বিশেষ সংবাদদাতাঃ
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)’র তদন্ত ধামাচাপা দিয়ে প্রকৌশলী ও জাহাজ জরিপকারক মির্জা সাইফুর রহমান নৌ-অধিদপ্তরে প্রধান প্রকৌশলী হবার মিশনে নেমেছেন। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির পিলেচমকানো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দুদকে তদন্তাধীন থাকা সত্বেও কৌশলে ধামাচাপা দিতে সক্ষম হয়েছেন ধুরন্ধর এ কর্মকর্তা। দুদকের দু’জন তদন্ত কর্মকর্তা পাল্টে গেলেও তদন্ত এবং অনুসন্ধানে কাঙ্খিত গতি আসছেনা রহস্যজনক কারণে। প্রাক্তন প্রধান প্রকৌশলী ফখরুর ইসলাম এবং ড.এসএম নাজমুল হককে কথিত ঘুষের অভিযোগে দুদকের জালে আটকের পর মির্জা সাইফুর যে কোন মূল্যে প্রধান প্রকৌশরী হবার টার্গেট নিয়েছেন বলে অধিদপ্তর জুড়ে ব্যাপক গুঞ্জন রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অভ্যন্তরীণ নৌ-যান সার্ভে এবং রেজিস্ট্রেশনে ভয়াবহ দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। নকশা ছাড়াই ভুয়া ও জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে নৌযান রেজিস্ট্রেশন করে সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। এমনকি চার দশকের পুরনো জাহাজ নতুন দেখিয়ে রেজিস্ট্রেশন প্রদান করেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তে বেরিয়ে এসেছে পিলে চমকানো এমন চিত্র। এখন সেই তদন্ত ধামাচাপা দিতেই দুর্নীতির সাথে সংশ্লিষ্টরা নানা ফন্দি ফিকির করছে। সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের নাম পাল্টে নৌ অধিদপ্তর করা হলেও দুর্নীতি মূলোৎপাটনে কর্তৃপক্ষীয় উদ্যোগ নেই। বরং অভিযুক্ত মির্জা সাইফুরকে রক্ষায় একাট্টা সংঘবদ্ধ দুর্নীতিবাজ চক্র।
প্রসঙ্গত, অভ্যন্তরীণ নৌ-যানের সার্ভে সনদ (ফিটনেস সনদ) ও রেজিস্ট্রেশন প্রদানের এখতিয়ার নৌ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন নৌ পরিবহন অধিদফতরের। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও জালিয়াতির কারণে ত্রুটিপূর্ণ নৌযানগুলো চলাচলের অনমুতি পেয়েছে। এতে একদিকে সরকার যেমন বিপুল অংকের রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি নৌপথ পরিণত হয়েছে মৃত্যুফাঁদে। অথচ বারবার দায়ীরা থেকে যাচ্ছে অধরা। এমনই এক কর্মকর্তা হলেন প্রকৌশলী ও শিপ সার্ভেয়ার মির্জা সাইফুর রহমান। তার বিরুদ্ধে দুই বছরের বেশি সময় ধরে তদন্ত করেও কোনো প্রতিবেদন দিচ্ছেনা দুদক। নৌ পরিবহন অধিদফতরের একটি চক্র বিষয়টি ধামাচাপায় নানা ফন্দিফিকির চালাচেছ বলে অভিযোগ ওঠেছে।
দুদক সূত্র মতে, শিপ সার্ভেয়ার মির্জা সাইফুরের বিরুদ্ধে ত্রুটিপূর্ণ নৌযান নিবন্ধন এবং অবৈধভাবে সার্ভে সনদ দিয়ে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ তদন্তে তথ্য প্রমাণ মিলেছে। এর মধ্যে এমভি বোরহান কবির যার প্রাক্তন নাম এমভি জয়খান-৫ এবং এম.এল বাদল প্রাক্তন নাম এম.এল রুমা নৌযান দুইটি প্রায় চার দশকের পুরনো। স্ক্র্যাপ করার পরিবর্তে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে সেগুলো নতুন হিসেবে রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে। অন্য অভিযোগের মধ্যে রয়েছে নৌযানগুলির গ্রসটন কম ধরে সরকারের লাখ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেয়া হয়েছে। নৌযান গুলির নকশার সাথে বাস্তব কাঠামোর কোন মিল নেই। অনেক নৌযানের ডক সনদ এবং ভ্যাট আদায়ের ছাড়পত্র ভুয়া। তবে এ তদন্তকে ভিন্নখাতে নিতে শুরু থেকেই একটি চক্র তৎপর। এরা বিভিন্ন কূট কৌশলের মাধ্যমে প্রকৃত সত্যকে আড়াল করতে চাইছে। দুদকের একটি চিঠির প্রেক্ষিতে সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের গৃহীত পদক্ষেপে এ অভিযোগ দৃঢ়তা পেয়েছে।
