রাজধানীর খিলগাঁও’র নাসিরাবাদে আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের ভূমিদস্যুতা

0
670

লালিত সন্ত্রাসীদের দিয়ে মানুষের বসতভিটা কৃষিজমি জবর দখলসহ জলাধারগুলোতে চলছে জোরপূর্বক বালু ভরাট
বিশেষ প্রতিনিধি: আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ আবাসন সেক্টরে দীর্ঘদিন ধরেই চালাচ্ছে প্রতারণার রামরাজত্ব। ঠকাচ্ছে মানুষ। ঠকছে মানুষ। তারপরও সরকারযন্ত্র রহস্যজনক নীরব ভূমিকায়। দিনে দিনে অর্থ-সম্পদের পাহাড় গড়ছে আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের মালিক পক্ষ। সাথে সাথে অনৈতিক আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে তাদের লালিত সন্ত্রাসীরা, মতলববাজ জনপ্রতিনিধিসহ এক শ্রেণির টাউট গোষ্ঠি আর সরকারী সংশ্লিষ্ট সংস্থাসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাসমুহের অসাধু কর্মকর্তারা। আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের ধারাবাহিক প্রতিবেদনে আজকে স্থান পেয়েছে রাজধানীর খিলগাঁও থানাধীন নাসিরাবাদে তাদের নারকীয় কর্মকান্ড।

Advertisement

 

