সরকারের অনুমতি ছাড়াই রাজধানীতে চালু থাকা ‘সিটিং সার্ভিস’, ‘গেটলক’, ‘বিরতিহীন’ ইত্যাদি বিশেষ নামের বাসসেবা আজ রবিবার থেকে বন্ধ করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এসব নামের বাসসেবা বন্ধ রাখতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সপ্তাহে তিন দিন অভিযান চালাবে। ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতি গত ৪ এপ্রিল হঠাৎ করে ডাকা এক সভায় সিটিং সার্ভিসসহ বিশেষ নামের সেবা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত জানায়। এর সঙ্গে একমত পোষণ করে বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ তাতে সহযোগিতা করতে রাজি হয়েছে গতকাল শনিবার।তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন সংস্থা ও যাত্রীদের মতামত নিয়ে এ সিদ্ধান্ত নিলে তাতে উপযুক্ত করণীয় বেরিয়ে আসত। যাত্রীদের অনেকে মনে করেন, বিশ্বের বিভিন্ন নগরীর মতো সিটিং সার্ভিস সীমিত আকারে রাখা সম্ভব। তবে তাতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধ করতে কঠোর নজরদারি রাখা দরকার।রাজধানীর প্রায় পৌনে দেড় কোটি বাসিন্দার সঙ্গে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার নতুন মুখ যোগ হচ্ছে বাইরের জেলা থেকে। যাত্রীদের পরিবহনের জন্য নগরীতে বাস আছে সাড়ে চার হাজার। তার অর্ধেকের গায়ে সিটিং সার্ভিসসহ অন্যান্য সেবার নামে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। অফিস চলাকালে গেট বন্ধ করে চলাচল করায় বাড়তি ভাড়া দিয়েও ওই সব বাসে চলাচলের সুবিধা নিতে পারে না যাত্রীরা। যাত্রীদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে এক-দুই কিলোমিটার চড়লেও যে ভাড়া দিতে হয় ১০-১২ কিলোমিটার দূরের গন্তব্যে পৌঁছাতেও একই ভাড়া আদায় করা হয়। যদিও পথে আসন খালি হলে বিভিন্ন স্টপেজে বাস থামিয়ে নতুন যাত্রী তোলা হয়।একাধিক যাত্রী জানায়, আজিমপুর থেকে ফার্মগেট হয়ে গাজীপুরগামী একটি সার্ভিসে ফার্মগেট থেকে উত্তরা পর্যন্ত ভাড়া নেওয়া হয় ৫০ টাকা। পথে কাকলীতেও এর স্টপেজ ও কাউন্টার আছে। কোনো যাত্রী ফার্মগেট থেকে কাকলী পর্যন্ত যেতে চাইলেও ৫০ টাকা দিয়ে টিকিট কিনতে হয়। কাকলীতে ওই যাত্রী নেমে যাওয়ার পর একই আসনে সেখান থেকে নতুন যাত্রী নেওয়া হয় আরো ৫০ টাকার বিনিময়ে। এভাবে একটি আসনে ফার্মগেট থেকে উত্তরা পর্যন্ত দুজন যাত্রীর কাছ থেকে দুই দফায় মোট ১০০ টাকা ভাড়া আদায় করা হয়। তবে বেশি ভাড়া দিয়েও নির্দিষ্টসংখ্যক যাত্রী বাসে যাতায়াতের সুযোগ পাচ্ছে। এ অবস্থায় আজ থেকে সিটিং সার্ভিসসহ বিভিন্ন বিশেষ নামের সেবা বন্ধ করতে তত্পরতা চালানো হবে বলে জানা গেছে।ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির অধীনে প্রায় দেড় শ বাস কম্পানি রয়েছে। সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্ল্যাহ বলেন, ‘রাস্তায় বাসের নৈরাজ্যরোধে এ উদ্যোগ আমরা নিয়েছি। সিদ্ধান্ত অমান্য করা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’এদিকে গতকাল বিকেলে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিআরটিএ কার্যালয়ে পরিবহন মালিক সমিতির নেতা, বাস মালিক ও বিআরটিএ কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, আজ থেকে বাস-মিনিবাসসহ সব রকমের গণপরিবহনে কিলোমিটার প্রতি সরকারের নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত আদায় করা যাবে না। কেউ তা অমান্য করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ জন্য নতুন করে সব পরিবহনে সুস্পষ্ট ভাড়ার তালিকা রাখারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে বাসের ভাড়া সর্বনিম্ন সাত টাকা এবং মিনিবাসে সর্বনিম্ন পাঁচ টাকা রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আর পুরো ভাড়া নিতে হবে কিলোমিটার হিসাব করে আগের নির্ধারিত হারে।বিআরটিএর চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান সাংবাদিকদের জানান, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে মাঠে থাকবে বিআরটিএ, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও শ্রমিক-মালিক নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত নজরদারির বিশেষ দল। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। আইন না মানলে বা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পরিবহন মালিকরা কোনো কর্মসূচি নিতে চাইলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংরক্ষিত নারী আসন নিয়ে জারি করা নির্দেশনা বাস্তবায়ন পরিস্থিতিও তদারক করা হবে। মশিয়ার রহমান আরো জানান, ‘সিটিং সার্ভিস’ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করতে আজ রাজধানীর আসাদ গেট, আগারগাঁও (আইডিবি ভবন), এয়ারপোর্টের পশ্চিম পাশ, ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউশনের সামনে, যাত্রাবাড়ীর চ্যাংপাই রেস্টুরেন্টের সামনে ভ্রাম্যমাণ আদালত নিয়ে থাকবে ভিজিল্যান্স টিম। সপ্তাহে তিন দিন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।রাজধানীতে যাত্রী হয়রানি ও ভাড়া-নৈরাজ্য ঠেকাতে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি সিটিং সার্ভিস, স্পেশাল সার্ভিস, গেটলক সার্ভিসের নামে গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং পিক আওয়ারে দরজা আটকে বাস চলাচল বন্ধ করার মতো ‘যাত্রীবান্ধব’ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করতে যাত্রী সাধারণের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। গতকাল সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘যুগান্তকারী’ এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে যাত্রীদের দীর্ঘদিনের এই দুর্দশা, হয়রানি ও ভাড়া-নৈরাজ্য লাঘব হবে। যাত্রী সেবার মান বাড়বে, মাঝপথের যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকার বিড়ম্বনার অবসান হবে।
