অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে মরণনেশা ইয়াবা ট্যাবলেট। কী শহর আর কী গ্রাম, এখন প্রায় সবখানেই মিলছে ভয়াবহ এ নেশার ট্যাবলেট। ইয়াবা তৈরির কাঁচামাল রপ্তানি বন্ধ করেও ঠেকানো যাচ্ছে না এ নেশার আগ্রাসন। একের পর এক অভিনব কৌশল আবিষ্কার করছে ইয়াবাচক্র। পাশাপাশি নতুন করে এবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে চিহ্নিত রুটগুলোও পরিবর্তন করছে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা।
সড়কপথের ব্যবহার কমিয়ে বেশিরভাগ ইয়াবা চালান নৌপথে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, খুব সম্প্রতি নিরাপদে ইয়াবার চালান বহনের জন্য নতুন রুট আবিষ্কার করেছে মাদক ব্যবসায়ীরা। আগে ইয়াবা মূলত মিয়ানমার থেকে টেকনাফে এসে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম হয়ে সড়কপথে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে যেত। এখনও এমনটি হচ্ছে, বুধবারও কুমিল্লার চান্দিনায় ৪ হাজার পিস ইয়াবাসহ নাসির উদ্দিন নামে রাঙ্গামাটি জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একজন এএসআইকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে উদ্বেগজনক তথ্য হলো সড়কপথের চেয়েও এখন অধিকহারে ইয়াবার চালান আনা-নেওয়া করা হচ্ছে নৌপথে। নতুন এ রুট হচ্ছে মিয়ানমার থেকে টেকনাফ হয়ে কুয়াকাটা। এরপর কুয়াকাটা থেকে নদীপথে চাঁদপুরে এসে নৌপথেই ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহীসহ সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর বাইরেও বাংলাদেশে ইয়াবার বিস্তার আরও বাড়াতে ভারতের কিছু এলাকাকেও ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে মাদক ব্যবসায়ীরা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো উপঅঞ্চলের উপ-পরিচালক (গোয়েন্দা) মুকুল জ্যোতি চাকমা আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, সম্প্রতি ইয়াবা পাচারের নতুন রুট হিসেবে নৌপথকে বেশি ব্যবহার করছে মাদক ব্যবসায়ীরা। টেকনাফ থেকে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা হয়ে চাঁদপুর থেকে ঢাকা, খুলনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে নৌপথে ইয়াবার চালান পাচার করা হচ্ছে। এমন কয়েকটি ইয়াবার চালান আটকের তথ্য জানিয়ে মুকুল জ্যোতি চাকমা বলেন, যত কৌশলই করা হোক না কেন সড়কপথে বহনের সময় কোনো না কোনোভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ইয়াবার অনেক চালান ধরা পড়ছে। এ কারণেই মূলত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃষ্টি এড়াতে নৌপথকে কাজে লাগাচ্ছে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা। মুকুল জ্যোতি চাকমা আরও বলেন, সম্প্রতি দুই ইয়াবা ব্যবসায়ীকে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, মিয়ানমার থেকে নাইখংছড়ি ও বান্দরবানের কিছু দুর্গম পয়েন্ট দিয়ে ইয়াবা প্রথমে ভারতের সীমানায় নিচ্ছে। এরপর সেগুলো আবার বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশেই প্রবেশ করানো হচ্ছে। অর্থাৎ ভারতকেও ইয়াবার ট্রানজিট বানানো হচ্ছে। র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান এ প্রসঙ্গে বলেন, বেশ কিছুদিন ধরেই ইয়াবার চোরাচালান নৌপথে আনা-নেওয়া করা হচ্ছে। বিশেষ করে কুয়াকাটা ও বরিশালসহ উপকূলীয় অঞ্চলের নৌপথে ইয়াবা চোরাচালানের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এরই মধ্যে এমন কয়েকটি চালান র্যাব আটক করতেও সক্ষম হয়। এ বিষয়ে সড়কপথের মতো নৌপথেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পুলিশ, র্যাব ও ডিএনসির একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপকালে তারা জানিয়েছেন, মিয়ানমার থেকে টেকনাফ ও কক্সবাজার হয়ে চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা দিয়ে ঢাকায় পৌঁছাতে গিয়ে অনেক স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তল্লাশির মুখোমুখি হতে হয়। এ কারণে এখন টেকনাফ থেকেই নদী ও সাগরপথে ইয়াবা সরাসরি যাচ্ছে কুয়াকাটায়। সেখান থেকে যাচ্ছে চাঁদপুর হয়ে নৌপথে ইয়াবার চালান ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সারা দেশে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ছোট-বড় লঞ্চ, মাছ ধরার ট্রলার, বালিবাহী নৌকাসহ নানা নৌবাহনের মাধ্যমে সাগর ও নদীপথে ইয়াবার চালান সারা দেশে সরবরাহ করা হচ্ছে। এসব ইয়াবা চালান আবার বিভিন্ন পয়েন্টে বাহন বা হাত বদল হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের পণ্য, উপকরণ কিংবা সন্দেহ এড়ানো যায় এমন কিছুর মাধ্যমে বহন করা হচ্ছে ইয়াবার চালান। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে কুরিয়ার সার্ভিসের পার্সেলে বিভিন্ন পণ্যের ভেতরে করে দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা ঢাকায় এনে ব্যবসা পরিচালনা করছিলেন মিরপুরের তরুণী রিপা আক্তার। তবে ১৯ এপ্রিল র্যাবের ফাঁদে ধরা পড়েছেন রিপা আক্তার। এ সময় কুরিয়ার সার্ভিসের অফিসের সামনে থেকেই তাকে ১০ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ গ্রেফতার করেছে র্যাব-২ ব্যাটালিয়ন। এরপর ২০ এপ্রিল র্যাব-২ ব্যাটালিয়নেরই আরেকটি অভিযানে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থেকে ৯০ হাজার ১৫০ পিস ইয়াবাসহ তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতাররা হলেন কাউসার, মনোয়ার বিন আলম আবরার ও জুয়েল রানা। এরা কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম হয়ে সড়কপথে এলেও রাজধানী ঢাকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরদারি এড়াতে রূপগঞ্জ দিয়ে ৩০০ ফিট রাস্তা হয়ে ময়মনসিংহে ওই ইয়াবার চালান নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কুমিল্লায় ইয়াবাসহ রাঙ্গামাটির ডিবি কর্মকর্তা গ্রেফতার : কুমিল্লা সংবাদদাতা মো. কামাল উদ্দিন জানান, চান্দিনা থানা পুলিশের অভিযানে ৪ হাজার পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার হয়েছেন রাঙ্গামাটি জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এএসআই নাছির উদ্দিন। এসময় কাউসার নামে তার এক সহযোগীকেও গ্রেফতার করা হয়। মঙ্গলবার রাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার কাঠেরপুল এলাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করা হলেও তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া নিয়ে বুধবার দুপুর পর্যন্ত চলে নানা নাটকীয়তা। পরে দুপুরের দিকে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে ইয়াবা পাচার মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। বুধবার তাদের কুমিল্লা পুলিশ সুপার (এসপি) কার্যালয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে ইয়াবা পাচার বিষয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। গ্রেফতার নাছির উদ্দিন চান্দিনা উপজেলার দোতলা গ্রামের টেম্পোচালক নূরু মিয়ার ছেলে। তার সহযোগী কাউসার কুমিল্লা সদরের প্রতাপপুর গ্রামের বাসিন্দা। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলা সদরের কাঠেরপুল এলাকায় মঙ্গলবার রাতে থানা পুলিশের একটি দল টহল দিচ্ছিলেন। এ সময় মোটরসাইকেলযোগে দুই ব্যক্তি দ্রুতগতিতে ঢাকা অভিমুখে যাচ্ছিলেন। এতে টহল পুলিশের সন্দেহ হওয়ায় মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে তাদের দেহে তল্লাশি চালিয়ে ৪ হাজার পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার এবং মোটরসাইকেলটি আটক করা হয়। এ ব্যাপারে চান্দিনা থানার ওসি মোহাম্মদ আলী মাহমুদ জানান, ইয়াবাসহ নাছিরকে আটকের পর প্রথমে সে পরিচয় গোপন রাখলেও গ্রেফতার এড়াতে পরে নিজেকে রাঙ্গামাটি ডিবির এএসআই হিসেবে পরিচয় দেয়। কিন্তু সে ডিবি পুলিশের এএসআই কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাকেসহ গ্রেফতার দুইজনকে কুমিল্লা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে পাঠানোর পরই তাকে জিজ্ঞাসাবাদে ডিবিতে চাকরির অন্তরালে মাদক ব্যবসার নানা তথ্য বেরিয়ে আসে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চান্দিনার দোতলা গ্রামের নূরু মিয়ার ছেলে নাছির উদ্দিন ২০০৬ সালে কনস্টেবল পদে পুলিশে যোগদান করেন। পরে ২০১৪ সালে তিনি সহকারি উপ-পরিদর্শক (এএসআই) পদে পদোন্নতি লাভ করেন। তারপর থেকে রাতারাতি অর্থনৈতিক পরিবর্তন ঘটতে থাকে তার। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ২টি গাড়ি, নতুন বাড়ি এবং অনেক জমি-জমা কিনেন মাদক ব্যবসায় জড়িত ওই পুলিশ কর্মকর্তা। কেরনখাল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হারুন-অর রশিদ জানান, পুলিশের এএসআই পদে চাকরি করে মাত্র ২ বছরের মধ্যে গাড়ি-বাড়ির মালিক হয়ে যাওয়ার বিষয়টি যেন ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার মতো ঘটনা’। এখন বোঝা যাচ্ছে পুলিশে চাকরির আড়ালে সে (নাছির) জমজমাট মাদক ব্যবসায় জড়িত ছিল। কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ওসি নাছির উদ্দিন মৃধা জানান, ইয়াবাসহ থানা পুলিশের হাতে আটক নাছিরের পরিচয়ের বিষয়টি রাঙ্গামাটি ডিবি থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। তাকে নিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হতে পারে।