জানা গেছে, মির্জা সাইফুরের বিরুদ্ধে নৌ-যান রেজিস্ট্রেশন প্রদান করে রাজস্ব ফাঁকি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধানের স্বার্থে সহায়তা চেয়ে ২০১৬ সালের ১৫ আগস্ট সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের মহাপরিচালককে একটি চিঠি দেয় দুদক। দুদকের উপ-পরিচালক শেখ আবদুস ছালাম স্বাক্ষরিত ওই চিঠির সঙ্গে ৫৭টি নৌযানের তালিকা সংযুক্ত করে সেগুলো সরেজমিন যাচাইয়ের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে নৌ-যান রেজিস্ট্রেশন কাজে পারদর্শী তিন সদস্য বিশিষ্ট টিম গঠন করে অবহিত করার জন্য চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। ‘বিষয়টি অতীব জরুরী’ উল্লেখ করে চিঠিতে আরো বলা হয়, নিয়োজিত প্রকৌশলীদের সাথে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে বাস্তব যাচাই কাজের তারিখ নির্ধারণ করা হবে।
এদিকে ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট প্রকৌশলী ও শিপ সার্ভেয়ার মোঃ মুঈন উদ্দিন জুলফিকারকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে সমুদ্র পরিবহন অধিদফতর। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন মোঃ হুমায়ুন কবির এবং মোঃ শাহরিয়ার হোসেন। সমুদ্র পরিবহন অধিদফতরের মহাপরিচালক কমোডর এম জাকিউর রহমান ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে কমিটিকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত করে সুপারিশসহ প্রতিবেদন পেশ করার নির্দেশ দেয়া হয়। সে তদন্ত রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি।
অভিযোগ রয়েছে, দুদকের চিঠির প্রেক্ষিতে সমুদ্র পরিবহন অধিদফতর কমিটি গঠন করলেও সেটি ছিল আইওয়াশ। কেননা, দুদকের চিঠিতে রেজিস্ট্রেশনকৃত নৌ-যানগুলো সরেজমিন যাচাইয়ের জন্য পারদর্শী সার্ভেয়ার বা প্রকৌশলীর সহায়তা চাওয়া হয়েছে। অর্থাৎ দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা সমুদ্র পরিবহন সংশ্লিষ্টদের সাথে নিয়ে নিজেরা প্রতিটি নৌযান স্বচক্ষে দেখবেন। অথচ সমুদ্র পরিবহন সংশ্লিষ্টরা দুদককে পাশ কাটিয়ে পৃথক তদন্ত করতে চাইছে, যা রহস্যজনক।
দুদকের চিঠিতে যেসব নৌযানের উল্লেখ রয়েছে সেগুলো হলো-এমভি মিরাজ-২, এমভি পিনাক-৬, এমভি বোরহান কবির যার প্রাক্তন নাম এমভি জয়খান-৫, এম.এল বাদল প্রাক্তন নাম এম.এল রুমা, এমভি আলতাফ-১, এমভি এন.এ-৬, এমভি নজিব বেপারী, এমভি ড্রীম-৬, এমভি আল ইত্তেহাদ-২, এমভি আল ইত্তেহাদ-৩, ওটি কিংফিশার-৭, ৮ ও ১০, এমভি সুমনা, এমভি সুন্দরবন-১১, এমভি এইচ পিএল-১ ও ২, ওটি হযরত বাহাদুর শাহ, এমভি হাজী ইমন আলী, এমভি অতিফা জাহান, ওটি দারিন দাশাব-১, এমভি সান্নিধ্য, ওটি আওলাদ ২ ও ৪, এমভি ফারহাত, এমভি শাহরাস্তি-৩, এমভি শাহিন রিফাত-১, এমভি সোনার তরী, এমভি ইমাম হাসান-২, এমভি গোল্ডেন পোস, এমভি বালশুর-১, এমভি নিউ স্টার-৫ ও ৬, এমভি ময়ুর-৭, এমভি জাবেদ-১১, এমভি বনি হাসান, এমভি ঈগল-৩ ও ৪, ওটি ওশান প্রিন্স, ওটি ওশান, এমভি শান্তা রূপা-৪ ও ৫, এমভি ওয়াটারবাজ-৩, ৪, ৫ ও ৬, এমভি জাভেদ-১২, ওটি নোভা, এমভি আক্তার বানু, এম এল বাদশা, এমভি মিতালী-৪, এমভি আকাশ-১৩, ওটি মেঘবতী, এমভি মানিক-৯. এমভি নিউ সাব্বির-২ ও ৩, এমভি সর্দার বাড়ী, এমভি মান-৭, এমভি মমিন আমিন, এমভি রাজহংস-৮, ওটি রিদা, ওটি রিদা-১, ওটি আফসারা, এমভি জেসি-২, এমভি সিটি ও এমভি স¤্রাট-২।
আপরদিকে নৌঅধিদপ্তরের অসৎ কর্মকর্তাদের অভিলাস ষোলকলায় পুরনে সার্বিক সহায়তা করে চলেছেন কথিত একটি অনলাইন পত্রিকার অখ্যাত একজন সম্পাদক। ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী ড.এসএম নাজমুল হক দুদকের জালে আটকা পড়ার পর ওই সাংবাদিক তার প্রতিপক্ষের স্বার্থ রক্ষায় ন্যাক্কারজনকভাবে মাঠে নেমেছেন। তাকে কারাগারে বসে এবং বিভিন্ন লোকমাধ্যমে হুককি দিচ্ছেন বলে প্রচারনা চালিয়েই যাচ্ছেন ধুরন্ধর সম্পাদক। সাংবাদিক নামধারী ওই ব্যক্তি নৌ সেক্টরে বিভিন্ন কর্মকর্তা এবং সংগঠনের মধ্যে বিরোধ বাধিয়ে নানামুখী তদ্বির এবং আর্থিক সুবিধা নেন বলে জানা গেছে। এ কাজে তিনি অপব্যবহার করেন বিভিন্ন সংগঠন এবং সংবাদ মাধ্যমকে। ফলে অনেক সৎ ও নিরীহ কর্মকর্তা হয়রানীর ভয়ে তার অন্যায় আবদার পুরণ করেন বলে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে।

