বরগুনাতে ভুয়া সনদ বানিয়ে সংখ্যালঘু রাখাইন সম্প্রদায়ের জায়গা দখল করছে ভূমিদস্যুরা

0
433

বরগুনার তালতলী উপজেলার বড়বগী ইউনিয়নের তালুকদারপাড়ার রাখাইন সম্প্রদায়ের চাসেবুনের মেয়ে উক্রাচিন। সংখ্যালঘু চাসেবুন তার স্বামী সেথয় ও মেয়ে উক্রাচিনকে নিয়ে ১৯৬৫ সালে পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারে চলে যায়। তবে বাংলাদেশে থেকে যায় তার বোন মাসুইবুন। মিয়ানমারে মৃত্যু হয় মাসুইবুনের বোন চাসেবুন ও স্বামী সেথয়ের। মৃত্যুর পর তাদের একমাত্র মেয়ে উক্রাচিন কোথায় গেছে তা জানা নেই কারও। বিগত ২০০৭ সালের জুলাই মাসের ২৭ তারিখ বড়বগী ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান দুলাল ফরাজী ৪২-৪৩ বছর পূর্বে উক্রাচিন তার বাবা মায়ের সাথে মিয়ানমার গিয়ে নিরুদ্দেশ হয়েছে এমন একটি প্রত্যয়নপত্রও দিয়েছিলেন। প্রত্যয়ন পত্রটি দেয়ার পর কেটে গেছে আরও ১০ বছর।কিন্তু বিপত্তি শুরু হয় গত ২০১৭ সালের নভেম্বরের ১২ তারিখ । ওই তারিখে একই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো: আলমগীর মিঞা কাল্পনিকভাবে উক্রাচিনকে জীবিত দেখিয়ে ওয়ারিশ সনদ প্রদান করেন। সেই সনদে তিনি উক্রাচিনকে আগাঠাকুরপাড়ার বাসিন্দা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এরপর চলতি বছর নভেম্বর মাসের ২১ তারিখ চেয়ারম্যান আলমগীর উক্রাচিন নাম দিয়ে আরেকটি ওয়ারিশ সনদ প্রস্তুত করে দেন। পূর্বের ওয়ারিশ সনদে কথিত উক্রাচিনকে আগাঠাকুরপাড়ার বাসিন্দা বলা হলেও এবার তাকে তালুকদারপাড়ার বাসিন্দা হিসেবে দাবি করেছেন চেয়ারম্যান। তার দেয়া ভুয়া ওয়ারিশ সনদ নেয়ার আগে এক নারীকে উক্রাচিন হিসেবে পরিচয় দিয়ে গত ২০১৬ সালের জুনের ১৭ তারিখ অংসিট নামে এক ব্যক্তি আমতলী সাব রেজিস্ট্রি অফিসে আমমোক্তারনামা দলিল প্রস্তুত করে।তবে প্রকৃত উক্রাচিন বেঁচে নাকি মারা গেছে তা জানা নেই কারও।  আর তিনি বাংলাদেশের নাগরিকও নয়। আগাঠাকুরপাড়া এবং তালুকদারপাড়ার ভোটার তালিকাতেও উক্রাচিন নামে কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। একমাত্র ওয়ারিশ হিসেবে এ দেশে শুধুমাত্র তার খালা মাসুইবুন বসবাস করেন।     এ ধরণের জালিয়াতির বিষয়টি নজরে আসার পর উক্রাচিনের খালা মাসুইবুন আমতলী সহকারি জজ আদালতে ভুয়া ওয়ারিশ সনদদাতা চেয়ারম্যান আলমগীর ও ভুয়া দলিল তৈরীর সাথে জড়িত অংসেটকে আসামি করে একটি দেওয়ানী মামলা করেন।
