* ২৪ ব্রান্ডে মিলেছে মাদকের উপাদান।
* বিএসটিআইয়ের ভুয়া লাইসেন্সে বিক্রি হচ্ছে ২৭ ব্রান্ডে।
* মেশানো হচ্ছে যৌন উত্তেজক ভায়াগ্রার উপাদান।
* কর ফাঁকি দিতে এনার্জি ড্রিংকস হয়ে গেছে কোমল পানীয় শক্তি সঞ্চয়ের নামে মানবদেহে ভয়ঙ্কর রোগের বাহক ঢোকাচ্ছে এনার্জি ড্রিংকস। বাজারে প্রচলিত ২৪টি ব্রান্ডের পুষ্টিকর সিরাপ ও এনার্জি ড্রিংকসের রাসায়নিক পরীক্ষায় মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর মাদকের উপাদান মিলেছে। যেখানে পাওয়া গেছে যৌন উত্তেজক রাসায়নিক পদার্থ অপিয়েট ও সিলডেনোফিল সাইট্রেড বা যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট ভায়াগ্রা ও সেনেগ্রার উপাদান।
* মিলেছে মাত্রাছাড়া ক্যাফেইন ও উচ্চমাত্রার অ্যালকোহল। এনার্জি ড্রিংকস সেবনে শারীরিক ও মানসিক শক্তি চাঙ্গা হবে বলে নামিদামি বেভারেজ কো¤পানিগুলো চটকদার বিজ্ঞাপন প্রচার করে নারী-শিশুসহ সব বয়সি ভোক্তাকে বিভ্রান্ত করছে।
এই নেশাজাতীয় যৌন উত্তেজক এনার্জি ড্রিংকসে সয়লাব হয়ে গেছে দেশ। মানহীন এসব পানীয় পান করে ভয়াবহ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে মানুষ। এই এনার্জি ড্রিংকস সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করে বলে যুবসমাজ এই মরণ নেশার দিকে ঝুঁঁকে পড়ছে। যে কারণে একই নামে বাজারে একাধিক এনার্জি ড্রিংকস বিক্রির প্রতিযোগিতায়ও নেমেছে কয়েকটি কো¤পানি। বৃহদাকারের পাশাপাশি এখন ক্ষুদ্র পরিসরে ছোট্ট একটি রুমেই গোপনে নেশাজাতীয় এনার্জি ড্রিংকস তৈরি করা হচ্ছে। র্যাব-পুলিশ এ ধরনের বেশ কয়েকটি কারখানায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ নেশাজাতীয় এনার্জি ড্রিংকস উদ্ধার করেছে গত এক বছরে।
চিকিৎসকদের মতে, এনার্জি ড্রিংকসে মাদকের উপাদান সেনেগ্রা ও ভায়াগ্রা শরীরে উত্তেজনা তৈরি করে। স্বাভাবিক ও সুস্থ মানুষের জন্য সহনীয় হলেও যাদের হৃদযন্ত্র দুর্বল তাদের ঝুঁকি থাকে। অতিরিক্ত মাত্রার ক্যাফেইন ডায়াবেটিসের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। এনার্জি ড্রিংকস যৌনশক্তি
হ্রাস, হৃদরোগ ও কিডনির তির মারাত্মক কারণ হতে পারে বলে চিকিৎসকরা একে একরকম বিষ বলেও আখ্যায়িত করেছেন। তবে বাজারে বিক্রি হওয়া পানীয়গুলোর কোনো-কোনোটির বোতলের গায়ে লেখা আছে, ঔষধি গুণস¤পন্ন, হৃদরোগ প্রতিরোধক, যৌনশক্তি বাড়ায়, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ কমায়। ক্রেতা আকর্ষণ করতেই ব্যবসায়ীরা এই পন্থা অবলম্বন করছে।

এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের ডিন অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, গর্ভবতী মায়েদের বেলায় ক্যাফেইন বেশি ক্ষতিকর। গর্ভাবস্থায়
কেউ ক্যাফেইন সমৃদ্ধ বেভারেজ পান করলে নিজের ক্ষতি ছাড়াও গর্ভপাত ও অনাগত সন্তান জন্মগতভাবে বিকলাঙ্গ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ ছাড়া নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এই এনার্জি ড্রিংকস শিশুরা পান করলে তাদেরও আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, মানবদেহে
অতিমাত্রায় ক্যাফেইন প্রবেশ করলে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ বাসা বাঁধতে পারে। কণ্ঠস্বরের নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটতে পারে। ক্ষতিকর ও নেশাজাতীয় উপাদান মেশানো এক বা দুই বোতল সফট ড্রিংকসে
