সাহেনা আক্তার হেনা
শুরু হয়েছে মধুমাস। রাস্তা-ফুটপাত অলিগলির মোড় ও বাজারগুলো ইতোমধ্যে ভরে গেছে নানা ধরনের ফলে। লোভনীয় এসব ফল দেখলে সবারই খেতে ইচ্ছে করে। আতঙ্কের বিষয় হলো, এসব ফলের মধ্যে মেশানো হচ্ছে প্রাণবিনাশী সব রাসায়নিক দ্রব্য। মৌসুমী ফল ছাড়াও মাছ, দুধ, কলা, সবজি ও অন্যান্য ফল-মূলের ক্ষেত্রেও ব্যবহার হচ্ছে ফরমালিন। দেশ জুড়ে ছেঁয়ে গেছে এসব জীবনবিনাশী রাসায়নিক দ্রব্যে। বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ও রাজধানী ঢাকা শহরে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের অভিযানে মাঝে-মধ্যে ধরা পড়ে এসব অসাধু ব্যবসায়িরা। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই আইনের ফাঁক-ফোঁকর গলে বেরিয়ে যায় তারা এবং আবার অনায়াসে ফিরে যায় পূর্বের অবস্থানে। যার কারণে এ অপকর্ম কোনোভাবেই থামছেনা। অপরদিকে ঢাকা-চট্টগ্রামের বাইরে এসব অভিযান পরিচালনা হয়না বললেই চলে। এ অবস্থায় নিত্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যে মরণব্যাধির জীবাণুবাহী রাসায়নিক দ্রব্যেও ফরমালিনের ব্যবহার অপ্রতিরোধ্য ভাবেই চলছে। এ যেন চলছে এবং চলতেই থাকবে। মরণঘাতি এ কুটিল প্রতারণা ব্যবসা বন্ধ করার যেন কেউ নেই। সব সম্ভবের দেশ নামেখ্যাত অন্তহীন সমস্যার আমাদের এই বাংলাদেশে ভেজাল এবং ফরমালিনের অপব্যবহার আরো একটি মরণঘাতি সমস্যা। এছাড়া আমাদের দেশে সারা বছর পাওয়া যায় আপেল, কমলা, আঙুর, নাশপাতি, পেপেঁ, কলা। চলতি মৌসুমে যুক্ত হয়েছে ফলের রাজা আম, জাতীয় ফল কাঠাল, আনারস, লিচু, জামসহ আরো অনেক ফলের। সাধ্যের মধ্যে যতটুকুন সম্ভব সবাই কম বেশী ফল খাবে। এটাই নিয়ম। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, ভেজাল একটি মরণঘাতি সামাজিক ব্যাধিও বটে। এসব ফল-মূল পাকাতে ব্যবহার হবে এবং হচ্ছে কার্বাইড। এক শ্রেণির অসাধূ মোনাফালোভী ব্যবসায়ি স্বার্থের জন্য মানুষকে মৃত্যু মুখে ঠেলে দিচ্ছে দিনের পর দিন। তাদের মধ্যে ফরমালিন ও ভেজালের ভাল-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় এবং অপরাধ বোধ কোনোটাই কাজ করে না। আড়ত, গুদামতো আছেই। ক্ষেত-খামার, বাগান, শাক-সবজি, ফল-মূলে বিষ প্রয়োগ করা হয় গাছে থাকা অবস্থাতেই। এমন চাঞ্চল্যকর খবরও আমরা দেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকাগুলোতে প্রকাশ হতে দেখেছি। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন গুলোতে যেসব মরণব্যাধির জীবাণুবাহী রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে, এগুলো ব্যবহার করা হয় পণ্য বাজারে নেয়ার প্রাক্কালে। এছাড়া কয়েক বছর পূর্বে একটি অনলাইন দৈনিকের এক প্রতিবেদনে দক্ষিণ বঙ্গের উপকূলীয় এলাকা গলাচিপার এক তরমুজ চাষি তার বক্তব্যে ষ্পষ্ট বলেছেন, তার পরিবার এবং আতœীয়স্বজনের কেউ তরমুজ খায় না। কারণ বীজ বপন থেকে বাজার পর্যন্ত আনতে যে ধরনের তীব্র বিষ ব্যবহার করা হয়, তাতে এসব ফল খেয়ে ওই সময় অসুস্থ না হলেও এর ভবিষ্যত ফলাফল অন্ধকার। একই অবস্থা আম, আপেল, মালটা, আঙুর, কমলা, আনারস, পেপেঁ, কলা, জামরুল, নাশপাতি, লিচুসহ সব ফলের ক্ষেত্রেই। অন্যান্য ফল এবং মাছ, মাংস, শাক-সবজি সব কিছুতেই মেশানো থাকে মানবদেহের জন্য মারাতœক বিপর্যয়মুখী ক্ষতিকর বিষাক্ত কার্বাইড ফরমালিন, হাইড্রোজ, ইতোফেন, ইউরিয়া, রেড অক্সাইডসহ বেশকিছু বিষাক্ত ক্যামিকেল। মাছ, দুধ, জুস, আচার, ফলমূল, শাক-সবজি থেকে শুরু করে সব ধরনের খাদ্য পানীয়ের সাথে জেনে না জেনে বিভিন্ন রকম বিষ সকাল থেকে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতিটি মূহূর্তে খেয়ে যাচ্ছি আমরা। যদি দিনের পর দিন এ অবস্থা পত্র-পল্লবে বিকশিত হয়, তাহলে মানুষের গত্যন্তরটা কী- এ প্রশ্নের জবাব দেয়ার দায় নিশ্চয় এড়াতে পারে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। জনসাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বিষাক্ত এই ফলের ব্যাপারে বর্তমানে জনমনে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা বেড়ে চলেছে। বিষাক্ত ক্যামিকেল মিশ্রিত ভেজাল খাদ্যের দৌরাতœ্য এতটাই বেড়ে গেছে যে, সাধারণ মানুষ ফরমালিনের ভয়ে ফল খাওয়া ছেড়ে দিচ্ছে। এ অবস্থা চলতে দেয়া যায় না। একজন পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির প্রতিদিন অন্তত ১শ’১৫ গ্রাম ফল খাওয়া উচিত। তার শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে। খাচ্ছেও কেউ-কেউ। কিন্তু ফরমালিন মেশানো ফল-মূল এমনকি সবধরনের খাদ্যই মানব দেহে
