নিজস্ব প্রতিবেদক:সরিষার তেলে ভেজাল করে দিনমজুর থেকে শতকোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়ার আফজাল হোসেন ( আকমল)। তার সরবরাহকৃত ভেজাল তেলের কারণে প্রাণ কোম্পানিও আজ আদালতের কাঠগড়ায়। এ কোম্পানির এক কর্মকর্তা যোগসাজসে এ ভেজাল তেল প্রাণের বোতলে ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। উল্লাপাড়া সদর ইউনিয়নের মাগুড়াডাঙ্গা গ্রামের শাহজাহান আলীর ছেলে আকমলের সম্পদের উত্থান আলাদিনের চেরাগকেও হার মানায়। তিনি ১৯৮৫ সালেও দুদফায় ছিচকে চুরির অপরাধে গণপিটুনি খান, পরে দিনমজুর হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করতেন। চুরি না করার শর্তে তিনি মানুষের হাতে পায়ে ধরে ১৯৮৮ সালে ইউপি সদস্য পদে ভোট করে বিজয়ী হন। এর পরেই চুরির মামলা থাকা আফজাল হোসেন নাম ত্যাগ করে তিনি হয়ে যান আকমল হোসেন।
কর্মচারি থেকে ২০০৬ সালে নিজেই মিল স্থাপন করেন। এর পরে তিনি সরিষার ভেজাল তেল উৎপাদন করে তা সরবরাহ শুরু করেন প্রাণ ও এসি আই কোম্পানিতে। সে থেকে ফুলে ফেপে ওঠে তার সম্পদ। বর্তমানে শত বিঘা কৃষি জমি, পৌরসভার মধ্যে ১০ বিঘা জমি, শহরের শ্যামলী পাড়ায় মার্কেটসহ আলিশান ৫তলা বাড়ি, ১০টি ট্রাক ও একাধিক মাইক্রোবাস এবং ব্যক্তিগত ব্যবহারের গাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে নামে-বেনামে সম্পদ রয়েছে।
বর্তমানে তার প্রায় শতকোটি টাকার ভেজাল তেল মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে উপজেলার আলম কসাইয়ের পাট বন্দরে প্রায় ২০ কোটি টাকা মূল্যের ১৫০ গাড়ি, পাট বন্দরে নিজের গোডাউনে ১২ কোটি মূল্যের ১০০ গাড়ি, বাকুয়ায় তার বড় জামাই জহুরুলের মিলের পেছনে ৪ কোটি টাকা মূল্যের ৩০ গাড়ি, চোকিদহে নিজস্ব মিলে রাখা আছে ২০ কোটি মূল্যের ২০০ গাড়ি তেল। এছাড়া কয়ড়া ইউনিয়নে চরপাড়া গ্রামে বিশাল গোডাইন ও চাতাল করে সেখানে প্রায় ৫০০ গাড়ি সরিষা মজুদ করে রেখেছে যার বাজার মূল্য ৫০ কোটি টাকা।
উল্লাপাড়ায় আকমলের মালিকানাধীন আব্দুল্লাহ ওয়েল মিলে বিষাক্ত কেমিক্যাল, পোড়া মবিল, পামওয়েল, পিঁয়াজের ঝাজ, শুকনো মরিচের গুঁড়া, মাস্টার্ড ও ইস্ট কেমিক্যালসহ রঙ মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে ভেজাল সরিষার তেল। চীন থেকে বিভিন্ন নামে আমদানী করে বিশেষ ধরণের সরিষা। চট্রগ্রাম বন্দর থেকে নিয়ে তা সংরক্ষণ করা হয় বিভিন্ন গুদামঘরে। আকমলের কারখানায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গোপনীয়ভাবে উৎপাদিত এসব ভেজাল তেল ড্রামভর্তি করে ট্রাকযোগে চলে যায় প্রাণ কোম্পানির নাটোর কারখানায়। বিশেষ ব্যবস্থায় পেছনের দরজা দিয়ে প্রতিদিন সরিষার ভেজাল এ সরিষার তেল ডামে ভরে ট্রাকযোগে সেখানে নেওয়া হয়। সেখান থেকে কোম্পানির মোড়কে ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে।