উদ্বেগ প্রবণতা, পেশিতে টান লাগা, অসংলগ্ন কথাবার্তা, বিষণœতা এবং উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১২ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সিলডেনোফিল সাইট্রেট বা ভায়াগ্রা ও সেনেগ্রা পূর্ণবয়স্কদের যৌন উত্তেজনা এনে দিতে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ১ থেকে ১৭ বছর বয়সিদের বেলায় এটা ক্ষতিকর। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের এক গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভবতী নারীদের মধ্যে যারা সফট ড্রিংকস পান করেছেন তাদের গর্ভপাত, নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রসব বা কম ওজনের সন্তান জন্ম দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ ছাড়া সফট ড্রিংকস দেহে অক্সিজেনের পরিমাণ কমিয়ে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে শিশুদের জন্য এনার্জি ড্রিংকস নিষিদ্ধ করেছে লিথুয়ানিয়া। বাল্টিক সাগর-তীরবর্তী দেশটিতে ১৮ বছরের কম বয়সি কারও কাছে এ ধরনের পানীয় বিক্রি করা নিষিদ্ধ করে গত মে মাসে পার্লামেন্টে আইন পাস করা হয়। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই) সূত্র জানায়, বিডিএস ১১২৩ অনুযায়ী এনার্জি ড্রিংকস বা কার্বনেটেড বেভারেজে ক্যাফেইনের মাত্রা কোনোভাবেই প্রতি লিটারে ২০০ মিলিগ্রামের বেশি মেশানো যাবে না। কিন্তু সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী ক্যাফেইনকে কালো তালিকাভুক্ত করায়
কার্বনেটেড বেভারেজে ক্যাফেইনের মাত্রা কমিয়ে ১৪৫ মিলিগ্রামে নামিয়ে আনে বিএসটিআই। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে কার্বনেটেড বেভারেজে ক্যাফেইনের মাত্রা ১৪৫ ও ইউরোপে এটির মাত্রা ১৩০ -এর বেশি নয়। মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের (ডিএনসি) একজন কর্মকর্তা জানান, এনার্জি ড্রিংকস বা বেভারেজে মাদকের অন্যতম উপাদান ভায়াগ্রা ও সেনেগ্রা মেশানো স¤পূর্ণ বেআইনি। তরুণদের আকৃষ্ট করতে কেউ কেউ এটা করে থাকে। ক্যাফেইনের মাত্রাও ১৪৫ মিলিগ্রামের বেশি হলে সেটা মাদকে পরিণত হয়। এর চেয়ে অনেক বেশি মাত্রার ক্যাফেইন পাওয়া গেলে তা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কিন্তু রাসায়নিক পরীক্ষায় কোনো-কোনোটিতে ২৭০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত ক্যাফেইন পাওয়া গেছে।
এনার্জি ড্রিংকসের ক্ষতিকর উপাদান ও মান যাচাই করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেয়। পরবর্তীকালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ
অধিদপ্তর দেশি-বিদেশি ৪৬টি র্ব্যান্ডের এনার্জি ড্রিংকসের রাসায়নিক পরীক্ষা চালায়। কেন্দ্রীয় রাসায়নিক পরীক্ষাগারে প্রাপ্ত ফলাফলে বাজারে প্রচলিত ২৪টি র্ব্যান্ডের এনার্জি ড্রিংকসে যৌন উত্তেজক ভায়াগ্রা ও সেনেগ্রার উপাদান সিলডেনোফিল সাইট্রেট ও অ্যালকোহল পাওয়া যায়, যা মাদক হিসেবে ধরা হয়। এর মধ্যে নামিদামি ২৭টি র্ব্যান্ডের এনার্জি ড্রিংকসে বিএসটিআইয়ের ভুয়া লেবেল লাগানো। বিএসটিআই এসব পানীয়ের কোনো লাইসেন্স দেয়নি। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ, ১৯৮২ অনুযায়ী
কোনো পানীয়তে যৌন উত্তেজক রাসায়নিক পদার্থ অপিয়েট ও সিলডেনাফিল ব্যবহার নিষিদ্ধ।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রাজনৈতিক) ড. কামালউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, বিএসটিআইয়ের ভুয়া লেবেল লাগিয়ে বাজারে বিক্রি হওয়া ২৭টি ব্রান্ডের এনার্জি ড্রিংকসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিএসটিআইকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিএসটিআইয়ের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, মানহীন এনার্জি ড্রিংকস কো¤পানির বিরুদ্ধে বিএসটিআইয়ের অভিযান চলমান রয়েছে।
