মনোনয়ন নিয়ে মাতামাতি আওয়ামী লীগ ও জাপায়

0
592

জাতীয় সংসদের ২০ নম্বর নির্বাচনী এলাকা রংপুরের বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জ উপজেলা। এটি রংপুর-২ আসন।

Advertisement

আগামী নির্বাচনে এ আসনে মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল জাতীয় পার্টিতেই বেশি মাতামাতি। এরই মধ্যে শুরু হয়েছে দুই দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ। অন্যদিকে সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি এবং নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন হারানো জামায়াতের তত্পরতা চোখে পড়ার মতো নয়।ভোটারদের দৃষ্টি কাড়তে রংপুর-২ আসনের অনেক প্রার্থী নিজেদের বড় বড় ছবি প্রদর্শন করে পোস্টার, বিলবোর্ড লাগিয়েছেন রাস্তার মোড়ে মোড়ে। আবার কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও রয়েছেন সরব। বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীর নামে ইতিমধ্যে খোলা হয়েছে ফেসবুক আইডি। মনোনয়নপ্রত্যাশীদের ছবি দিয়ে ফেসবুকে ভোটারদের কাছে জানতে চাওয়া হচ্ছে কার কেমন জনপ্রিয়তা।

জানা যায়, স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে রংপুর-২ (বদরগঞ্জ-তারাগঞ্জ) আসনটি দখলে ছিল আওয়ামী লীগের। এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা আনিছুল হক চৌধুরী পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৯৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অবশ্য এর আগে ১৯৯১ সালে এ আসনে নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। পরে এরশাদ আসনটি ছেড়ে দিলে উপনির্বাচনে জয়লাভ করেন দলের নেতা পরিতোষ চক্রবর্তী। এর পরের সংসদেও নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির প্রার্থী। সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে এ আসন থেকে নির্বাচিত হন বদরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল কালাম মো. আহসানুল হক চৌধুরী ডিউক ওরফে ডিউক চৌধুরী। ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী ছিলেন তাঁরই চাচা আসাদুজ্জামান চৌধুরী সাবলু। যদিও রাজনৈতিক টানাপড়েনের কারণে দলীয় চেয়ারম্যানের নির্দেশে তিনি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন। ফলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী ডিউক চৌধুরী।

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চান যাঁরা : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বদরগঞ্জ-তারাগঞ্জ আসনে আওয়ামী লীগের একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশীর নাম শোনা যাচ্ছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য আবুল কালাম মো. আহসানুল হক চৌধুরী ডিউক। মনোনয়ন পাওয়ার আশায় দিন-রাত এক করে মাঠে আছেন সাবেক যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী আনিছুল হক চৌধুরীর ছেলে বর্তমান সংসদ সদস্যের চাচাতো ভাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আহসানুল হক চৌধুরী টুটুল। তিনি  বদরগঞ্জ উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও। বদরগঞ্জ পৌরসভার চারবারের নির্বাচিত মেয়র উত্তম সাহা মনে করছেন আওয়ামী লীগের মাঠ জরিপে তিনি এগিয়ে আছেন। আশায় বুক বেঁধে কেন্দ্রের দিকে চেয়ে আছেন বদরগঞ্জ সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ কৃষক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক কৃষিবিদ বিশ্বনাথ সরকার বিটু। তাঁর মতো মনোনয়নপ্রত্যাশী আরেকজন হলেন কৃষি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য ড. এম শাহ নওয়াজ আলী। তাঁর পৈতৃকভিটা দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার হরিরামপুর ইউনিয়নের খাগড়াবন্দ এলাকায়। অবশ্য তিনি রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলা সদরের বাড়িতেই বড় হয়েছেন। সে কারণে তিনি রংপুর-২ আসন থেকে প্রার্থিতা প্রত্যাশা করছেন।

ড. শাহ নওয়াজ আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পেশাগত কারণে জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখন ইউজিসির সদস্য হিসেবে ঢাকায় অবস্থান করছি। বদরগঞ্জ-তারাগঞ্জের মানুষের পাশে থাকতে পারলে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করতাম। ’ আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চাইবেন বলেন জানান তিনি।

