সম্পৃক্ত হচ্ছে শিশু শ্রম

0
2207

গরীর মোড়ে মোড়ে, দোকানে, গণপরিবহনের দুয়ারে ঝুলে চিৎকার করে যাত্রী ডাকা অবস্থায় শিশু-কিশোরদের উপস্থিতি হরহামেশায় চোখে পড়ে। কিন্তু সম্প্রতি শিশু শ্রমের ব্যাপারটি যেন আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। হালকা-ভারী, কম ঝুঁকিপূর্ণ-বেশি ঝুঁকিপূর্ণ সবধরনের কাজে সম্পৃক্ত হচ্ছে শিশু শ্রম। চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের মতো পাইকারি বাজারে মালবোঝাই ভ্যান-ঠেলা গাড়ি চালনা থেকে শুরু করে ছোট্ট কাঁধে ভারী ভারী চাল-ডালের বস্তা বোঝাইয়ের কাজ করছে শিশু-কিশোরেরা।

Advertisement

একদল সুযোগ সন্ধানী দোকান মালিক কম দামে শিশু শ্রম পাওয়া যায় বলে এদের আরও বেশি বেশি সম্পৃক্ত করছে এসব কষ্টসাধ্য কাজে। চাক্তাই চালপট্টির নতুন রোডে একটি পাইকারি দোকানে নওগাঁ থেকে বড় ট্রাকে করে চালের চালান এসেছে। ট্রাক থেকে বস্তা বোঝাই করে দোকানে চাল ঢুকানোর কাজ করছে জনাবিশেক শ্রমিক, যেখানে প্রায় অর্ধেকই অপ্রাপ্ত বয়সী শিশু-কিশোর। এদের কেউ সরাসরি বস্তায় মাথায় করে চাল দোকানে ঢুকাচ্ছে, কেউবা ট্রাকে দাঁড়িয়ে অন্যের মাথায় বস্তা তুলে দেওয়ার কাজ করছে। দোকানের মালিককে শিশু শ্রমিক নিয়োগের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি উল্টো যুক্তি দেখান মানবতার-‘এরা অতীব গরীব ঘরের সন্তান। এরা কাজের বিনিময়ে যে পয়সা পায় তা দিয়েই এদের ঘর-সংসার চলে। এখন যদি এদের কাজ না দিই তাহলে তো এরা না খেয়েই মারা যাবে। তাছাড়া এরা কাজের জন্য যেভাবে ধরনা দেয়, ফিরিয়েও দিতে পারি না।’ এসব যুক্তিকে নিজেদের সুবিধাবাদিতা মনোভাবকে কূটকৌশলে আড়াল করার চেষ্টা বলে মনে করছেন চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ শ্রমিক কল্যাণ ইউনিয়নের সদস্যভুক্ত একাধিক শ্রমিক। একজন শ্রমিক তার নাম প্রকাশ না করার শর্তে সুপ্রভাতকে বলেন, ‘চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে অনেক বড় বড় ব্যবসায়ী আছেন যারা নানা কৌশলে শিশু শ্রমিকদের ব্যবহার করে। কারণ একজন পূর্ণ বয়স্ক শ্রমিককে দিন শেষে যে মজুরি দেওয়া লাগে, একজন শিশু শ্রমিককে সেক্ষেত্রে দিতে হয় মাত্র অর্ধেক। মোট কথা শিশু শ্রম হল সস্তা, তাই টাকা বাঁচানোর জন্য অনেক সুবিধাবাদী ব্যবসায়ীমহল শিশু শ্রমকে আস্কারা দিচ্ছে।’ অন্যদিকে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ শ্রমিক কল্যাণ ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. শফিউল্লাহ শিশু শ্রম ব্যবহারের বিষয়ে কারও প্রতি অভিযোগের আঙ্গুল না তুলে নিজেদের গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে বলেন, ‘আমাদের ইউনিয়নে ২ হাজার ৪ শ’ এর মতো নিবন্ধনভুক্ত শ্রমিক আছে। এসব শ্রমিকের বয়স ১৮ বছরের নিচে নয়। আমরা শিশু শ্রমকে নিরুৎসাহিত করার জন্য কখনও ১৮ বছরের কম বয়সী কোন শ্রমিককে ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত করি না।’ শুধু চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ বলে কথা নয়, নগরীর প্রায় সবখানেই এখন শিশু শ্রমিকদের যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করছে সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী মহল। যে বয়সে শিশু-কিশোরদের বই হাতে বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা, সেই বয়সে তারা সারা গায়ে কালি মেখে, জীর্ণ শীর্ণ বস্ত্রে শুধুমাত্র দুমুঠো ভাতের আশায় কলকারখানায় কাজ করে চলেছে। কারখানা মালিকরা নানা প্রলোভন দেখিয়ে এসব শ্রমিকদের ধরে রাখলেও তাদের দেওয়া হয় নামমাত্র বেতন। মুরাদপুরের হাড়িপাতিল তৈরির কারখানায় যেখানে শিশু দেহের অতীব ক্ষতিকারক পদার্থ অ্যালুমিনিয়াম আর সীসার ব্যবহার চলে সেখানে অত্যন্ত নাজুকভাবে শিশুদের খাটানো হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কারখানায় কাজ করা শিশু-কিশোরদের মরণঘাতী না জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারে। হাড়ি-পাতিলের কারখানায় কাজ করা মো. সাইফুল ইসলাম নামে ১০ বছরের এক শিশু শ্রমিকের কাছে জিজ্ঞেস করে জানা গেল তাকে সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কাজের বিনিময়ে বেতন দেয় মাত্র একশ বিশ টাকা। অথচ ওর চেয়ে অনেক কম সময়ের জন্য কাজ করে একজন পূর্ণ বয়স্ক শ্রমিককে দেওয়া হয় সাতশ’ টাকা বা ততোধিক। সংশ্লিষ্ট কারখানা মালিককে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান, ‘সাইফুলকে একশ’ বিশ টাকা দেওয়ার পাশাপাশি ২ বেলা ভাতও দেয়া হয়!’ কথা হয় চট্টগ্রাম বিভাগীয় কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক মো. আব্দুল হাই খানের সাথে। তিনি বলেন, ‘শিশু শ্রমের যথেচ্ছা ব্যবহারের ব্যাপারে ভালভাবেই অবগত ও সক্রিয় আছি। কিন্তু আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা খুব বেশি কিছু করতেও পারি না। যা করতে পারি তা হল শ্রম আদালতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা। কিন্তু শ্রম আদালতে গিয়ে দেখা যায় সেখানে কোন জজই নেই। তাছাড়া শিশু শ্রমিকদের যথাযথ পুনর্বাসন ব্যবস্থা ছাড়া যেকোন রকমের পদক্ষেপ খুব একটা ফলপ্রসূ ও বাস্তবসম্মত হয় না। তবু চেষ্টা করছি ওয়ার্ড কমিটি গঠনের মাধ্যমে এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে।’

Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here