এজন্য মিথ্যা প্রপাগান্ডা চালিয়ে এখন বলা হচ্ছে, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রভাবে মানুষ মারা যাবে। বিকলাঙ্গ ও কম ওজন নিয়ে জন্ম নেবে নবজাতক। অথচ চীন, ভারত ও জার্মানিসহ বহু দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ছড়াছড়ি। সুন্দরবনের মতো বন নয় একেবারে শহরের মধ্যে আবাসিক এলাকায় গড়ে উঠছে আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির অত্যাধুনিক কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। যেখানে একেবারে সন্নিকটে রয়েছে ২০-২৫ তলা বহুতল আবাসিক ভবন। ফুলের বাগান ও গ্রিন জোন। কিন্তু সেখানে তো কোনো প্রতিক্রিয়া হচ্ছে না। কারণ হওয়ার কিছু নেই। প্রক্রিয়াজাত করে যে সাদা ধোঁয়া বের হচ্ছে তা কোনোভাবে পরিবেশকে দূষণ করে না। এটি পরীক্ষিত। বাংলাদেশেও রামপালসহ যেসব স্থানে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে সেখানেও আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। প্রশ্ন হল, তাহলে এখানে সমস্যা হবে কেন?
পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন, এখানেই ষড়যন্ত্রের স্পষ্ট গন্ধ পাওয়া যায়। কারণ বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো যাতে আলোর মুখ দেখতে না পারে চক্রটি সে চেষ্টাই করে যাচ্ছে। এজন্য আন্তর্জাতিক লবিস্টের মাধ্যমে মিথ্য তথ্য দিয়ে বিদেশি বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে এসব কাজে সফলতার মুখও দেখেছে সিন্ডিকেট। সুন্দরবনের কাছে রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পরিবেশগত ক্ষতি হবে উল্লেখ করে নির্মাতা কোম্পানি ভারতের হেভি ইলেকট্রিক্যালস লিমিটেড (বিএইচইএল) থেকে বিনিয়োগ তুলে নিয়েছে নরওয়ের ওয়েলথ ফান্ড।
নরওয়ের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিবৃতি দিয়ে গভর্নমেন্ট পেনশন ফান্ড গ্লোবাল (জিপিএফজি) নামে বিশ্বের বৃহত্তম তহবিলটির বিনিয়োগের তালিকা থেকে ভারতীয় কোম্পানিটিকে বাদ দেয়ার কথা জানায়। কোনো কোনো মিডিয়া এটি ফলাও করে প্রচার করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে বিরোধিতার নামে কথিত আন্দোলন প্রকারান্তরে দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এভাবে চলতে থাকলে কেউই দেশের শিল্প উন্নয়নে বিনিয়োগ করবে না। তারা বলেন, চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ যাতে সফল হতে না পারে তারা সে চেষ্টাও করেছে। যদিও তাদের সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। আশার কথা, সেটি এখন নির্মিত হচ্ছে। সুন্দরবনের পাশে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে তো ষড়যন্ত্রের শেষ নেই। শুরু থেকে একটি গ্রুপ রীতিমতো আদাজল খেয়ে মাঠে নামে। পদে পদে মিথ্যা প্রচার-প্রচারণা যাদের নিত্যসঙ্গী। এখনও অব্যাহত আছে। তবে ভেতরের গোমর ফাঁস হয়ে পড়ায় দেশের সচেতন মানুষ এখন তাদের প্রত্যাখ্যান করতে শুরু করেছে।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ এ বিষয়ে বলেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের বিরোধিতা মানে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করা। তিনি বলেন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মিত হলে পরিবেশসহ জনগণের আদৌ কোনো ক্ষতি হবে কিনা সে বিষয়টি সরকার অবশ্যই গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিয়েছে। সব ধরনের প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সরকার নিশ্চিত হয়েছে এতে পরিবেশ ও জনসাধারণের কোনো ক্ষতি হবে না। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সরকার প্রতিটি বিষয়ে এভাবেই প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। নসরুল হামিদ বলেন, সরকার বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন করে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর। এজন্য কোনো বাধায় শেষ পর্যন্ত সফল হবে না।