স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল কিছুটা প্রকট আকার ধারণ করেছে। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে কথা-বলাবলিও বন্ধ। দুই ভাইয়ের দ্বন্দ্ব মেটাতে কয়েক দফায় পারিবারিক ও দলীয়ভাবে বৈঠক হলেও কোনো ফল হয়নি। উল্টো দিনকে দিন দলের অবস্থা নাজুক পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে বলে মনে করেন উপজেলা কমিটির সাধারণ সদস্যরা।

তবে বিভেদ ভুলে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মন কাড়তে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন সংসদ সদস্য ডিউক চৌধুরী। এলাকার দৃশ্যমান কিছু উন্নয়ন হয়েছে, যার কৃতিত্ব তাঁর। এ ছাড়া তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের মন জয় করতে পেরেছেন তিনি। সাম্প্রতিক সময়ের বন্যায় তিনি এলাকার দুর্গত মানুষের পাশে ছিলেন। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো ঘুরে দিয়েছেন ত্রাণসামগ্রী।

সংসদ সদস্য ডিউক চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার আশীর্বাদে আগামী দিনে মনোনয়ন পেলে দুই উপজেলার আমূল পরিবর্তন করব। কারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা বিদ্বেষ নেই আমার। সবাইকে একজোট করে উন্নয়নসহ দলের নেতাকর্মীদের সুসংগঠিত করার চেষ্টা করছি। দলে রাজনৈতিক কোনো বিভেদ বা কোন্দল দেখি না। তবে পারিবারিক কারণে ছোট ভাই টুটুলের সঙ্গে ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু তাতে দলের ওপর প্রভাব পড়বে না। ’ তিনি আরো বলেন, ‘আগামী দিনে দলের মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচিত হলে মাদক, সন্ত্রাস ও জামায়াতমুক্ত বদরগঞ্জ-তারাগঞ্জ গড়ে তুলব। ’

আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী আহসানুল হক চৌধুরী টুটুল বলেন, ‘বর্তমান এমপির বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমে আছে। এমপি থাকাকালে তিনি দল গোছাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বাণিজ্য করার পাশাপাশি বিএনপি-জামায়াতের লোকজনকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছেন তিনি। তাঁর জন্য তৃণমূলে গ্রুপিং হয়ে দলের অবস্থা নাজুক। ভোট শুরু হলে বুঝতে পারবেন ডিউক চৌধুরীর অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। ’ তিনি আরো বলেন, মনোনয়ন পেলে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার আদর্শ লালন করে তিনি তাঁর বাবা আনিছুল হক চৌধুরীর অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করবেন।

আওয়ামী লীগের আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী বিশ্বনাথ সরকার বিটু বলেন, ‘সাম্প্রতিককালের ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে বুঝেছি তারা আমাকে কী পরিমাণ ভালোবাসে। তাদের অকুণ্ঠ ভালোবাসায় আমি রাজনীতিতে এতদূর আসতে পেরেছি। দল থেকে কে মনোনয়ন পাবে তা শুধু প্রধানমন্ত্রী বলতে পারবেন। তবে সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে আমাকে মনোনয়ন দেওয়া হলে বিরোধ মিটিয়ে দলের কর্মকাণ্ড চাঙ্গা করে তুলব। ’ তবে দল থেকে যাঁকেই মনোনয়ন দেওয়া হবে তাঁর পক্ষেই থাকবেন বলে তিনি জানান।

জাতীয় পার্টির মনোনয়নপ্রত্যাশীরা : এ আসনে জাতীয় পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকাও লম্বা। যাঁরা আলোচনায় আছেন তাঁরা হলেন বদরগঞ্জ উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের বকশীগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি আসাদুজ্জামান চৌধুরী সাবলু।

চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি দলের চেয়ারম্যান এরশাদ আকস্মিক বদরগঞ্জ সফরে এসে সাবলু চৌধুরীর বাসভবনে যান। এ সময় তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে সাবলু চৌধুরীর নাম ঘোষণা করেন। সে হিসেবে মাঠ গুছিয়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের নিয়ে গ্রামে-গঞ্জে ছুটে বেড়াচ্ছেন তিনি। দিয়েছেন বন্যাদুর্গত মানুষকে ত্রাণসামগ্রী।

