হাসান আলী চাঁপাইনবাবগঞ্জ: জেলা শহরের সদ্য সরকারিকৃত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মোঃ এজাবুল হক এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম, অশ্লীলতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে শিক্ষকদের হুমকী দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সরকারি কলেজের ইসলামের ইতিহাস বিষয়ের প্রভাষক সৈয়দা রেহানা আশরাফী কর্তৃক জেলা প্রশাসক বরাবর এ সংক্রান্ত একটি অভিযোগ দেয়া হয়েছে। অভিযোগে তিনি বলেছেন, ‘অধ্যক্ষ মোঃ এজাবুল হক তার ছবি তুলে তা ভাইরাল করার হুমকী দেয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশাসনিক ও মানসিক হয়রানি করে আসছেন। অধ্যক্ষ মোঃ এজাবুল হক কর্তৃক ইভটিজিং, র্যাগিং, কলেজ চত্বরের বাইরে আমাকে দেখে নেয়ার হুমকী, আমাকে পেশাগত ক্ষতি করার নিমিত্তে একের পর এক কারণ দর্শানো নোটিশ দেবার ঘোষণা দিয়ে আমাকে মানসিক এবং শারীরিক ভাবে অসুস্থ করে তুলেছেন। ইতোপূর্বে ইংরেজি বিষয়ের প্রভাষক রোকেয়া খাতুন এর জেলা প্রশাসক বরাবর দেয়া একটি আবেদনের তদন্ত (তদন্ত প্রতিবেদন জমা হলেও প্রকাশ হয়নি) হওয়ার পর থেকে আমাকে হয়রানি এবং অসদাচারণ করে তিনি প্রায়ই মানসিকভাবে নির্যাতন করে আসছেন।
অতি সম্প্রতি অর্থনীতি এবং বাংলা বিষয়ের শিক্ষক তাদের ব্যক্তিগত ইস্যু নিয়ে জেলা প্রশাসকের শরণাপন্ন হওয়ার পর জেলা প্রশাসক এর অপর একটি তদন্তের পর অধ্যক্ষ আরো ক্ষিপ্ত হয়ে আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকার ষঢ়যন্ত্রমূলক মিথ্যে পদক্ষেপ নিয়েই চলেছেন।
গত ১৯/১০/২০২৩ তারিখ জীব বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষকের প্রতি অধ্যক্ষের অফিস কক্ষে অধ্যক্ষ মারমুখী ও হুমকীমূলক আচরণ করেন। যে কোন তুচ্ছ বিষয় নিয়ে অধ্যক্ষ কলেজে বাধ্যতামূলক রুদ্ধদ্বার মিটিং, সাদা কাগজে স্বাক্ষরসহ আমাকে র্যাগিং এবং প্রশাসনিক হয়রানি করে থাকেন।’ তিনি আরো বলেন, ‘নারীর উপর সহিংসতা ও হয়রানির বিরুদ্ধে রাষ্ট্র জিরো ট্রলারেন্স নীতি গ্রহণ করার পরও অধ্যক্ষ নারী শিক্ষকের প্রতি অসদাচরণ করে আসছেন।
আর অধ্যক্ষ প্রায়ই বলে থাকেন যে,-‘রাষ্ট্রের এবং প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের সাথে আমার যে ঘনিষ্ঠতা, তাতে কেউ আমার কিছু করতে পারবেনা এবং আমি আপনাদের মোবাইল ট্র্যাক করি।’ তার এমন দম্ভ, অনিয়ম, ষড়যন্ত্রের শিকার হওয়ায় উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আবেদন করতে বাধ্য হয়ে পড়েছি।’ সৈয়দা রেহেনা আশরাফী কর্তৃক জেলা প্রশাসক বরাবর অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে করা অভিযোগের সাথে জমা দেয়া কপিগুলোতে তার ছবি তুলে ভাইরাল করার হুমকী প্রদান, চাকরী স্থায়ীকরণে প্রতিবন্ধকতার হুমকী, ছুটির আবেদন মঞ্জুর না করে অনুপস্থিতির সীল দেয়া এবং বিধি বহির্ভূতভাবে তিন দিনের বেতন কর্তন ও জমা না দেয়া পর্যন্ত বেতন ফরোয়ার্ড না করার হুমকী প্রদান, একের পর এক কারণ দর্শানো নোটিশ দিয়ে তাকে পর্যুদস্ত করা এবং পেশাগত ক্ষতি সাধনের হুমকী, বিগত কয়েক মাস সময়মত বেতন ফরোয়ার্ড না করা,