প্রসঙ্গত, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বাড়ছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদা। সরকার ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সর্বশেষ পরিকল্পনা অনুযায়ী সময়ভিত্তিক চাহিদা নিরূপণ করে ২০২১ সালের মধ্যে ২৪ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের উদ্দেশ্য হল- ২০২১ সালের মধ্যে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত করা। এজন্য বিশাল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদা মেটাতে সরকার মিশ্র জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে, যার অন্যতম হচ্ছে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র।
জানা গেছে, ২০০৭ সালে ৯০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে। এখন তো সে চিত্র পাল্টেছে। দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গ্যাসের ব্যবহার। আবাসিক থেকে শুরু করে শিল্প, বাণিজ্য, সার, বিদ্যুৎ উৎপাদন সব ক্ষেত্রে গ্যাসের ব্যবহার। সঙ্গত কারণে চাহিদা বাড়ছে। আর ফুরিয়ে যাচ্ছে গ্যাসের মজুদ। এ অবস্থায় অবশ্যই কয়লা ছাড়া বিকল্প উপায় নেই। তাই অন্যান্য দেশের পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী কয়লাকে প্রধান জ্বালানি হিসেবে বিদু্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করেছে সরকার।
সরকারের ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, যতই ষড়যন্ত্র হোক বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘোষিত রূপকল্প বাস্তবায়নে পিছু হটবে না সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী এবং বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ এই রূপকল্প বাস্তবায়নে একেবারে বদ্ধপরিকর। প্রধানমন্ত্রী এর আগে বলেছিলেন, ‘রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে বিভিন্ন সংগঠনের আন্দোলনের পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে। বাস্তবতা হল, এ বিদ্যুৎ কেন্দ্র সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি করবে না। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে সুন্দরবনের দূরত্ব ১৪ কিলোমিটার। আর হ্যারিটেজ অংশের দূরত্ব ৬০-৭০ কিলোমিটার। ফলে সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা নেই। বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণকারী কোম্পানি থেকে বছরে সিএসআর ফান্ডে ৩০ কোটি টাকা জমা হবে। সেই টাকা সেখানকার দরিদ্র মানুষের জীবনমান ও পরিবেশ উন্নয়নে ব্যয় করা হবে।’
প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ হলে সুন্দরবন ও আশপাশের মানুষের কোনো ক্ষতি হবে না। ফসলেরও ক্ষতির সম্ভাবনা নেই।’ তিনি বলেন, ‘রামপালে নির্মিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্লান্ট। এর প্রভাবে সুন্দরবন ও পরিবেশের কোনো ধরনের ক্ষতি হবে না। দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই কেন্দ্রের আশপাশেই সবুজ ধানক্ষেত, বাড়িঘর সবই আছে। কিন্তু কোনো সমস্যা হচ্ছে না।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরোধিতাকারীদের বিষয়ে কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের শিক্ষক ও সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ এ আরাফাত রোববার যুগান্তরকে বলেন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে যারা বিরোধিতা করছেন তারা অর্ধসত্য ও ভিত্তিহীন তথ্য-উপাত্ত দিচ্ছেন। আসলে তারা সত্তর ও আশির দশকে স্থাপিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষতিকর প্রভাবের তথ্য দিচ্ছেন। কিন্তু আধুনিক যুগে উন্নত টেকনোলজির বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তথ্য তারা হয়তো জানেন না কিংবা ইচ্ছা করে দিচ্ছেন না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যুৎ বিভাগের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের যে উন্নতি হয়েছে তার পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে বিদ্যুৎ। কিন্তু এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়েই ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এটা রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল, যা বরদাশত করার সুযোগ নেই।
