সাংবাদিক, সাংবাদিকতা, বাস্তবতা ও দস্যুতা

0
1692

লেখকঃ  শাহেদুর রহমান জুনেদ। দীর্ঘ দিন থেকে সাংবাদিক ও সাংবাদিকতা নিয়ে লিখার পরিকল্পনা করছি কিন্তু নানাবিধ  কারনে লিখা হয়নি। চেষ্টা করবো এই বিষয়ে কিছু  লিখার। আমার লিখার শিরোনাম সাংবাদিক- সাংবাদিকতা, বাস্তবতা ও দস্যুতা। প্রথমেই  ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি সবার কাছে।আমার লেখায় অনেক ভুল ভ্রান্তি থাকতে পারে।আশা করি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখে পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করবেন।সাংবাদিক ভাই-বন্ধুদের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি যদি আমার লেখায় কারো মনে আঘাত লাগে।আশা করি মনঃক্ষুণ্ণ না হয়ে পরামর্শ দেবেন। প্রথমে  জেনে নেই সাংবাদিক কাদের কে বলা হয়? সাংবাদিক বলতে আমরা তাদের কে বুঝি যারা বিভিন্ন স্থান থেকে সংবাদ সংগ্রহসহ বিভিন্ন ধরণের তথ্য সংগ্রহপূর্বক সংবাদ কিংবা প্রতিবেদন রচনা করে সংবাদমাধ্যমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রেরণ করে থাকেন। তারা দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে বাস্তব ও সত্য ঘটনা সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে দেশ,জাতি ও বিশ্ব দরবারে তুলে ধরেন। সাংবাদিকদের কে বলা হয় জাতির বিবেক। সমাজের দর্পণ বা আয়না। একজন মানুষ আয়নার সামনে দাড়ালে যেমন তার চেহারা দেখতে পায় ঠিক তেমনি সমাজের চিত্র সাংবাদিকের কলম-ক্যামেরার মাধ্যমে ফুটে উঠে।

Advertisement

সাংবাদিকতা একটি সম্মান জনক পেশা। এ পেশায় যারা জড়িত তাদের কে সমাজের প্রতিটি স্তরে ,প্রতিটি ক্ষেত্রে সম্মানের চোখে দেখা হয়। কারন, সাংবাদিকরা সমাজ-সংস্কৃতি, শিক্ষা,অর্থনীতি,রাষ্ট্রের উন্নতি সহ সকল ক্ষেত্রে অবদান রেখে চলেছেন।

সাংবাদিকতা পেশায় একাডেমিক বা শিক্ষাগত যোগ্যতা কতটুকু হওয়া প্রয়োজন তা আমার জানা নেই। তবে আমার মতে সাংবাদিকতা পেশায় যারা জড়িত তাদের প্রত্যেকেরই একাডেমিক যোগ্যতা কমপক্ষে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত হওয়া প্রয়োজন । তবে হ্যা; একাডেমিক যোগ্যতার পাশা-পাশি খবর তৈরীর কিছু কলা-কৌশল জানা থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন । বেশিরভাগ সাংবাদিকরা খবর তৈরীর ক্ষেত্রে কয়েক টি নিয়ম মেনে চলেন। সে গুলো হল-  কে,কখন, কোথায়,কিভাবে,কি এবং কেন এই প্রশ্ন গুলো কে সামনে রেখে খবর তৈরী করে থাকেন। আর এই নিয়ম মেনে খবর তৈরী করলে খবরের মূল বিষয় বস্তু পাঠকের সামনে পরিষ্কার থাকে,পাঠক সহজে বুজতে পারে।কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় কি জানেন,অনেক সাংবাদিক আছেন যারা সংবাদ রচনার কোন রকম নিয়মনীতি না  জেনে নিজের ইচ্ছে মত সংবাদ তৈরী করে থাকেন।