গত ১৪/০৯/২০২৩ খ্রীঃ তারিখ কলেজে উপস্থিত হওয়ার পরও অনুপস্থিত সীল দেয়া, শিক্ষক হয়রানি ও চাঁদাবাজি করার অংশ হিসেবে ৩টি হাজিরা খাতা ব্যবহার করা, হাজিরা খাতায় ব্যক্তি বিশেষে প্রশ্নবোধক (?) চিহৃ দেয়া ইত্যাদি অভিযোগ করেছেন। এদিকে এ বিষয়ে তথ্য পাওয়ার পর বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সরকারি কলেজ এর সার্বিক বিষয়ে সরজমিন তদন্তে গেলে বেরিয়ে আসে আরো অনেক অনিয়ম এর তথ্য। এ সবের মধ্যে রয়েছে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে চার্জশীটভুক্ত ফৌজদারী মামলা থাকলেও তিনি মামলা নাই মর্মে মাউশিতে তথ্য দিয়েছেন। অথচ তার নামে নবাবগঞ্জ সদর থানার মামলা নং-২২, তারিখ-১৩/০৬/২০০৭, ধারা-৩৮৫/৩৮৬/৩৮৭, জিআর নং-২৩১/২০০৭ (ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট), সেশন মামলা নং-১৮১/২০০৭, নবাবগঞ্জ থানার চার্জশীট দাখিলের তারিখ-১১/০৮/২০০৭, চার্জশীট অভিযোগপত্র নং-২৬৫।
হাইকোর্টে রীট করা আছে যার পিটিশন নং-৭৪২৫/২০০৭। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে আরো বেশ কিছু মামলা রয়েছে বলে বিশেষ সূত্রে জানা গেছে। বন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের আইন অম্যান্য করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি বা টেন্ডার ছাড়া অধ্যক্ষ সম্প্রতি কলেজ এর কয়েকটি বড় বড় গাছ অবৈধভাবে কেটে বিক্রি করেছেন। কলেজে ক্লাস রুম সংকট থাকা স্বত্তে¡ও অধ্যক্ষ একাডেমিক ভবনের তৃতীয় তলার ৩০৩ নং রুমকে আবাসিক হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন।
এমনকি এ রুমে অবস্থান করেও তিনি অফিস সময়ে রুম থেকে না নেমে ক্লাস চলাকালীন সময়ে রুম থেকে বের হন যা প্রতিষ্ঠান পরিপন্থি ও দৃষ্টিকটু বলে কলেজের ছাত্রছাত্রীরা জানিয়েছেন। কলেজ প্রান্তরে অবস্থিত আম বাগানে প্রতি বছর পর্যাপ্ত পরিমাণ আম ধরলেও তিনি তা বিক্রির অর্থ কলেজের হিসাব-নিকাশ এর সাথে সমন্বয় করেননা। সহকারী লাইব্রেরীয়ান থাকা সত্তে¡ও তার জন্য নির্ধারিত বিশেষ রুমে অধ্যক্ষ তালা দিয়ে রেখেছেন। এছাড়া কলেজ লাইব্রেরীতে বই এর কোন ব্যবস্থা রাখার দিকে অধ্যক্ষের কোন ভ্রæক্ষেপ নেই। এতে করে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের লেখা পড়ার মান ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। প্র্যাকটিক্যাল ল্যাবের জন্য কোন উপরকরণ নেই।
ফলে সারা বছর প্রদর্শকরা কোন প্রকার প্রাকটিক্যাল না করিয়ে বেশ আরাম আয়েশে চাকরী করে আসছেন। তিনি বিশেষ বিশেষ সময়ে চাঁদাবাজি করার কৌশল হিসেবে অবৈধভাবেই শিক্ষকদের মূল যোগদান পত্র, আর্টিকেল ৪৭ সহ বিভিন্ন কাগজ-পত্র আটকিয়ে রেখেছেন বলেও কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করেছেন। কলেজ সরকারিকরণ হওয়ার পর অধ্যক্ষ নিজের হাতে ডিডিও ক্ষমতা থাকায় প্রায় ১২ মাসের বেতন ইএফটি এর মাধ্যমে গত ফেব্রæয়ারী ২০২৩ মাসে উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেন।
কারণ এর আগে এই ১২ মাসের বেতন তিনিসহ কলেজের সকল শিক্ষক-কর্মচারী এমপিও এর মাধ্যমে উত্তোলন করেন। আর জেলা হিসাব রক্ষণ অফিসার বিষয়টি বুঝতে পেরে তাকে গত ১৬/০৮/২০২৩ তারিখ এ টাকা ফেরত দানের জন্য লিখিতভাবে চিঠি দিয়েছিলেন। তিনি জানতেন যে, এ বেতন তার প্রাপ্য নয়, তারপরও তিনি আবারও ১২ মাসের বেতন তুলে আত্মসাৎ করার চেষ্টা করেছিলেন বলে জেলা হিসাব রক্ষণ অফিস সূত্র বলেছে। অধ্যক্ষ নিয়মিত কলেজে উপস্থিত ছিলেন।