রাসায়নিক পরীক্ষায় যেসব পানীয়তে উচ্চমাত্রার ক্যাফেইন, অ্যালকোহলসহ ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া গেছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- খুলনার জেডএম এগ্রো ফুড অ্যান্ড বেভারেজের ডাবল হর্স, পাবনার ইন্ট্রা ফার্মাসিউটিক্যালস (ইউএন) লিমিটেডের জিনসিন প্লাস, কুমিল্লার চান্দিনার জাহান ফুড প্রোডাক্টের মাশরুম ও জাহান মাশরুম গোল্ড গাজীপুরের সততা এগ্রো ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের জিসনিস পাওয়ার, সাভারের এগ্রো ফুড অ্যান্ড বেভারেজের জিন্টার, ঢাকার তনু নিউট্রিশন ফুড অ্যান্ড কসমেটিকস প্রোডাক্টের তনু লায়ন ফ্রুট সিরাপ বগুড়ার উত্তরা ল্যাবরেটরিজের জিনসিন, আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজের ওয়াইল্ড ব্রিউ, ঢাকার থ্রি স্টার ইউনানী ল্যাবরেটরিজের জিন্টার প্লাস জিনসিন ও জিনসিন। গাজীপুরের পুবাইলের বিএনসি এগ্রো ফুড অ্যান্ড বেভারেজের হর্স ফিলিংস, হো ফুড অ্যান্ড হার্বাল প্রোডাক্টের কোরিয়ান রেড জিনসিং, ঢাকার রানা ফুড অ্যান্ড বেভারেজের হাই পাওয়ার ফিলিংস, সাভারের আসিফ এগ্রো ফুড ও বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজের সেভেন হর্স ফিলিংস ঢাকার থ্রি স্টার ইউনানী ল্যাবরেটরিজের জিন্টার প্লাস জিনসিন, দুবাইয়ের ব্রাবিকান রেডবাল জার্মানির টিনজার ফ্রান্সের হলসটিন থাইল্যান্ডের সিঙ্গা অস্ট্রেলিয়ার পাওয়ার হর্স, হল্যান্ডের রয়েল ডাচ, ব্রাভারিয়া ও থ্রি-হর্সেস। ফলের সিরাপ, কার্বনেটেড বেভারেজসহ কম ক্ষতিকর উপাদানসমৃদ্ধ পানীয় উৎপাদনের জন্য বিএসটিআইয়ের লাইসেন্স (বিডিএস ১১২৩:২০০৭) নিয়ে প্রতারণামূলক ও কর ফাঁকি দিয়ে ক্যাফেইন, ভায়াগ্রা মিশ্রিত এনার্জি ড্রিংকস তৈরি হচ্ছে আরও সাতটি ব্রান্ডের বেলায়। এগুলো হলোÑঢাকার তনু নিউট্রিশন ফুড অ্যান্ড কসমেটিকস প্রোডাক্টের তনু লায়ন ফ্রুট সিরাপ, বনানীর ফু-ওয়াং ফুডস লিমিটেডের ফু-ওয়াং, গ্লোব সফট ড্রিংকস নোয়াখালীর রয়েল এনার্জি ড্রিংকস ও ব্ল্যাক হর্স, ধামরাই ঢাকার আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজের ¯িপড, গাজীপুরের ময়মনসিংহ এগ্রো লিমিটেডের পাওয়ার।

জানা গেছে, বিএসটিআই, ঔষধ প্রশাসনকে অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে প্রতারণামূলকভাবে নাম লিখিয়ে দেশীয় ব্রান্ডের ১০টি এনার্জি ড্রিংকস উৎপাদিত হচ্ছে। এগুলো হলোÑ থাইল্যান্ডের সিঙ্গা, অস্ট্রেলিয়ার পাওয়ার হর্স, আয়ুর্বেদীয় ফার্মেসি (ঢাকা) লিমিটেডের স্ট্রং-৫০০ (ইংরেজি ও বাংলা লেবেল), সেফ ফার্মাসিউটিক্যালসের ট্রিপ-অন ফু-ওয়াং ফুডস লিমিটেডের ফু-ওয়াং চাঁদপুরের এশিয়া এগ্রো ফুড অ্যান্ড বেভারেজের হর্স ফিলিংস গাজীপুরের গ্লোবাল বেভারেজ কো¤পানি লিমিটেডের এপি ফিজ ও দুবাইয়ের রেডবাল। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২৭টি এনার্জি ড্রিংকসের লেবেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগ (আইএনএফএস), বিএসটিআই, ঔষধ প্রশাসনকে অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু লাইসেন্স প্রদানকারী বিএসটিআই কোনো অনুমতি দেয়নি যেগুলোয় অতিরিক্ত মাত্রায় ক্যাফেইন রয়েছে। অন্যদিকে এনার্জি ড্রিংকসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নতুন করে অতিরিক্ত কর আরোপের পর কৌশল পাল্টে ফেলে অসাধু কিছু উৎপাদক। এতদিন ধরে বড় হরফে বাজারে যেসব এনার্জি ড্রিংকস বিক্রি হতো তার নাম পাল্টে রাখা হয়েছে কোমল পানীয়।
এনবিআর সূত্র জানায়, এনার্জি ড্রিংকসে স¤পূরক শুল্ক ২৫ শতাংশ আর কোমল পানীয়তে ১৫ শতাংশ। ১০ শতাংশ শুল্ক ফাঁকি দিতে এক শ্রেণির বেভারেজ কো¤পানি রাতারাতি এনার্জি ড্রিংকসের
নাম বদল করে ফেলেছে। এতে কয়েকশ কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। এ জন্য এনবিআর এরই মধ্যে নামিদামি কয়েকটি বেভারেজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করেছে। এর আগে এনার্জি ড্রিংকসের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে তা বন্ধে সোচ্চার হন বর্তমান সরকারের পাঁচ মন্ত্রী।