রাজধানীর খিলগাঁও থানাধীন নাসিরাবাদে চলছে আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের চরম ভূমিদস্যুতা। এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী, ধান্দাবাজ জনপ্রতিনিধি ও দালাল শ্রেণির লোকজনদের সহযোগীতায় চলছে জবর দখল। জোরপূর্বক চলছে বালি ভরাট। রেহাই পাচ্ছে না কৃষিজমি, বসতবাড়ি প্রাকৃতিক জলাধার। উক্ত এলাকায় আমিন মোহাম্মদ অতি চাতুরতার আশ্রয়ে অবৈধ আবাসন প্রকল্প গড়ে তুলছে। যদিও প্রকল্পটির দায়িত্বে থাকা একজন পরিচালক বিষয়টি স্বিকার করেননি। তিনি স্পষ্টই প্রতিবেদককে বলেন, নাসিরাবাদে তাদের কোনো আবাসন প্রকল্প নেই। কোম্পানী উক্ত এলাকায় বেশকিছু জমি ক্রয় করেছে মাত্র। নিজস্ব মালিকানার জমিগুলো চিহ্নিত করতে কোম্পানীর নামে সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে বলে তিনি জানান।
এলাকাবাসীর অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, নাসিরাবাদে আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের জবর দখল চলছে বেশকিছু দিন ধরে। জোরপূর্বক মানুষের বসতভিটা, কৃষি জমি, জলাধার ও হালট বালি দিয়ে ভরাট করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্থরা আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের লালিত সন্ত্রাসী ও এলাকার চিহ্নিত প্রভাবশালীদের ভয়ে আইনের দ্বারস্থ হতে সাহসী হচ্ছেন না। তবে ক্ষতিগ্রস্থরা প্রতিবাদ করলে তাদেরকে প্রাণনাশের হুমকীও প্রদান করা হয়। এদিকে স্থানীয় থানা পুলিশকে অবহিত করেও ফল মিলছে না। প্রচারণা আছে, আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ প্রতিনিয়ত চুক্তিমাফিক মোটা অংকের টাকা গোপনে প্রদান করে থাকে। ফলে এলাকার ক্ষতিগ্রস্থরা পুলিশী সাহায্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অভিযোগ উঠেছে সরকারী দলের স্থানীয় প্রভাবশালীদের দিয়ে তাদেরকে হয়রাণী করার। এছাড়াও অগণিত মানুষকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে হয়রাণী করা হয়। আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের জবর দখল তথা ভূমিদস্যুতার বিষয়ে সরকারের দায়িত্বশীল সংস্থাসমুহকে অবহিত করলেও সংস্থাগুলো রহস্যজনকভাবে বরাবরই নির্বিকার থাকে। নাসিরাবাদ এলাকায় আতঙ্ক ছড়াতে এবং নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ পরিকল্পিতভাবে ইতোপূর্বে একটি হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটায়। কিন্তু পরিকল্পিত হত্যাকান্ডটি পুলিশকে দিয়ে অন্যখাতে প্রবাহিত করা হয়েছে।
তথ্যসূত্রে জানা গেছে, আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ নাসিরাবাদ এলাকায় মাত্র ১০-১২ বিঘা জমি ক্রয় করলেও রাতের আধারে বালিভরাট করে দখলে রেখেছে শত শত বিঘা। জানা যায়, জাল দলিল সৃজন করে দখলকৃত জমিগুলো নিজেদের বলে দাবী করছে। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, টার্গেটকৃত জমি দখল ও কম মূল্যে কিনতে আমিন মোহাম্মদ বিশাল ক্যাডার বাহিনী গড়ে তুলেছে। সূত্রমতে ওই ক্যাডার বাহিনীর সদস্য ৪শ’র অধিক। লালিত ক্যাডারদেরকে মাসিক বেতন দেওয়া হয়। দলপতিকে দেওয়া হয় বিশেষ সুবিধা। এই ক্যাডার বাহিনী অন্যের জমি জোরদখল করে বলে বিস্তর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, নাসিরাবাদের সিংহভাগ এবং ডেমরা থানার আংশিক বালুবিদ্যুৎপুর, উত্তর দূর্গাপুর, গৌরনগর মৌজায় জমির পরিমাণ ৩ হাজার একর। আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের লক্ষ্য উল্লেখিত পরিমাণ জমি সম্পূর্ণ আত্মসাতের। সেই লক্ষ্যেই পরিকল্পিতভাবে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ। সূত্রমতে মাত্র ১০-১২ বিঘা জমি কিনে কাল্পনিক লে-আউট তৈরী করে সাধারণ মানুষজনকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে প্লট বিক্রি করছে আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের নাসিরাবাদের প্রকল্পটির কোনো বৈধতা নেই। প্রকল্পটি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমদিত নয়, এমনকি নিবন্ধিতও নয়। আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অবৈধ ওই আবাসন প্রকল্পটিতে সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সাধারণ মানুষের ভিটেমাটি দখল করে ড্রেজার দিয়ে কথিত প্রকল্পটিতে বালি ভরাট করা হচ্ছে। রাতের আধারে ভিতিকর পরিস্থিতি তৈরী করে লালিত ক্যাডাররা অপরের জমি জবরদখল চালিয়ে যাচ্ছে।
