মো: সাফিউল ইসলাম প্রধান,লালমনিরহাটঃ লালমনিরহাট পাটগ্রাম উপজেলায় কৃষকের জমি অধিগ্রহন না করে এবং কোনো প্রকার পূর্ব নোটিশ প্রদান ছাড়াই কৃষকের আবাদি জমির ভুট্টা ও বোরো ফসল নষ্ট করে ক্যানেল (খালখনন) নির্মানের কাজ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এতে শত শত কৃষক তার জমি এবং ক্ষেতের ফসল হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ছে। অথচ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে-“দারিদ্রদের জমি অধিগ্রহনের বিষয়ে সুযোগ থাকলে অল্প জমির মালিক-‘বর্গাচাষিসহ এ ধরনের মানুষের জমি অধিগ্রহন থেকে বিরত থাকা এবং তা নিতে বাধ্য হলে বর্তমান বাজার মুল্যের তিনগুণ অর্থ জমির মালিকদের দেয়ার পাশাপাশি তাদের পূর্নবাসনের ব্যবস্থা নিতে হবে”। প্রধানমন্ত্রীর এমন নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে পাটগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল করিম পাউবোর ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের নিকট থেকে কোটি টাকা ঘুষ নিয়ে জোড়পূর্বক কৃষকের ফসলী জমির উপর দিয়ে খাল খননের সুযোগ করে দিয়েছেন বলে শত শত কৃষকের অভিযোগ উঠেছে। কারন শতশত কৃষক ইউএনও বরাবর “ব্যক্তি সম্পত্তি দখল করে অন্যায়ভাবে খাল খননের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার পায়নি। পাশাপাশি পাটগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান রুহুল আমিন বাবুল যখন প্রকল্পটি পরিদর্শণ করেন তখন ভুক্তভোগি কৃষকরা তাদের জমি রক্ষার জন্য তার কাছে অনেক আকুতি মিনতি করেন। কিন্তু উপজেলা চেয়ারম্যান কৃষকদেরকে সরকারী কাজে বাধা না দেয়ার নির্দেশ প্রদান করেন। চেয়ারম্যানের এমন কথা শুনে কৃষকরা আরো বেশী হতাশ হয়ে পড়েন। তবে প্রকল্পের টাকা সংশ্লিষ্ট মহলের লোকেরা ভাগাভাগি করে খাওয়ার জন্যই নিয়মনীতিকে তোয়াক্কা না করে এভাবে উন্নয়নে নামে গরীব শ্রেনীর উপর নির্যাতন চালাচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, লালমনিরহাট পাউবো ১৭৮ কোটি টাকা ব্যয়ে পাটগ্রাম উপজেলার পাটগ্রাম ইউনিয়নের ঘোনাবাড়ি বাঁশভাঙ্গা থেকে জোংড়া ইউনিয়নের কুমারপাড়া পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার ক্যানেল নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করেছে। জিওবির অর্থায়নে দশ মিটার প্রসস্থ এবং তলদেশ (ডিপ) সাড়ে চার মিটার রেখে প্রকল্পের কাজ ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ খনন প্রায় সম্পর্ণ হয়েছে। তিনটি এসকেভেটার দিয়ে প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত খননকাজ চলছে। প্রকল্পটির কাজের নিয়মাবলী জনসম্মূখে প্রকাশ করার বিধান থাকলেও তাহা গোপন রাখা হয়েছে।
লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডি) বজলার রহমান জানান, ৬৪ জেলার অভ্যন্তরে যে ছোট নদী, খাল, জলাশয় আছে সেখানে পুনর্খনন প্রকল্প করা হচ্ছে। আমাদের লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলাধীন জগৎবেড় ইউনিয়নের হাঁসমারা খাল, জিরো পয়েন্ট জিরো থেকে কিলোমিটার দশ পয়েন্ট জিরো পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার পুনর্খনন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রকল্পটি খাল, ছোট নদী বা খাস জমির ভেতর দিয়ে করা হচ্ছে পাউবো কর্তৃপক্ষ এমন দাবি করলেও বাস্তবের সাথে তার কোনো মিল নেই। এই ক্যানেল করা হচ্ছে কৃষকের জমি এবং জমির ফসল নষ্ট করে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব জমি কারও পৈতৃক সূত্রে পাওয়া কারও দলিল মূলে কেনা। তবে যে স্থানে খনন করা হচ্ছে, ওই স্থান দিয়ে বর্ষা মওসুমে জলাধারের সৃষ্টি হয়। শুকনো মওসুমে তার কোনো অস্তিত্ব না থাকায় কৃষক ওইসব স্থানে ভুট্টা তামাক বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসল চাষাবাদ করেন। এই জলাধারের দু-একটি জায়গায় কিছু খাস জমি থাকতে পারে। তবে সেসবও সরকারি কবুলিয়াতের মাধ্যমে গরিব কৃষকদের কাছে বন্দোবস্ত করে দেয়া হয়েছে। এসব জমিতে গত মওসুমে আমন ধান ঘরে তোলার পর চলতি মওসুমে কৃষক বোরো ধান এবং ভুট্টা রোপণ করেন। এক থেকে দেড় মাস পরই এই ভুট্টা এবং বোরো ধানের কাটা ও মাড়াইর যখন শুরু হবে, ঠিক তার পূর্ব মুহূর্তে ঠিকাদারের লোকজন ক্যানালের খননকাজ শুরু করায় শত শত কৃষকের ভুট্টা এবং বোরো ফসল নষ্ট হচ্ছে।