সাবলু চৌধুরী বলেন, ‘দলের চেয়ারম্যানের নির্দেশে আমি তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সংগঠিত করে নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রচার চালাচ্ছি। ইতিমধ্যেই এরশাদ দলের প্রার্থী হিসেবে আমার নাম ঘোষণা করেছেন। ’

দলের আরেক শক্তিশালী মনোনয়নপ্রত্যাশী হলেন দলের সাবেক সংসদ সদস্য আনিছুল ইসলাম মণ্ডল। আমেরিকা থেকে এসে তিনি ২০০৮ সালে দলের প্রার্থী হিসেবে মহাজোট থেকে নির্বাচন করে সংসদ সদস্য হন। তিনি দাবি করেন, বিগত দিনে দলের হয়ে এলাকার ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন তিনি। এবারও জাতীয় পার্টি থেকে তিনিই মনোনয়ন পাবেন— এমনটাই প্রত্যাশ করছেন আনিছুল ইসলাম মণ্ডল। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এবার নিশ্চিত জাতীয় সংসদের নির্বাচন করব ইনশা আল্লাহ। ’

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ-রব) ত্যাগী আরেক নেতা মোকাম্মেল চৌধুরী মনোনয়ন পাওয়ার আশায় এরশাদের মুখের দিকে চেয়ে আছেন। তাঁর জোর প্রত্যাশা, এরশাদের জন্য তিনি মিটিং-মিছিল করাসহ পার্টির বিভিন্ন দুর্যোগে মাঠে ছিলেন। গত ২০ ফেব্রুয়ারি এরশাদের সব মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে বদরগঞ্জে বিশাল ‘গণমিছিল’ করে দলের দৃষ্টি কাড়ার চেষ্টা করেন তিনি।

২০১০ সালে বদরগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করে পরাজিত হন মোকাম্মেল হক চৌধুরী। তবে তিনি বলেন, ‘যোগ্যতার বলে আমি এখানে মনোনয়ন চাইব। পল্লীবন্ধু এরশাদ যদি মূল্যায়ন করে আমাকে মনোনয়ন দেন তাহলে বিপুল ভোটের ব্যবধানে এমপি নির্বাচিত হব। ’

বিএনপি-জামায়াতের মনোনয়ন চান যাঁরা : বিএনপি-জামায়াত জোটগত নির্বাচন হলে এ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন জাতীয় পার্টি থেকে আসা সাবেক সংসদ সদস্য পরিতোষ চক্রবর্তী। জাতীয় পার্টির ত্যাগী আরেক সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী সরকারও মনোনয়ন চাইতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে। তরুণ আইনজীবী গোলাম রসুল বকুলের প্রার্থী হওয়া নিয়েও বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে চলছে গুঞ্জন। সম্প্রতি বকুল রঙিন পোস্টার ছাপিয়ে বিলি করেছেন বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জ এলাকায়। এর আগে এ আসনে বিএনপি-জামায়াত জোটের প্রার্থী ছিলেন মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ফাঁসির দণ্ডাদেশ হওয়া জামায়াত নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলাম।

বদরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি পরিতোষ চক্রবর্তী মনে করছেন, আওয়ামী লীগের নানা দুর্নাম ও স্থানীয় নেতাদের পারিবারিক বিরোধের কারণে বিএনপিকেই ভোট দেবে মানুষ। এখন শুধু অপেক্ষার পালা। তা ছাড়া তিনি মনে করছেন, সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় তাঁর সঙ্গে আছেন।

বিএনপি থেকে মনোনয়ন পাওয়ার জন্য কেন্দ্রে জোর তদবির চালাচ্ছেন তরুণ নেতা গোলাম রসুল বকুল। তিনি বলেন, ‘অতীতে যাঁরা মনোনয়ন নিয়ে প্রার্থী ছিলেন তাঁরা আশানুরূপ কোনো ফল এনে দিতে পারেনি বিএনপিকে। বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। নেতৃত্বের গুণাবলি লেশমাত্র তাঁদের মধ্যে ছিল না। তাই বিএনপির শূন্যস্থান পূরণ করতে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন বলে নিশ্চিত করেন তিনি।

Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here