আমিন মোহাপম্মদ গ্রুপের এই অনৈতিক কর্মকান্ডে এলাকাবাসী এক সময় ফুঁসে উঠে। আবাসন প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মানুষ একাট্টা হয়ে দূর্বার প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তারা বিশাল মানববন্ধন কর্মসূচী পালন করে। কিন্তু আমিন মোহাম্মদের লালিত সন্ত্রাসীদের ভয়ে এবং থানা পুলিশের অসহযোগীতার কারণে মানুষ পিছু হটে।
এদিকে একটি সূত্র জানায়, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আমিন মোহাম্মদের অর্থের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে। সূত্রে প্রকাশ, লালিত সন্ত্রাসী আর আমিন মোহাম্মদের কাছে বিক্রি হওয়া ব্যক্তিদের চাপে পড়ে কমমূল্যে জমি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন এলাকার অসহায় মানুষগুলো। কমমূল্যে জমি বিক্রি করেও তারা পাওনাকৃত টাকা পাচ্ছেন না বলে বেশকিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে। অপর একটি সূত্রে জানা গেছে, অসংখ্য মানুষের জমি অল্প টাকায় বায়না করে বছরে পর বছর ঘুরিয়েও তাদেরকে পাওনাকৃত টাকা দেওয়া হয় না। ভুক্তভোগীরা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ, থানা পুলিশ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সরকার দলীয় স্থানীয় নেতাদের কাছে যেয়েও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না।
একটি অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, এলাকার বন্ধন উন্নয়ন সমিতির ১৮ জনের ৬ বিঘা জমি জোর দখলের চেষ্টা চলছে। আবাসন প্রতিষ্ঠানটির লালিত চার’শ সদস্যের সন্ত্রাসী বাহিনী উক্ত জমিটি জোর দখলের অপচেষ্টা চালালে তারা প্রতিহত করে। সন্ত্রাসী দিয়ে সমিতির নির্মিত সীমানা প্রাচীর ভেঙ্গে ফেলে আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ। এ সংক্রান্তে থানায় সাধারণ ডায়েরী করা হলেও পুলিশ ক্ষতিগ্রস্থদের পক্ষে না যেয়ে আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের পক্ষে অবস্থান নেয়।
আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের এহেন ভুমিদস্যুতার হাত থেকে রক্ষা পেতে এলাকার মানুষ স্থানীয় সংসদ সদস্য সাবের চৌধুরীর দারস্থ হন। তাদের দাবীর প্রেক্ষিতে একটি পুলিশ ফাঁড়ী স্থাপিত হলেও পুলিশ জনগণের পক্ষে কাজ করছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। জমি দখলের খবর দিলেও পুলিশ বিষয়টি এড়িয়ে যায়।
অপর একটি অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, এলাকার মানুষের বিদ্যুৎ সংযোগেও আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ বাঁধা সৃষ্টি করে। তাদের লালিত সন্ত্রাসীরা বৈদ্যুতিক খুঁটি অন্যত্র ফেলে দেয়।
স্থানীয় আব্দুস সবুর ২০১৫ সালে সংশ্লিষ্ট থানায় সাধারণ ডায়েরী করেন। তার ৬৯০, ৬৬৬, ৬৬৭, ৬৬৮, ৬৬৯, ৬৭২, ৮৪৪ ও ৮৪৩ দাগের জমি জোর দখল করে আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির লালিত সন্ত্রাসীরা উক্ত ব্যক্তিকে জীবননাশের হুমকী প্রদান করে এবং তার বাড়িঘর ভাঙ্গচুর করে। উক্ত নিমিত্তে থানায় মামলা করতে গেলে তার মামলা নেওয়া হয়নি। একটি সাধারণ ডয়েরী নিয়ে তাকে শান্তনা দেওয়া হয়। এদিকে বালুবিদ্যুৎ, উত্তর দূর্গাপুর এবং গৌরনগর ভূমি রক্ষা কমিটি নামের একটি সংগঠন গড়ে ওঠে আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের ভূমিদস্যুতার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। উক্ত সংগঠনটি আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের বিরুদ্ধে রাজউকে অভিযোগ করে। তবে রাজউক থেকে তেমন কোনো সাঁড়া মেলেনি বলে জানা যায়। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, বালুবিদ্যুৎপুর মৌজায় উত্তর মাদারটেকের বাসিন্দা মুনসুর আলী আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের ভূমিদস্যুতার শিকার হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। তার ৩৬ শতাংশ জমি জোরদখলের অপচেষ্টা চালাচ্ছে তাদের লালিত সন্ত্রাসীরা। তার জমিতে জোরপূর্বক বালি ভরাট করতে গেলে তিনি তা প্রতিহত করেন। তিনি পূণঃরায় জোরদখলের আশঙ্কা করছেন বলে প্রতিবেদককে জানান। আগামীতে আরো কিছু রোমহর্ষক ঘটনা নিয়ে থাকবে আরো একটি প্রতিবেদন।

Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here