক কিশোরের রক্তাক্ত হাত। আরেকটি ছবিতে বিক্ষোভকারী একজনের বুকের ওপর পায়ের বুট উঁচিয়ে ধরেছে অন্য একজন পুলিশ। ইজাজ আহমেদ মিলন লিখেছেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী! বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর এমন সদস্যদের থামতে বলুন। ওরা তো মানুষ নয়। ওরা তো পুলিশ। ওদের মানুষ হতে বলুন, প্লিজ!… ফেসবুকে এক কিশোরের রক্তাক্ত মুখের ছবি পোস্ট করে গীতিকার, গায়ক সাজেদ ফাতেমী লিখেছেন, ‘পুলিশ আজ বাচ্চাগুলোকে এভাবে গরুপেটা করল সড়ক অবরোধ করেছিল বলে? তাহলে সংবর্ধনার নামে পুরো ঢাকা অচল করে দেওয়ার পরও পুলিশ ওই দলের কর্মীগুলোকে পেটায় না কেন? এত ছোট মানুষগুলোর জন্য সামান্য সহনশীলতা দেখানো গেল না? স্বর্ণকিশোরী আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ফারজানা ব্রাউনিয়া ফেসবুকে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলেছেন, যে বাচ্চা দুটি চলে গেছে তারা আর কোনো দিন তাদের মায়ের বুকে ফিরে আসবে না। কিন্তু যে বাচ্চাগুলো বেঁচে আছে, যে স্বর্ণকিশোরীরা বেঁচে আছে, যে সূর্য কিশোররা বেঁচে আছে, তাদের জন্য আমাদের করণীয় কী? মনে হচ্ছে, মা হিসেবে আমি পরাজিত। সন্তানদের সামনে নীতিবোধের বড় বড় কথা বলি আমরা? কিন্তু আমরা কি তা মানি বা মানছি? আমার একমাত্র মেয়ে বছরখানেক আগে অনার্স ডিগ্রি শেষ করেছে। দেশটাকে খুবই ভালোবাসে। কিন্তু দেশের রাজনীতি নিয়ে তার কোনো আগ্রহই নেই। সড়ক দুর্ঘটনায় অসহায় দুই কিশোর-কিশোরীর মর্মান্তিক মৃত্যুর পর সৃষ্ট বিক্ষোভ কর্মসূচিতে পুলিশের ভূমিকার ব্যাপারেই সে প্রশ্ন তুলেছে। সে আমাকে প্রশ্ন করল—বাবা, ছোট ছোট বাচ্চাদের বিক্ষোভ দমন করার জন্য পুলিশ এতটা বাড়াবাড়ি না করলেও তো পারত? তুমি কী বলো? তাৎক্ষণিকভাবে মেয়ের প্রশ্নের জবাব দিতে পারিনি। তবে প্রশ্নটা মাথার ভেতর থেকে যাচ্ছে না। ঠিকই তো, ছোট ছোট বাচ্চাদের ওপর পুলিশের কেউ কেউ যেভাবে অসুরের মতো চড়াও হলো, তা কি সমর্থনযোগ্য? আবার এই আশঙ্কাও তো উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে ষড়যন্ত্রকারীদের তো অভাব নেই। তাদের কেউ যদি কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের আন্দোলনের মাঝে ঢুকে পড়ে? কাজেই বিক্ষোভ দমন করতেই হবে। তাই বলে এত অমানবিক কায়দায়? এই যে আমাদের পুলিশ বাহিনীর ওপর কিশোর-কিশোরীদের মনে একধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হচ্ছে, তা তো ভবিষ্যতের জন্য সুখের হবে না। পুলিশ জনগণের বন্ধু। শিশু-কিশোররা তো এটা জেনেই বড় হবে। কিন্তু বাস্তবতা কী বলে? প্রিয় দুই সহপাঠীর করুণ মৃত্যুর পর কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের বিক্ষোভ দানা বেঁধেছিল একজন মন্ত্রীর করা বেফাঁস মন্তব্য