দীর্ঘ সতেরো বছর যাবত ন্যায় বিচারের অপেক্ষায় ফাসির সেলে দিন কাটছে সোহেল ওরফে সানাউল্লার। সাভার থানার মধ্য রাজাশন এলাকার ঈদগাহ মাঠের পাশেই বড় হয়েছে এই হতভাগ্য যুবক। ২০০১ সালের এপ্রিল মাস থেকে নিজের মা সানোয়ারা বেগম এবং একমাত্র বোন শাফিয়া খাতুনের হত্যা মামলায় ফাসির দন্ডপ্রাপ্ত হিসেবেই সে কনডেম সেলে দিন কাটাচ্ছে, যদিও ২০০৮ সালেই মহামান্য হাই কোর্ট এই মামলার আপিল শুনানীকালে (৩২৯/২০০২, অতিরিক্ত দায়রা জজ সপ্তম আদালত) সোহেল ওরফে সানাউল্লার ফাসির রায় বাতিল করে মামলাটি পূঃবিচারের জন্য অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতে প্রেরণ করেন।
একইসাথে এই মামলার বিচারিক আদালতের বিচারক এবং পাবলিক প্রসিকিউটারের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রেরণ করেন। উচ্চ আদালত এই মামলাটি ষাট কার্ষদিবসের মধ্যে পূনরায় বিচার করার নির্দেশ প্রদান করেন অতিরিক্ত দায়রা জজ সপ্তম আদালতকে। এরই প্রেক্ষিতে ২০০৮ সালের ১৬ জানুয়ারি পূনরায় বিচার শুরু হয়। কিন্তু, ২০০৯ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি মামলাটির দ্বিতীয় রায় ঘোষনার তারিখ নির্ধারিত হওয়ার পর গত ৯ বছরেও এটি আর ঘোষিত হয়নি। আর এই অজানা দীর্ঘসূত্রীতার কারণেই ন্যায় বিচার বঞ্চিত সোহেল ওরফে সানাউল্লার দিন কাটছে ফাসির সেলে।
ঘটনার বিবরনঃ
সাভার থানার মধ্য রাজাশন এলাকার হাজী এরফানুদ্দিনের মেয়ে সানোয়ারা বেগম দীর্ঘ ৭ বছর কুয়েতে চাকরীরত থাকাকালে তার উপার্জনের পুরো টাকা বাংলাদেশে তার বাবা এরফান হাজীর ব্যাংক একাউন্টে পাঠাতেন। সানোয়ারার উদ্দেশ্য ছিলো বাবার মাধ্যমে এলাকায় কিছু সম্পত্তি কেনা। মেয়ের পাঠানো টাকা দিয়ে এরফান হাজী মধ্য রাজাশন এলাকাতেই একটি জমি কেনেন এবং নিজের বসতবাড়িতে কয়েকটি দোকান নির্মান করেন। সানোয়ারা বেগম দেশে ফিরে আসার পর বাবার কাছে অনুরোধ করেন ক্রয়কৃত সম্পত্তি তার নামে হস্তান্তর করে দিতে। আর এতেই বেকে বসেন হাজী এরফান এবং তার তিন ছেলে, হান্নান, হানিফ এবং মান্নান। মেঝো ছেলে হান্নান আগে থেকেই সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সাথে জড়িত ছিলো এবং এলাকায় মাদক ব্যবসা করতো। হাজী এরফান তার ছেলেদের সাথে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেন, নিজের মেয়ে সানোয়ারা বেগমকে হত্যার। বাবার কাছ থেকে নির্দেশ পেয়ে হানিফ, হান্নান এবং মান্নান পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন।
যা ঘটে ঘটনার রাতেঃ
তিন ভাই ধারালো চাকু, ডেগার, চাপাটি এবং দুড়ি নিয়ে হত্যা মিশনে নামে গভীর রাতে। এর আগেই হানিফের স্ত্রী নাজমা নিজহাতে সানোয়ারা বেগমের ছেলে সোহেল ওরফে সানাউল্লাকে চায়ের সাথেই কয়েকটা ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে পান করান। আপন মামীর হাতে বানানো চা-তেই ঘুমের ওষুধ মেশানো সেটা সোগেল ওরফে সানাউল্লা কল্পনাও করেনি। চা পানের আধ ঘন্টার মধ্যেই সে ঘুমিয়ে পড়ে। এদিকে হানিফ, হান্নান, মান্নান