২০১৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দার তালিকায় বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মরত বিভিন্ন স্থরে চিহ্নিত টিকেট কালোবাজারী ও নানা অনিয়মকারীদের যেসব নাম প্রকাশ করা হয় তার মধ্যে শীর্ষস্থানে ছিলো আতাউর রহমান আতা’র নাম।
এ আতা ২০০৫ সালে বিএনপি সরকারের ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে রেলওয়েতে চাকরি নেন। পর্যায়ক্রমে আতা হয়ে উঠেন রেলওয়ে দুর্নীতির এক ‘মূর্তিমান আতষ্ক’। তবুও বহাল তবিয়তে এ আতা।
২০০৫ সালে বিএনপি সরকারের সময় চাকরিতে যোগদানের পর হতে শুরু তার ক্ষমতার দাপট। আতার অধিনস্থদের উপর চালান দমন-নিপীড়ন। সিলেট থেকে আখাউড়া পর্যন্ত শুরু করেন ঘুষ বাণিজ্য। অযোগ্য অনেককেই চাকরি দেওয়া হত তার হুকুমে। রেলওয়ের প্লাটফর্মের দোকানগুলো থেকে তিনি মাশোয়ারা নেন নিয়মিত। এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য জানালেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়েতে কর্মরত অনেক কর্মকর্তা।
অনুসন্ধান করে জানা যায়, বাংলাদেশ রেলওয়ে কালোবাজারীদের নামের তালিকাসহ ২০১৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার পত্র নং গো/৬-৮৪(শ্রম)-১১(লুজ)/৬৩০ সূত্রের বরাত দিয়ে একাটি প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশ রেলওয়ে কালোবাজারী প্রসঙ্গে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের অনুরোধসহ সুপারিশসমুহ বাস্তবায়নের উদ্যোগ এবং অনিয়মের সাথে জড়িত কর্মকর্তা ও কর্মাচারীদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণপূর্বক মন্ত্রণালয়কে নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়। প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেন রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব নাফিসা আরেফিন।
এ আতাউর রহমান আতা মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার জয়চণ্ডী ইউনিয়নের রামপাশা এলাকার মৃত নৌশা মিয়ার ছেলে। প্রথমে তিনি রেলওয়ে (সিলেট-আখাউড়া) সেকশনের টিআইসি ছিলেন। পরবর্তীতে পদন্নোতি পেয়ে সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের সহকারী স্টেশন মাষ্টার নিযুক্ত হন। বর্তমানে তিনি ভারপ্রাপ্ত স্টেশন ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করছেন।
তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগের পাহাড় তার অনুসন্ধানে নেমে সত্যতা পাওয়া যায়। কারণ তিনি তার বাড়ি ও কর্মস্থল একই স্থানে হওয়াতেই এমন বেপরোয়া। স্থানীয় জনসাধারণের অভিযোগ- তিনি সিলেট অঞ্চলের বাসিন্দা হয়ে কি ভাবে এই সেকশনে কাজ করেন? যার কারণেই তিনি এত প্রভাব কাটাচ্ছেন।
অনুসন্ধানে আরোও জানা যায়, ছাত্র জীবনে আতাউর ছাত্রদলের রাজনীতি করেছেন। কুলাউড়া ডিগ্রি কলেজ ছাত্রদলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ছিলেন। তার পরিবারসহ অনেক আত্মীয় স্বজন বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত। সেই সুবাধে আতাউর রহমান দলীয় প্রভাবে রেলওয়েতে চাকরি পান। সেই থেকেই ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু করেন। স্থানীয়রা উদাহরণ স্বরুপ জানালেন- তার চাচা মৃত বাতির মিয়া ছিলেন এলাকার চিহ্নিত কুখ্যাত রাজাকার।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। নানা সময় আতার অনিয়ম উঠে আসে গণমাধ্যমেও। তিনি সিলেট থেকে আখাউড়া পর্যন্ত ঘুষ বাণিজ্য শুরু করেন। তার নির্দেশের বাহিরে কেউ চলতেই পারত না। তার হুকুমে হত চাকরি দেয়া-নেয়া। সাথে ঘুষ বাণিজ্য তো আছেই।
সরেজমিনে কুলাউড়া থেকে জানা যায়, শুধু কুলাউড়ায় রয়েছে আতাউরের বেশ কয়েকজন কর্মীবহর। যারা বিভিন্ন স্টেশন থেকে মাশোয়ারা উত্তোলন করে তাকে সরবরাহ করেন। জড়িতে রয়েছেন টিকেট বাণিজ্যেও। দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করে আতা অনেক সম্পদ তৈরী করেছেন। যার মূল্য কোটি টাকার উপরে। তার আত্মসাৎ থেকে রেহায় পায়নি রেলওয়ের পুরাতন গাছগুলোও। নিজ বাড়ির পাশে কুলাউড়া-সাবাজপুর রেললাইনের রামপাশা রেলওয়ে গ্যাং কোয়াটারের অনেক পুরাতন গাছ তার নির্দেশে কেটে নেওয়ার অভিযোগ আছে। অভিযোগ আছে কুলাউড়ায় রেলওয়ের জমি দখল, স্থাপনা নির্মাণ, অবৈধ বিদুৎ সংযোগ দেওয়ার পেছনে মূল হুতা এ আতা।
এসব বিষয়ে একাধিক গণমাধ্যমে উঠে আসলেও তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থ নেওয়া হচ্ছে না। এমন প্রশ্ন নিয়ে স্থানীয় জনসাধারণের মনে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে।
এবিষয়ে আতাউর রহমান আতা তার বিরুদ্ধে আনিত সব অভিযোগ গণমাধ্যমকে অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, কেউ আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। এসব অভিযোগের ভিত্তি নেই।
রেলওয়ে পূর্ব চট্রগ্রাম দপ্তরের সহকারী মহা ব্যবস্থাপক গৌতম কুমার ক্লু সাংবাদিকদের জানান- কোনো কর্মকর্তা এসব অপকর্মে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে তদন্ত হবে। তদন্তে প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