অনুসন্ধান বলছে, ২০০৭ সালে জুলাই মাসের ২৭ তারিখ বড়বগী ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান দুলাল ফরাজী উক্রাচিনকে নিরুদ্দেশ হিসেবে যে প্রত্যয়নপত্র দিয়েছিলেন সেটিতে প্রায় ১৪ জন স্থানীয় রাখাইন সম্প্রদায়ের গন্যমান্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে নিশ্চিত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেই সনদে জালিয়াতির সাথে অংসিটের নামও দেখা যায়। তিনিও সেসময় উক্রাচিনকে নিরুদ্দেশ হিসেবে দাবি করে সাবেক চেয়ারম্যান ফরাজিকে জানিয়েছিলেন। এর ৯ বছর পর অংসিট নামে ওই ব্যক্তি রাখাইন সম্প্রদায়ের এক নারীকে উক্রাচিন সাজিয়ে জায়গা জমি দখলের পায়তারা শুরু করে। আর তাকে এ জালিয়াতির কাজে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করে জাহাঙ্গীর জমাদ্দার নামে এক ব্যক্তি। যিনি বড়বগি ইউপি চেয়ারম্যান আলমগীর মিয়া ওরফে আলম মুন্সীর আত্মীয়। তার দখলে রয়েছে সংখ্যালঘুদের প্রায় ৮ একর জমি।  ওয়ারিশ সনদ নিয়ে জালিয়াতি করার পর চক্রটি রাখাইন সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তির ভোটার আইডি কার্ডের ছবি ঠিক রেখে উক্রাচিন ও তার বাবা-মায়ের নাম বসিয়ে জন্মনিবন্ধন সনদ প্রস্তুত করে। সনদটি দিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ৩২ নম্বর আন্দরকিল্লা ওয়ার্ডের কাউন্সিলর জহর লাল হাজারি।উক্রাচিন নারী হলেও ভুয়া জন্ম সনদে তাকে পুরুষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অনুসন্ধান চলাকালীন সময়ে কাউন্সিলর বিষয়টি আঁচ করতে পেরে অনলাইন থেকে জন্ম সনদটি মুছে ফেলেন। এরপর তিনি দাবি করেন, ভুয়া আইডি কার্ড দেখিয়ে একটি চক্র তার কাছ থেকে জন্ম সনদটি নিয়েছিল।জন্ম সনদ মুছে ফেলা হলেও এখনো রয়ে গেছে চেয়ারম্যান আলমগীরের দেয়া ওয়ারিশ সনদগুলো। উক্রাচিনের অনুপস্থিতিতে তার বাবা-মায়ের মৃত্যু সনদ কিংবা ভোটার আইডি কার্ড ছাড়া কিভাবে অন্য ব্যক্তির হাতে দুটি ভিন্ন ঠিকানায় মনগড়া ওয়ারিশ সনদ তুলে দিলেন চেয়ারম্যান সেই প্রশ্ন ছিল তার কাছে। তিনি দাবি করেন, বিভিন্ন ব্যক্তির কথা বলে ও তদন্ত করে ওয়ারিশ সনদ দিয়েছেন তিনি। তবে টাকার বিনিময়ে সনদ দেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি। তার বক্তব্য নেয়ার পর সাংবাদিকের মুঠোফোনে চেয়ারম্যানের আত্মীয় পরিচয়ে যোগাযোগ করেন সংখ্যালঘুদের জমি দখলকারী সেই জাহাঙ্গীর। সংবাদ প্রচার না করার অনুরোধ জানিয়ে বিকাশে টাকা পাঠানোর প্রস্তাব দেন তিনি।এদিকে বরগুনা জেলা প্রশাসক মোহাঃ রফিকুল ইসলাম বলছেন,  সংখ্যা লঘুদের সম্পত্তি দখল চেষ্টায় কেউ জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।ইউপি চেয়ারম্যান আলমগীরের বিরুদ্ধে সন্দ বানিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসক,দুদক কার্যালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে জমা পড়েছে। তার সকল অনিয়মের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানও চলমান রয়েছে।

Advertisement
Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here