আর তাদের তৈরিকৃত  সংবাদটি বিভিন্ন গনমাধ্যমে বড় আকারের ভয়ানক একটি শিরোনাম দিয়ে প্রকাশিত হয় পত্রিকার কাটতি বাড়ানো বা টেলিভিশন চ্যানেলের দর্শকসংখ্যা বাড়ানোর উদ্ধেশ্যে। এ রকম সংবাদ পরিবেশনের কারনে পাঠক সমাজ সঠিক ও সত্য বিষয়টি জানার পরিবর্তে  বিভ্রান্তির শিকার হন। এই রকম সংবাদ রচনা সাংবাদিকতার রীতিনীতির  মধ্যে পড়ে না। এ ধরনের সংবাদ যারা পরিবেশন  করে থাকেন তারা সমাজে হলুদ সাংবাদিক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকেন।  বর্তমানে হলুদ সাংবাদিকতার ছড়াছড়ি সর্বত্রই চোখে পড়ার মত। কারন হিসেবে দেখা যায় কিছু অসাধু ,দূর্নীতিবাজ ব্যাক্তি পত্রিকা বা টেলিভিশনের মালিক,ও সম্পাদক।

এই অসাধু ব্যাক্তিরা নিজেদের দূর্নীতি আড়াল করার জন্য বিভিন্ন সরকারের সময়ে নেতা – আমলাদের সহযোগিতায় টাকার বিনিময়ে পত্রিকা ও টেলিভিশনের মালিক ও সম্পাদক হয়েছেন। আর সে জন্যে তাদের মালিকানাধীন গনমাধ্যম গুলোতে দেখা যায়  উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে নজরকাড়া শিরোনাম দিয়ে  ভিত্তিহীন রোমাঞ্চকর সংবাদ পরিবেশন বা উপস্থাপন প্রাধান্য পায়। সত্য ও নিরপেক্ষ  সংবাদ পরিবেশনের পরিবর্তে অসত্য,অশালীন ও ভূয়া সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে পাঠক-শ্রুতাকে বিভ্রান্তি করাই যেন তাদের আসল উদ্দেশ্য।  ইদানিং বিভিন্ন অনলাইন,প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় সিনেমার আজগুবি খবর ও হ্যাপি মার্কা খবরের ছড়াছড়ি চোখে পড়ার মত। সেই সাথে চলছে কপি- পেস্টের সাংবাদিকতা । তথ্য যাচাই-বাছাই না করে কে কার আগে অনলাইনে পোস্ট করবে তার প্রতিযোগিতা।

আর তাদের সেই প্রতিযোগিতার কারনে অনেকের জীবনে নেমে আসে ভয়াবহতা। কয়েকদিন পূর্বে  ঢাকার একটি পাচ তলা ভবন থেকে নীচে ফেলে দিয়ে এক নবজাতককে হত্যা করা হয়। এই ঘটনার সাথে জড়িত শিশুটির মা কে পুলিশ গ্রেফতার ও করে।কিন্তু দেখা গেলো কোন এক অনলাইন নিউজ পোর্টাল  এই নিউজ করতে গিয়ে একজন নবাগত মডেলের ছবি জড়িয়ে দিলো।আর অন্যান্যরা  সত্যতা যাচাই-বাছাই না করে কপি- পেস্ট করে তাদের   পোর্টালে পোস্ট, এমনকি বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়ায়  প্রকাশ পেলো।এই রকম অসংখ্য নোংরা সাংবাদিকতার প্রতিযোগিতার কারণে অনেক  নিরপরাধ ব্যাক্তিরা মানষিক, পারিবারিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক ভাবে হয়রানির  কবলে পতিত হচ্ছেন।

এসব সাংবাদিক নামক দস্যুদের তাথে কি কিছু যায়- আসে?  তাদের মূল উদ্দেশ্য হল  পত্রিকার কাটতি, অনলাইন পোর্টালের লাইক- কমেন্টস ও  দর্শক সংখ্যা বাড়ানো ।আর এই সমস্ত গনমাধ্যমে যাদেরকে প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় তাদের বেশির ভাগই দূর্নিতিবাজ,বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত অথবা অল্প শিক্ষিত। অনেকের আবার একাডেমিক যোগ্যতা প্রাইমারী স্কুল পর্যন্ত। অনেক সময় দেখা যায় বিভিন্ন ব্যাক্তি নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে দাপুটে ঘুরে বেড়ায়।