এবং হানিফের স্ত্রী নাজমা সানোয়ারা বেগমের ঘড়ে যান এবং দরজা ভেঙে প্রবেশ করলে সানোয়ারা ঘুম থেকে জেগে উঠে চিৎকার করতে উদ্দত হলে নাজমা তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে। হানিফ এবং মান্নানও সানোয়ারা দুই হাত ধরে রাখে এবং হান্নান তার কোমর থেকে ধাড়ালো চাকু বের করে সানোয়ারা বেগমের পেটে বসানোর উদ্যোগ নিলে সানোয়ারা প্রানপণে ঝাঁকি দিয়ে উঠেন। এতে হানিফ এবং মান্নান ছিটকে পড়েন। এ অবস্থায় হান্নান নিজেই সানোয়ারা বেগমকে জড়িয়ে ধরেন এবং তিনি যাতে চিৎকার না দিতে পারেন সেজন্য হান্নান তার বোনের মুখ চেপে ধরলে বিভ্রান্ত সানোয়ারা বেগম হান্নানের ঠোট কামড়ে ধরার চেষ্টা করেন। শুরু হয়ে যায় ধস্তাধস্তি। এই ফাঁকে নাজমা ঘড়ের বাতি নিভিয়ে দিলে হান্নান সজোরে সানোয়ারাকে বিছানায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন এবং গলা চেপে ধরেন। হানিফ এবং মান্নানও সানোয়ারার হাত-পা চেপে ধরেন। কিছুক্ষনের মধ্যেই সানোয়ারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। আকস্মিক এসব ঘটনায় হতচকিত হয়ে সানোয়ারা বেগমের একমাত্র মেয়ে শাফিয়া খাতুন (১২) ঘড়ের চৌকির নিচে আত্মগোপন করে। কিন্তু সানোয়ারা বেগমের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর হানিফ এবং মান্নানসহ হানিফের স্ত্রী নাজমা চৌকির নীচ থেকে শাফিয়া খাতুনকে টেনে বের করে আনে এবং তিনজন মিলে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।
আপন বোন-ভাগ্নীর মৃতদেহের সাথেও নৃশংসতাঃ
হত্যাকান্ড সংঘটিত হওয়ার পর হানিফ, হান্নান এবং মান্নান মিলে মৃতদেহগুলো বাড়ীর পেছনে অবস্থিত গোসলখানায় নিয়ে যান। সেখানেই হানিফ, হান্নান, মান্নান এবং হানিফের স্ত্রী নাজমা মিলে চাপাতি এবং রান্নাঘড়ের বটি দিয়ে লাশগুলো টুকরো-টুকরো করে বস্তায় ভরে সেগুলো কয়েকবারে নিকটবর্তী খালের পাড়ে ফেলে আসে। পরদিন সকালে মা-বোনকে খুঁজে না পেয়ে সানোয়ারা বেগমের ছেলে সোহেল ওরফে সানাউল্লা তার এক আত্মীয়কে নিয়ে সাভার থানায় ছুটে যান এবং পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে জানান। তার মা সানোয়ারা বেগম এবং বোন শাফিয়া খাতুনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা এবং তার মায়ের ঘড়ের আলমিরা ভেঙে স্বর্ণালংকার নিয়ে গেছে। এই ঘটনার মাস দেড়েক আগে সোহেল ওরফে সানাউল্লা সাভার থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী করেন। এতে উল্লেখ করা হয়, তার মামারা তার মাকে মারধর করেছেন। সাধারণ ডায়েরীর খবর জানতে পেরে সেদিন রাতেই হানিফ, হান্নান এবং মান্নান এসে সানোয়ারা বেগমকে মারতে থাকে। মা’কে রক্ষা করতে সানাউল্লা এগিয়ে আসলে তার মামারা তাকেও পেটাতে থাকেন এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে সানাউল্লা ওরফে সোহেলের মুখে কোপ বসিয়ে দেন। সেই আঘাতের চিন্হ এখনো তার মুখে স্পষ্ট। অন্যদিকে ঘটনার নাটের গুরু এরফান হাজীই লোক দেখানো খোঁজাখুঁজির করতে থাকেন