খেলাপি ঋণের বোঝা বাড়ছে ব্যাংক খাতে

0
2578

খেলাপি ঋণের বোঝা বাড়ছে ব্যাংক খাতে। এ কারণে ব্যাংকগুলোকে বাড়তি প্রভিশন রাখতে গিয়ে চড়া সুদে ঋণ বিতরণ করতে হচ্ছে। শেষতক, ওই সুদের ভার পড়ছে শিল্পোদ্যোক্তাদের ঘাড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৮৮ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা, যা ব্যাংক খাতের মোট বিতরণ করা ঋণের ১০.৭৮ শতাংশ।

Advertisement

খেলাপি ঋণের এই অঙ্ক এ যাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ। গত মার্চ পর্যন্ত ব্যাংক ব্যবস্থায় মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ২২ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের সঙ্গে অবলোপন করা ঋণের অঙ্ক যোগ করা হলে খেলাপি ঋণ দাঁড়াবে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকায়।বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা, যা ওই সময় পর্যন্ত মোট বিতরণ করা ঋণের ৯.৩১ শতাংশ। সেই হিসেবে তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৪ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা। গত সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৮০ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা। আদায় জোরদার করায় ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ কিছুটা কমলেও মার্চ মাস শেষে তা আবার বেড়ে ৮৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট খেলাপি ঋণের অর্ধেকই রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ বাণিজ্যিক ব্যাংকে। মার্চ শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২৯.৮৪ শতাংশ। তিন মাসের ব্যবধানে সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বাংলদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। মার্চ শেষে বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২৩.৩৯ শতাংশ। অন্যদিকে বেসরকারি খাতের ৪০টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৬ শতাংশ। তিন মাসের ব্যবধানে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি ৪০টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ২৯ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৪.৮৭ শতাংশ। দেশে পরিচালিত ৯টি বিদেশি মালিকানার ব্যাংকের খেলাপি ঋণ সবচেয়ে কম। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৭.০১ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে খেলাপি ঋণ তিনটি মানে ভাগ করা থাকে। এগুলো হলো নিম্নমান, সন্দেহজনক এবং মন্দ বা ক্ষতিজনক মান। মন্দ বা ক্ষতিজনক মানের ঋণ আদায় হবে না বলে ধরে নেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মতে, মোট খেলাপি ঋণের ৭৩ হাজার কোটি টাকাই মন্দ ঋণ। জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, খেলাপি ঋণের উচ্চ পরিমাণ ও হারের কারণ ব্যাংক খাতে সুশাসনের ঘাটতি। এই ঘাটতি একসময় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে ছিল। বেসরকারি ব্যাংকগুলো তার মূলধন ঘাটতির ভয়ে ঋণ বিতরণে সতর্ক থাকত। কিন্তু বর্তমানে সেটিও নেই। ফলে সার্বিকভাবে খেলাপি ঋণ কমাতে তদারকি এবং পদক্ষেপে ঘাটতি রয়েছে। এই অর্থনীতিবিদ বলেন, খেলাপি ঋণের উচ্চ হারের সঙ্গে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ হারের সম্পৃক্ততা রয়েছে। ব্যাংকগুলোর ১০০ টাকার মধ্যে ১১ টাকা যদি খেলাপি থাকে তবে তাকে বাকি ৯০ টাকা থেকে আয় করতে হয়। এ ক্ষেত্রে আমানতের সুদ পরিশোধ, পরিচালন ব্যয় নির্বাহ করে মুনাফা করতে হলে উচ্চ সুদে বিনিয়োগ না করে উপায় থাকে না ব্যাংকগুলোর।

Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here