নিয়ে। যদিও তিনি তাঁর বেফাঁস মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু যে কারণে সারা দেশে কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীরা বিক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে, সেই নিরাপদ সড়কব্যবস্থার উন্নতির তো কোনো লক্ষণই চোখে পড়ছে না। ঘাতক ড্রাইভারের কারণে বাসচাপায় মীম ও রাজীবের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর পরিবহনব্যবস্থায় ড্রাইভারদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বলা হচ্ছে, ড্রাইভিং লাইসেন্সবিহীন অদক্ষ চালকের কারণেই দেশে প্রতিদিনই একাধিক সড়ক দুর্ঘটনা হচ্ছে। এর প্রমাণ পাওয়া গেল সড়ক দুর্ঘটনায় মীম ও রাজীবের মৃত্যুর পরের দিনই। পুলিশেরই একটি পিকআপ ভ্যান চালাচ্ছে ড্রাইভারের লাইসেন্স না-পাওয়া অপ্রাপ্তবয়স্ক এক কিশোর। আরো মজার ব্যাপার হলো, ১০-১২ বছরের এক কিশোর রাজধানীর ব্যস্ত রাস্তায় প্রকাশ্যে বাস চালায়, সেই ভিডিও এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। ভিডিওটি দেখে প্রথম ভেবেছিলাম, কেউ বোধ করি ফান করার জন্য ফেসবুকে ছেড়েছে। পরে দেখলাম ফান নয়, সিরিয়াস ঘটনা। ১২-১৩ বছরের এক কিশোর ঢাকা শহরের ব্যস্ত রাস্তায় প্রকাশ্যে যাত্রীবাহী বাস চালাচ্ছে। সে উচ্চতায় এতটাই খাটো যে ভালো করে বাসের স্টিয়ারিং ধরতে পারছে না। অথচ ঢাকা শহরের ব্যস্ত রাস্তায় দ্বিধাহীন ভঙ্গিতে গাড়ি চালাচ্ছে। ভিডিওতে দেখা গেল, একজন যাত্রী ওই কিশোরকে নানা কথা জিজ্ঞেস করছে। বাস চালাতে চালাতেই ডেমকেয়ার ভঙ্গিতে সে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে। ‘অ্যাই ছেলে, তোমার বয়স কত? উত্তর এলো—জানি না। তোমার ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে? প্রশ্ন শুনে সে মিষ্টি হাসি দিল। ভাবটা এমন—‘ড্রাইভিং লাইসেন্স’ মানে কৌতুক করার মতো কোনো জিনিস। কত দিন ধরে গাড়ি চালাও? প্রশ্ন শুনে গর্বের ভঙ্গিতে বলল, এক বছর। এক বছর ধরে গাড়ি চালাও? রাস্তায় পুলিশ তোমাকে কিছু বলে না? প্রশ্ন শুনে সে সহজ-সরল ভঙ্গিতেই বলল, না। পুলিশ কিছু বলে না।’ কিশোর ড্রাইভারের কথা শোনার পর বোধ করি এ ক্ষেত্রে মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন! তবে আমরা যদি আন্দোলনরত কিশোর-কিশোরীদের চলমান বিক্ষোভের মানসিকতাকে গুরুত্বহীন ভাবি, তুচ্ছতাচ্ছিল্য বলে দূরে ঠেলে দিই, তাহলে ভুল করব। ওরা চারপাশের আধুনিক পৃথিবীটা দেখে দেখে বড় হচ্ছে। অন্যায় আর নীতিহীন মানুষকে ওরা পছন্দ করে না। কাজেই আমাদের সাবধান হওয়ার প্রয়োজন পড়েছে। বিশেষ করে বেফাঁস কথা বলা থেকে বিরত হলেই বোধ করি ওদের আস্থা ফিরে পাব। দেশের জন্য যে আস্থাটা খুবই জরুরি।

Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here