প্রতিনিধি, রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) ঃ
‘হালাল টাকা দিয়ে ইয়াবা ব্যবসা করি। এটা আবার অবৈধ হয় কেমনে? আমরা হারাম খাই না, নিজের টাকা খাটাইয়া হানড্রেড পার্সেন্ট হালাল রুজি করি।’ এই বক্তব্য রূপগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের রঘুরামপুর এলাকার একজন চিহ্নিত ইয়াবা ব্যবসায়ীর। কেবল এই ব্যক্তিই নন- রূপগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর ইউনিয়নের বেশির ভাগ ইয়াবা ব্যবসায়ী ইয়াবা পাচার ও এর ব্যবসাকে অবৈধ ব্যবসা হিসেবে দেখেন না। তাঁদের প্রায় সবারই এ বিষয়ে বক্তব্য এক ও অভিন্ন। অনুসন্ধ্যানে জানা যায়, দাউদপুর ইউনিয়নে বড় বড় ইয়াবার স্পট গুলো রয়েছে দাউদপুর ইউনিয়নের রঘুরামপুর (ফুলবাড়ীয়া) এলাকার মৃত ছুমর উদ্দিন খানের পুত্র ইয়াবা স¤্রাট মোঃ ইমান খান, মৃত মইজদ্দিন মিয়ার পুত্র মোঃ আরমান মিয়া, বাগরাইটেক এলাকার লাল মিয়া লালুর পুত্র মোঃ ওমেদ আলী, আজাহার মিয়ার পুত্র সবুজ মিয়া ওরফে সবু, কুলিয়াদি এলাকার মৃত হাজী ছুমর উদ্দিন খানের পুত্র মেহের আলী খান, চাঁন মিয়ার পুত্র মোঃ কামাল মিয়া ও খোকন মিয়া, সিরাজদ্দিনের পুত্র মোঃ মামুন তালুকদার, উত্তর ব্রাহ্মনখালী এলাকার মৃত কুদ্দুস খানের পুত্র নূরুজামান খান খানজার নিয়ন্ত্রণে। অনুসন্ধ্যানে আরো জানা যায়, দাউদপুর ইউনিয়নের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে এসব বড় বড় ইয়াবা ব্যবসায়ীদের বিক্রয় প্রতিনিধি। মাঝে মধ্যে পুলিশ কয়েকজন বিক্রয় প্রতিনিধিদের ইয়াবাসহ আটক করলেও বড় বড় গডফাদাররা রয়েছে ধরাছোয়ার বাহিরে। বরং ইয়াবার গডফাদাররা আটককৃতদের জামিনে এনে পুণরায় এলাকায় ইয়াবার বিস্তার ঘটাচ্ছে। এছাড়া কাকে মেরে কে মাঠ দখল করবে ? কে কোন এরিয়া চালাবে ? কাকে কত দিতে হবে এসব দৌরাত্ম্যের মধ্যে গডফদাররা দিন পার করছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ইয়াবা ব্যবসায়ী বলেন, ‘বাপের জমি বেচা টাকা দিয়ে এই ব্যবসা করি। শতভাগ হালাল টাকার ব্যবসা। টেকনাফ থেকে পাইকারী ইয়াবা ব্যবসায়ীরা নিয়ে আসে। আর দাউদপুরে আমরা তাদের থেকে টাকার বিনিময়ে কিনে নিয়ে ব্যবসা করি। এটা আমার কাছে অবৈধ মনে হয় না। এই দানার ব্যবসা কইরা আমরা বেকারত্ব দূর করছি। বাড়িতে ভালো ঘর করছি। দামি বাইক কিনছি।’ ওই ব্যবসায়ী জানান, টেকনাফ থেকে এসব ইয়াবা প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কৌশলে দাউদপুরে ঢোকানো হয়। তবে বিভিন্ন কৌশলের আশ্রয় নিতে হয়। দাউদপুরে পৌঁছানোর পর দাউদপুর থেকে পুরো উপজেলায় বিশেষ কৌশলে ছড়িয়ে পড়ছে এই ইয়াবা। তাঁর মতে, সব কিছুকে ছাড়িয়ে গেছে এই ইয়াবার ক্রয়-বিক্রয়, গ্রাহক ও চাহিদা। খুব কম সময়ে অনেক টাকার মালিক হওয়া যায়। আর আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারিতে পড়লেও সমঝোতার মাধ্যমে সহজে ছাড়া পাওয়া যায়। কিভাবে এই ব্যবসা পরিচালনা করেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখন সায়েন্সের যুগ। একবার হ্যালো করলেই তো হয়ে যায়। মোবাইল ফোনে সহজে কথা বলে আন্ডারগ্রাউন্ডের ব্যবসায়ীদের রকমভেদে দাম নির্ধারণ করা হয়। দাম-দর ঠিক হলে পাচারকারীর মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তর করার প্রক্রিয়া শুরু করি। ইয়াবা কখন পৌঁছাবে, এখন কোন জায়গায়, কোনো সমস্যা হয়েছে কি না ইত্যাদি বিষয়ে মোবাইলে কথা বলে নিই। তবে এক নাম্বার আমরা বেশিদিন রাখি না। বারবার ফোন নাম্বার চেঞ্জ করি।’ অনেক সময় মোবাইলে রূপক অর্থ ব্যবহার করেন বলে জানান এই ইয়াবা ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, ‘কথা বলার সময় যদি অপরিচিত মানুষের সামনে পড়ে যাই, তখন ইয়াবাকে ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করি। অনেক সময় বিভিন্ন সংকেতও ব্যবহার করি। যেমন ইয়াবার দাম ও আকার নির্ধারণ করতে বলি বড় ভাই কত, ছোট ভাই কত বলে।’ অন্য একজন বলেন, ‘যদি কেউ অপরাধ করে থাকেন তবে তাঁরা প্রশাসনের লোক ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী। দাউদপুর ইউনিয়নে ব্যবসা করতে হলে প্রত্যেককেই থানা পুলিশ, ভোলাব ফাঁড়ি পুলিশ, কাঞ্চন ফাঁড়ি পুলিশ, ডিবি পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে টাকা দিতে হয়। এই টাকার ভাগ নেন গোয়েন্দা সংস্থার লোকরাও। স্থানীয় অসাধু রাজনীতিবিদদের এজেন্টরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা তোলেন। এর পরও আমাদেরকে অবৈধ মাদক ব্যবসায়ী বলা হয়’- আক্ষেপ করে বলেন তিনি। অন্য এক ব্যবসায়ী বলেন, ইয়াবা ব্যবসা অবৈধ হলে এত ইয়াবা আসে কেন? তা ছাড়া যেসব ইয়াবা ধরা পড়ে সেগুলোই বা কিভাবে আবার ব্যবসায়ীরা পান? এ ব্যাপারে রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইসমাইল হোসেনের সাথে কথা হলে তিনি জানান, রূপগঞ্জ থানার কোন অফিসার মাদক থেকে টাকা নেয় না, মাদক ব্যবসায়ীদের অনেক কেই আমরা ধরে মামলা দিয়েছি, যারা পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে মাদকের ব্যবসা করছে তাদেরকে ধরে মামলা দেওয়া হবে।