জানা গেছে, রংপুরের রূপান্তর নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এই প্রকল্পের কার্যাদেশ পেলেও স্থানীয় দুইজন প্রভাবশালী ঠিকাদার প্রকল্পের কাজ করছে। তাদের সামনে জমি এবং ফসল নষ্ট করে খনন করা হলেও নীরবে চোখের পানি ফেলছে জমি এবং ফসলের মালিকেরা। স্থানীয় আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ফসল ঘরে তোলার পূর্ব মুহূর্তে পাউবো কর্তৃপক্ষ কিভাবে ঠিকাদারকে কার্যাদেশ প্রদান করেছে তা তদন্ত করা দরকার।
জগৎবেড় ইউনিয়নের ভান্ডারদহ গ্রামের তালিবুল নামে এক কৃষক চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তিনি এক ব্যক্তির তিন দোন (৭৫ শতক) জমি চুক্তিভিত্তিক নিয়ে ভুট্টা লাগিয়েছেন। তার নিজস্ব এক দোন (২৫ শতক)সহ চার দোন জমির ওপর দিয়ে ক্যানেল করা হয়েছে। এতে তার জমিসহ চুক্তিভিত্তিক জমি এবং সম্পূর্ণ ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। একই এলাকার ভান্ডারদহ জনতা হাইস্কুলের পাশে আনোয়ার হোসেন, ভ্যান চালিয়ে এবং সদ্য কেনা সামান্য কিছু জমি চাষাবাদ করে খুব কষ্ট করে স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। সম্পত্তি বলতে তার ৩৬ শতাংশ জমি। এই জমির এক পাশে তিনি বাড়ি করেন অপর অংশে বিভিন্ন চাষাবাদ করেন। তিনি জানান, জমি খরিদ, মাটি ভরাট এবং বাড়ি করতে খরচ হয় প্রায় সাড়ে সাত লাখ টাকা। চলতি মওসুমে আনোয়ার জমিতে বোরো রোপণ করেন। জমি কিনে মাটি ভরাট করে বাড়ি নির্মাণ করতে তার খরচ হয় সাড়ে সাত লাখ টাকা। আনোয়ারের বোরো ধানের শীষও বের হয়েছে। আর মাস খানেক পরই এই ধান তিনি ঘরে তুলতে পারতেন। কিন্তু জমির ওপর দিয়ে ক্যানাল নির্মাণ করার কথা শুনে আনোয়ার ওই ধান গাছ কেটে গো খাদ্য হিসেবে বাজারে বিক্রি করেন।
সরেজমিন গিয়ে জমির মালিকদের সাথে কথা বললে তারা অভিযোগ করেন, ক্যানেলের দুই পাশে যেভাবে বালুর স্তুপ করা হয়েছে, এসব বালু বর্ষা মওসুমে পানির তোড়ে আবার ভরাট হয়ে যাবে। অপর দিকে পানি কমে গেলে দুই পাশে ব্যাপক ভাঙনের সৃষ্টি হবে। এতে তারা আরো ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। এ ছাড়াও ভান্ডারদহ হাঁসমারা ব্রিজটি হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। পাটগ্রাম পৌর শহর থেকে মুন্সিরহাটগামী ভান্ডারদহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং জনতা হাইস্কুলের পাশেই ওই হাঁসমারা ব্রিজের অবস্থান। প্রতিদিন শত শত রিকশা ভ্যান ট্রাক মাইক্রোবাস, বাস যাতায়াত করে। ওই ব্রিজের নিচ দিয়ে খনন করা হয়েছে ক্যানাল। আর ব্রিজটির অবস্থান এমন জায়গায় বর্ষা মওসুমে তীব্র পানি প্রবাহ সৃষ্টি হলে তা পশ্চিম দিক থেকে পূর্ব দিকে আঘাত হেনে একটু দক্ষিণ দিকে অবস্থানকৃত ওই ব্রিজে আঘাত হানতে পারে। এতে ওই ব্রিজসহ কয়েকটি বাড়ি মসজিদ এবং পৌর শহর থেকে মুন্সিরহাটগামী সড়কটি হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়তে পারে। ব্রিজের উত্তর-পূর্ব দিকে যেখানে ক্যানেলের পানি আঘাত হানতে পারে সেখানে সিসি বøক নির্মাণ করে জরুরিভিত্তিতে বাঁধ নির্মাণ করার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। এ দিকে গত বৃহস্পতিবার ক্ষতিগ্রস্থ এলাকাবাসী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে এ ব্যাপারে অভিযোগ দিয়েছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল করিম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, আমি এ ব্যাপারে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) দীপক কুমার দেব শর্মাকে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। ক্যানেলটি করা হচ্ছে, তা খাস জমি, না সাধারণ মানুষের জমি তাও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে জানার জন্য বলা হয়েছে।
লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় (এসডি) প্রকৌশলী বজলার রহমান বলেন, পানি আইনে আছে যে দিকে জলাধার থাকবে সেটি আপনা আপনি খাস হয়ে যাবে। তাহলে খাস না হয়ে জমিগুলো ব্যক্তি মালিকানাধীন থাকল কেন? এই প্রশ্নের সঠিক কোনো জবাব তিনি দিতে পারেননি। তিনি বলেন, যাদের ফসল ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ঠিকাদারকে তাদের বিষয়টি দেখতে বলা হয়েছে।