এবং আহাজারি করতে থাকেন। সোহেল ওরফে সানাউল্লার সাথে পুলিশ এলে এরফান জানান, তার বিদেশ ফেরত মেয়ে সানোয়ারা এবং নাত্নী শাফিয়া খাতুনকে কেউ হয়তো ধরে নিয়ে গেছে। অথবা সানোয়ারাই তার মেয়েকেসহ কারো সাথে পালিয়ে গেছে। মাত্র দশ মিনিটের মধ্যেই পুলিশ বুঝে ফেলে আসল ঘটনা। কিন্তু এসবের নাটের গুরু যে হাজী এরফান, সেটা পুলিশ কল্পনাও করতে পারেনি। থানায় মামলা জোড়া খুনের মামলা হয়। সাভার মামলা নম্বর ৬২ (৪) ২০০১। হাজী এরফান উদ্দিন এবারও ফন্দি আঁটেন। তিনি পুলিশকে পঞ্চাশ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে সানোয়ারা বেগমের ছেলে সানাউল্লা ওরফে সোহেলকেও আসামী করান। ঘটনার দিন থেকেই মামলার অন্যতম আসামী, এরফান হাজীর ছেলে হানিফ ফেরারি আছে। পুলিশ সানাউল্লা ওরফে সোহেলকে রিমান্ডে নিয়ে ব্যাপক নিযাতন চালায় এবং তাকেই ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিতে বাধ্য করে।
বিচারে যা হয়ঃ
বিচারিক আদালত (অতিরিক্ত দায়রা জজ সপ্তম আদালত, ঢাকা), ৩২৯/২০০২ মামলায় সানাউল্লা ওরফে সোহেলকে মৃত্যুদন্ড এবং তার মামা হানিফ, হান্নান ও মান্নানকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডাদেশ প্রদান করেন।
পরবর্তীতে হাইকোর্ট হান্নানকে বেকসুর খালাস প্রদান করে মান্নান এবং পলাতক হানিফের সাজা বহাল রাখেন। আর সানাউল্লা ওরফে সোহেল-এর সাজার বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত না দিয়ে এটি পূনরায় বিচারের জন্য নিম্ন আদালতে পাঠিয়ে দেন এবং পূর্ববর্তী রায় প্রদানকারী জজ এবং মামলার সরকারী কৌশলী বা পাবলিক প্রসিকিউটারকে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করেন। মহামান্য হাই কোর্ট এর আদেশক্রমে মামলার পূনঃবিচার ৬০ কার্যদিবসেই সম্পন্ন করার কথা। সেই অনূযায়ী ২০০৮ সালের ১৬ই জানুয়ারি মামলার পুনঃবিচার শুরুও হয়। কিন্তু ২০০৯ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি অবধি মামলার পূনঃবিচার চলমান থাকার পর অজানা কারণে আর রায় ঘোষনা হয়নি। এখানে উল্লেখ্য, হাইকোর্ট বলেছিলেন মামলার বিচার ৬০ দিনে সম্পন্ন করতে, অথচ নিম্ন আদালত সেটি মানেননি। তারা পূনঃবিচার চালিয়ে যান পূরো ১৩ মাস, যা আদালত অবমাননার শামিল।
কনডেম সেলে অসহায় সানাউল্লাঃ
বিগত ১৭ বছরের বেশী সময় ধরে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফাসির সেলে দিন কাটছে সানাউল্লা ওরফে সোহেলের। মাঝে-মাঝে তার খোজ নেন ছোট খালা রাবেয়া সুলতানা এবং তার স্বামী ইয়াহিয়া। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত হানিফ, পিতা হাজী এরফান উদ্দিম গত ১৭ বছর যাবতই ফেরারি। অন্তত পুলিশের চোখে। যদিও হানিফ প্রকাশ্যেই ভাটারা, বাড্ডা এবং বসুন্ধরা এলাকায় ঝালমুড়ি বিক্রী করে সংসার চালায়। সানাউল্লা ওরফে সোহেলের এই সীমাহীন দূর্ভোগের বিষয়টির প্রতি দেশের সাংবাদিক সমাজ, মানবাধিকার সংগঠন এবং সুংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিবর্গ দৃষ্টি দেবেন কি?