নাটোরের একডালায় অবস্থিত প্রাণ কোম্পানির জিএম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বিশেষ চুক্তির মাধ্যমেই এ কারবার দীর্ঘদিন চলে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিদিন ১২, ১৮ থেকে ২৪ লাখ টাকা মূল্যের তেল দিতেন আকমল। সেখানে ড্রামভর্তি তেলের এক গাড়ির দাম পড়তো ১২ লাখ। নিম্নমানের এ তেল লেনদেনের মাঝে চুক্তিমোতাবেক মোটা অংকের টাকা নিয়েছেন জিএম নাসির। তিনিও বর্তমানে বিত্ত বৈভবের মালিক বনে গেছেন। দীর্ঘদিন এ ব্যবসা চলে আসলেও মাস ছয়েক আগে তা সাময়িক বন্ধ রয়েছে।
সম্প্রতি এ প্রসঙ্গে জিএম নাসিরের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, আকমল হোসেন নামে কারো সাথে আমার যোগাযোগ হয়নি। তার কাছ থেকে তেল নেবার প্রশ্নই আসেনা। প্রাণ নিজস্ব ভাবে তেল উৎপাদন করে যথাযথ মান নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে বাজারজাত করে থাকে।
মেসার্স আব্দুল্লাহ ওয়েল মিলের সত্বাধিকারী আকমল হোসেন ভেজাল সরিষার তেল উৎপাদনের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, প্রাণ কোম্পানির জিএম নাসির স্যারের মাধ্যমে ঐ কোম্পানীতে আগে তেল সরবরাহ করতাম। ৭ থেকে ৮ মাস আগে প্রতি মাসে একট্রাক, দুই ট্রাক করে ব্যারেল হিসাবে তেল সরবারাহ করতাম। ওরা নিয়ে কোন মোড়কে বিক্রি করতো তা আমার জানা নেই।
সম্প্রতি বিএসটিআইয়ের পরীক্ষায় মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর উপাদান থাকার বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় প্রাণের গুঁড়া হলুদ, কারি পাউডার, লাচ্ছা সেমাইসহ বিভিন্ন কোম্পানি ও ব্র্যান্ডের ৫২টি খাদ্যপণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় প্রাণের সরিষার তেলের মধ্যেও ভেজাল পাওয়া গেছে।
খাদ্যপণ্যে ভেজালের বিষয়ে নর্দান ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুষ্টিবিদ তাসনিম আশিক বলেন, এই ভেজাল খাদ্যপণ্য খেলে হার্টে ব্লক, ক্যানসার, লিভার ও কিডনি ড্যামেজ (নষ্ট) হয়ে যেতে পারে।
তিনি বলেন, সরিষার তেলে কোনো আয়রন বা লৌহ জাতীয় পদার্থ থাকার কথা নয়। তবে সরিষার তেলে পাওয়া গেছে আয়রন। সরিষার তেলের যে ঝাঁঝ বাড়ানোর জন্য, অন্যধরনের তেলের মধ্যে এক ধরনের কেমিকেল মিশিয়ে সেই ঝাঁঝ বানিয়ে সরিষার তেল বলে বিক্রি করা হয়।
এর আগে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে একটি কারখানা সিলগালাসহ ৫ হাজার লিটার ভেজাল সরিষার তেল মাটিতে ঢেলে ধ্বংস, ২ ব্যবসায়ীকে ২ লাখ টাকা জরিমানা, সম্প্রতি একজনকে ৭০ হাজার এবং অন্যজনকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তিকে ম্যানেজ করে সেখানে আকমলসহ বেশ কিছু কারবারি ভেজাল তেলের উৎপাদন অব্যাহত রেখেছেন।

