নগরের অন্যতম প্রবেশমুখ অক্সিজেন মোড়। ওই পথ দিয়ে নগরের একাংশ, উত্তর চট্টগ্রাম এবং দুই পার্বত্য জেলা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির লাখো মানুষ যাতায়াত করে প্রতিদিন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মোড়টিতে যানজট লেগেই থাকে সারাক্ষণ। এতে সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হন পথচারী ও যাত্রী সাধারণ। গতকাল শনিবার সাপ্তাহিক সরকারি ছুটি। অন্যদিনের চাইতে এখানে যানজট কম থাকার কথা। সময় তখন সকাল ১১টা ৪০ মিনিট। অক্সিজেন মোড়ের পেট্রলপাম্পের সামনে সড়কের দুপাশে যানজট।
গ্রামাঞ্চলে চলাচলের পারমিট থাকা অনেক অটোরিকশা যত্রতত্র দাঁড়িয়ে যাত্রী উঠানামা করছে। অন্যান্য যানবাহনেরও জট রয়েছে। এ সময় পেট্রলপাম্পের সামনে দুজন ট্রাফিক কনষ্টেবল থাকলেও যানজট নিরসনে তাঁদের কোনো তৎপরতা নেই। সড়কের একটু সামনে এসে দেখা যায় ডানপাশে বায়োজিদ সড়কমুখীও তীব্র যানজট। সেখান থেকে কয়েক শ গজ দূরে অক্সিজেন কুয়াইশ-সংযোগ সড়কের মুখ। সেখানেও যানজট। এর পাশে মুরাদপুরমুখি সড়কে বেশ কিছু অটোটেম্পো যত্রতত্র দাঁড়িয়ে আছে। এছাড়া আছে বিপরীত দিক থেকে (মুরাদপুর থেকে অক্সিজেনমুখি) আসা যানবাহনের চাপ। ওই গাড়িগুলো অক্সিজেন মোড়ের দিকে যেতে পারছে না যানজটের কারণে। এভাবে যখন অক্সিজেন মোড়ে মারাত্মক যানজট সৃষ্টি হয়েছে তখন দেখা যায়, কুয়াইশ সংযোগ সড়কের মুখে ডানপাশে অক্সিজেন পুলিশবক্সের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন ট্রাফিক সার্জেন্ট নাজমুল ইসলাম, অন্য এলাকায় দায়িত্বে থাকা সুকেন নামে আরেক ট্রাফিক সার্জেন্ট এবং অক্সিজেন এলাকার দায়িত্বরত তিন ট্রাফিক কনস্টেবল। ওই সময় প্রতিবেদককে ছবি তুলতে দেখে কনস্টেবলদের একজন সরে পড়েন। এদিকে যানজটে পথচারী ও যাত্রীসহ যানবাহনের চালক-শ্রমিকদের যখন ত্রাহি অবস্থা তখনও ওই দিকে দেখার যেন সময় নেই দুই সার্জেন্টসহ কনস্টেবলদের। আর এই যানজটের মধ্যে সকাল ১১টা ৪৭ মিনিটে দেখা যায়, কনস্টেবলরা একটি মাইক্রোবাস সিগন্যাল দিয়ে থামিয়েছেন। সার্জেন্ট নাজমুল পুলিশ বক্সের সামনে দাঁড়িয়ে ওই গাড়ির লোকজনের সঙ্গে কানাঘুষা করছেন। জানা গেছে, সার্জেন্ট কিংবা তাঁর নির্দেশনা ছাড়া সড়কে চলাচলরত কোনো যানবাহন ধরার নিয়ম নেই ট্রাফিক কনস্টেবলদের। কিন্তু ১১টা ৪৮ মিনিটে দেখা যায়, লিটন নামে এক কনস্টেবল নিজেই যানজটের মধ্যে ওই এলাকায় একটি কাভার্ড ভ্যান আটকে রাখেন। তাঁর পেছনেই সারি সারি গাড়ি। এক পর্যায়ে ওই গাড়িটি এক পাশে ডেকে নিয়ে কুয়াইশ সংযোগ সড়কের মুখে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই গাড়ির চালক মো. স্বপন বলেন, ‘গাড়ির সব কাগজপত্র আছে। এরপরও ওনি (কনস্টেবল) বলছেন গাড়ি এখানে রাখার জন্য। এখন গাড়ির ডকুমেন্ট নিয়ে যাচ্ছি।’ ১১ টা ৫৫ মিনিটে দেখা যায়, চার লেন বিশিষ্ট তিনটি সড়কেই যানজট। কিন্তু সার্জেন্ট নাজমুল সড়কের উপর দাঁড়িয়ে দুই যুবকের সঙ্গে আলাপচারিতায় মগ্ন। দুপুর ১২টার দিকে একটি মিনিবাসের চালক বলেন, ‘যানজটের জন্য এই এলাকায় গাড়ি চালাতে পারি না। মধ্যরাতেও এখানে যানজট থাকে।’ চট্টগ্রাম জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সভাপতি মঞ্জুরুল আলম চৌধুরী মঞ্জু বলেন, ‘এই প্রবেশ মোড়টা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের অনেক গাড়ি অক্সিজেন থেকে দুই পার্বত্য জেলা ও উত্তর চট্টগ্রামে চলাচল করে। ট্রাফিক বিভাগ যেভাবে দায়িত্ব পালন করার কথা কিন্তু তারা তা করছে না। এখানে যারা দায়িত্ব পালন করছে তাদের নজর অবৈধ আয়ের দিকে। গাড়ি দাঁড় করিয়ে চাঁদাবাজি করছে ট্রাফিক পুলিশ। অটোরিকশাগুলো এখানে থাকতেই পারে না। কিন্তু ট্রাফিক ও থানা পুলিশকে ম্যানেজ করে অবাধে চলছে গ্রামের গাড়ি শহরে। যানজটের জন্য ওই গাড়িগুলো দায়ী হলেও কিন্তু ট্রাফিক পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘ট্রাফিক পুলিশের অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কারণে যানজট হচ্ছে। আমরা আরটিসি সভায় এই এলাকায় যানজট নিরসনের জন্য বার বার দাবি জানিয়ে আসলেও কোনো কাজ হচ্ছে না।’ অক্সিজেন আলপনা কমিউনিটি সেন্টারের বিপরীত পাশে সড়কের উপর দাঁড়ানো একটি অটোরিকশাচালক মো. রহিম বলেন, ‘আমার বাড়ি নোয়াখালী। অক্সিজেন থেকে হাটহাজারী, নাজিরহাট ও রাঙামাটি সড়কে ৫ বছর ধরে গাড়ি চালাচ্ছি। এতো চাঁদা আগে দেইনি। এখন প্রতিদিন অটোরিকশা প্রতি ২০ টাকা (রসিদ দিয়ে) এবং মাসে টোকেন বাবদ ৩৩০ টাকা দিতে হয়। শুনেছি এই টাকা ট্রাফিক পুলিশও পায়। নিয়মিত চাঁদা না দিলে ট্রাফিক পুলিশ রাস্তায় ধরে।’ জানা গেছে, শুধু অক্সিজেন মোড় থেকে উত্তরের দিকে গ্রামাঞ্চলের হাজারো অটোরিকশা চলাচল করে। এসব গাড়ি থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নিচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। অভিযোগ ওঠেছে এই টাকার ভাগ পায় দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই এলাকার একাধিক গাড়িচালক-শ্রমিক জানান, সার্জেন্ট নাজমুল গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ওই এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন। এ সময় তাঁর বেপরোয়া ‘চাঁদাবাজিতে’ অতিষ্ঠ যানবাহনের চালক-শ্রমিক। তাঁকে যানজট নিরসন করতে দেখা যায় না।প্রশ্নের জবাবে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) কুসুম দেওয়ান বলেন, ‘শুধু ট্রাফিক পুলিশের কারণে অক্সিজেন মোড়ে যানজট হচ্ছে না। সেখানে যানজটের অনেক কারণ রয়েছে।’এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সেখানে দায়িত্বরতরা যানজট নিরসন না করে পাশে দাঁড়িয়ে থাকাটা অন্যায়।’ তবে ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন এই কর্মকর্তা। সার্জেন্ট সুকেনের বিষয়ে জানতে চাইলে অক্সিজেন এলাকায় দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট নাজমুল ইসলাম শনিবার বিকেল ৫টায় বলেন, ‘আসলে ওর (সুকেন) ডিউটি এখানে (অক্সিজেন) ছিল না। আমার ব্যাচমেট তো। একটু আড্ডা দিতে আসছিল। আসলে এই সময় তার ওখানে চাপ কম থাকে তো তাই আমাকে সহযোগিতা করতে আসছিল।’ অক্সিজেন এলাকায় যানজট নিরসনে ট্রাফিক পুলিশকে কেন দেখা যায়নি-এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাফিক সার্জেন্ট নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘এই কথাটা ভুল। রাস্তায় যখন যানজট থাকে তখন আমরা গাড়ির কাগজপত্র দেখি না। আমার মূল কাজ হচ্ছে যানজট নিরসন করা।’ কিন্তু আপনারা রাস্তার মধ্যে গাড়ি আটকিয়ে দেখেছেন প্রমাণ আছে বললে তিনি বলেন, ‘ও আচ্ছা আপনি (প্রতিবেদক) মনে হয় ভিডিও করেছেন।’