কতটা মারাত্মক প্রভাব ফেলে, একজন সাধারণ মানুষ তা হঠাৎ করে বুঝতে পারে না। পরিসংখ্যান মতে, প্রতিবছর ২০ কোটি টাকার বিষ লাখ-লাখ মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ফরমালিন মেশানো খাবারের কারণে যকৃত, লিভার সিরোসিস এবং শেষে লিভার ক্যান্সারে ভুগতে হয়। এছাড়া একই কারণে গর্ভবতী মায়ের শারীরিক জটিলতাসহ প্রতিবছর গর্ভজাত বিকলাঙ্গ শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। এর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখের বেশী। আর এসব রোগে আক্তান্ত হয়ে পড়লে মানুষগুলো দেশ-বিদেশে চিকিৎসা লাভের জন্য ডাক্তার, হাসপাতাল, ঔষুধ নামে চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে-করতে অনেকেই হয়ে পড়ছে সর্বস্বান্ত এবং করতে হচ্ছে অকালে মৃত্যুবরণ। বিজ্ঞ মাননীয় হাইকোর্ট ২০০৯ সালের ১ জুন এবং ২০১০ সালে দুটি রায় দেন। ২০০৯ সালের রায়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বেশ কিছু নির্দেশনা দেন এবং ২০১০ সালে হাইকোর্ট জনস্বার্থে ভেজাল বিরোধী অভিযান পরিচালনার জন্য আইজিপি, বিডিআর ও র্যাব মহাপরিচালক, বিএসটিআই ও জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ প্রদান করেন এবং আদালত তার রায় সরকারকে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা ও মহানগরে বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত (ফুড কোর্ট) স্থাপন এবং খাদ্য বিশেষক ও খাদ্য পরিদর্শক নিয়োগের আদেশ দেন। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন অনুযায়ী খাদ্যে বিষ ওষুধে ভেজাল মেশানো, বিক্রি বা বিক্রির জন্য প্রদর্শন করার কারণে যাবজ্জীবন কারাদন্ড ও মৃত্যুদন্ড এছাড়া ১৪ বছর কারাদন্ডের বিধান করলেও আমাদের দেশে সেগুলো বাস্তবায়নে উদাসীনতা ও কঠোর কোন শাস্তি না দেয়া খুবই দূঃখজনক। ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঝে-মাঝে ভেজাল কারীদের অপরাধ নির্ণয় করে কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে যে শাস্তি দেন। তা হলো, দু’এক মাসের জেল বা কিছু টাকা জরিমানা। এতে যে মাথা সে কপালই রয়ে যায়। এমনও দেখা যায়, একই প্রতিষ্ঠানে অল্প সময়ের ব্যবধানে দ্বিতীয়বার অভিযান চালানো হলে, আবারো ফরমালিন মেশানো ফল পাওয়া যাচ্ছে। অপরাধীরা এবং অসাধু ব্যবসায়ীরা আবারো সেই ফরমালিন মেশানো ফল বিক্রি করতে শুরু করে পুরোদমে। এসব অসাধু ব্যবসায়ীদের জেল জরিমানা এমনকি লাখ-লাখ টাকার মালামাল নষ্ট করে ফেলার পরও অবাধে ভেজাল ও ফরমালিন মিশিয়ে ক্রেতাদের জীবন দূর্বিষহ করে তোলে এবং নিরবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে আমাদের সবাইকে। তাই অনতি বিলম্বে আমাদের হতে হবে আতœসচেতন এবং এই সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে হবে সবার মাঝে। জনগণকে নকল, ভেজাল, ফরমালিন ও বিষাক্ত রাসায়নিক খাদ্য থেকে মুক্ত এবং নিরাপদ করতে সরকারকেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। খাদ্য পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, খাদ্যদ্রব্য ও খাদ্য পণ্যের উপাদান, আমদানী, বাজারজাতকরণসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তীক্ষè নজরদারির মাঝে সম্পন্ন করতে হবে। এছাড়া খাদ্য পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত সংস্থাগুলোর সার্বিক দায়িত্বশীলতা ও স্বক্রিয়তা বাড়ানো ও পালন করতে হবে। এর সাথে-সাথে খাদ্য ও ফলমূলে ভেজাল বন্ধ করতে হলে, মোবাইল কোর্টের সাথে দক্ষ রাসায়নিক পরীক্ষক সংযুক্ত করা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে জীবনের জন্য খাদ্যদ্রবের মধ্যে যদি বিষ থাকে তাহলে এর কুফলতা কত ভয়াবহ হতে পারে এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ নিষ্প্রয়োজন। সরকার ও প্রশাসনকে জনসাস্থ্য রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। পরিশেষে ফরমালিন মুক্তকরণে অভিযান চলুক সর্বব্যাপী এবং ফরমালিনের সাথে জড়িত দুষ্টচক্র নির্মূলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। এমনটাই প্রত্যাশা করি আমরা।