নামসর্বস্ব কোন পত্রিকার সম্পাদকের কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে পরিচয় পত্র নিয়ে বিভিন্ন অফিস-আদালত,ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ব্যাক্তির কাছ থেকে চাঁদাবাজি করে থাকে।গত ২৭ জুন ২০১৯ সনে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও থেকে একটি পত্রিকার পরিচয়পত্র সহ আন্তজেলা ডাকাত দলের পাচঁ সদস্য  কে গ্রেফতার করে পুলিশ। এই ডাকাত চক্র নিজেদের গলায় সাংবাদিকতার কার্ড ঝুলিয়ে হাতে ক্যামেরা নিয়ে দিনের বেলায় ঘুরে বেড়াতো এবং রাতের বেলা বিভিন্ন জায়গায় ডাকাতি করতো। ৩০ জুন ২০১৯ সনে আবারও নারায়ণগঞ্জে চাদাবাজির অভিযোগে সাংবাদিক পরিচয় দানকারী  ৯ প্রতারক কে গ্রেফতার করে পুলিশ। ৪ জুলাই সিলেটে এক ভুয়া সাংবাদিক কে গ্রেফতার করা হয়।

  বিভিন্ন সময় দেশের বিভিন্ন জায়গায় সাংবাদিক নামধারী এসব  ভূয়া, প্রতারকদের গ্রেফতারের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হতে দেখা যায়।  দস্যুরা যেমনভাবে মানুষ কে জিম্মি করে ডাকাতি করে থাকে তারচেয়েও ভয়ানক ভাবে এইসব ভূয়া নাম সর্বস্ব পত্রিকার সাংবাদিক নামধারী দস্যুরা মানুষ কে  জিম্মি করে থাকে।তাদের কারনে গোটা সাংবাদিক সমাজের চরিত্র নিয়ে মানুষ সন্দিহান। মানুষ এখন আর আগের মত সাংবাদিকদের সম্মান দেয়না।তাদের মনে বিরুপ প্রতিক্রিয়া। সাংবাদিক দেখলেই বলে সাংঘাতিক।  

সাংবাদিকদের মধ্যে সবসময় একতা ছিল। প্রকাশ্যে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা যেতনা। কেউ কেউ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত থাকলেও সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন ও নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন যথাযত ভাবে পালন করেছেন।কিন্তু ইদানিং সাংবাদিক সমাজ বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত।অধিকংশ সাংবাদিক  বিভিন্ন দলীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে নিজেদের নীতি ও আদর্শ কে বিকিয়ে দিয়েছেন বলে প্রতিয়মান হয়। 

বর্তমানে  সঠিক সাংবাদিকতার চর্চা না থাকার কারনে  সাংবাদিকদের প্রতি মানুষের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। আর এর জন্য দায়ী তোষামোদকারী, দালাল  প্রকৃতির সাংবাদিক নামক চাটুকাররা। তাদের কারণে অনেক সময় দেখা যায় যারা সাংবাদিকতার সঠিক চর্চা করেন এবং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে কলম চালিয়ে যান,তাদেরকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ভাবে নানা ধরনের হেনস্তার স্বীকার হতে হয়। এইসব থেকে রেহাই পেতে হলে   তোষামোদকারী হলুদ সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যাবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।  যে সমস্ত সংবাদ মাধ্যম এদেরকে নিয়োগ দিয়েছে তারা যদি এদের নিয়োগ বাতিল করে এবং কোন সংবাদ মাধ্যম যদি কাজ করার সুযোগ না দেয় তাহলে মনে হয় অনেকটা ফল পাওয়া যেতে পারে।  জানি, সংবাদমাধ্যম গুলো সেটা করবে না।কারণ, তাদের অনেকেইতো তোষামোদী সাংবাদিকতা চর্চা করেন।

সে জন্যে সাগর-রুনি হত্যার খুনি ধরা পড়েনা,সাংবাদিক বালু হত্যার সঠিক বিচার হয়না।আসামিরা খালাস পেয়ে যায়। বিভিন্ন সময়  রাজনৈতিক ব্যক্তি ও প্রশাসনের লোকদের হাতে লাঞ্ছিত হলেও সাংবাদিকরা সঠিক বিচার পায়না। 

 লেখকঃ সাংবাদিক 

মোবাইল- ০১৭১৬৪৪১৩০৯ 

সিলেট।   

চলবে……..

Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here