পরশুরামে স্কুল কলেজে হাজিরা, কোচিংয়ে চলে লেখাপড়া

6
964

শিবব্রত
শিক্ষার্থীরা এখন আর শেখার জন্য বা লেখাপড়ার জন্য স্কুল কলেজে যায় না । যায় হাজিরার জন্য, শিক্ষার্থী হিসেবে তালিকায় নাম থাকার জন্য । পড়ার জন্য, শেখার জন্য বা পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য ছোটে কোচিং সেন্টারে। ব্যতিক্রম ছাড়া এ চিত্র পুরো দেশের। শিক্ষকরাও শিক্ষার্থীদের এ ধারণার সাথে মানিয়ে নিয়েছেন। হাজিরা নিতেই সময় পার হয়ে যায় বা পার করেন। তারাও জানেন শ্রেণী কক্ষে না শেখালেও শিক্ষার্থীরা কোনো না কোনো কোচিং সেন্টারে গিয়ে পড়া শিখবে, পরীক্ষায় ভাল নম্বর পাবে। তাই শ্রেণী কক্ষে শেখানোর এত তাড়া নেই। চিত্রটি এমন, কোচিংগুলোই এখন আমাদের মূল ব্যবস্থা; স্কুল গুলোর সহায়ক ভুমিকা পালন করছে। কোচিং সেন্টার বা শিক্ষকদের সৃষ্ট প্রাইভেট হোমে প্রতিদিন সকাল বিকাল রাতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ¯্রােত নামে। স্কুল কলেজের সমান্তরালে শ্রেণী কক্ষের মত আয়োজন করে এসব জায়গায় পড়ানো হচ্ছে, স্কুলের আদলে পরীক্ষা হয়, ক্লাস হয় দেয়া হয় হোম ওয়ার্ক। স্কুলের চেয়ে কোচিং সেন্টারেই পড়াতে বাধ্য হন অভিভাবকরা। এ কারণে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার উপর বিরক্ত ও ক্ষুব্দ অভিভাবকরা সন্তানকে নিয়ে ছোটেন স্কুলে এবং কোচিং সেন্টারে। গত কয়েকদিন পরশুরামের বেশ কয়েকটি স্কুলের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সাথে কথা বলে এসব তথ্যের প্রমাণ মিলেছে। শিক্ষার্থীরা জানায়, তাদের স্কুলের সময়টা অপচয়ই হয়। এর চেয়ে কোচিংয়ে গেলে কিছু শেখা যায়। কোচিংয়ে বিষয়গুলো প্রাকটিস করে যেতে হয়। নিয়মিত কোচিংয়ে পরীক্ষা হয়। তাই কোচিংয়ে পরীক্ষার জন্য প্রস্ততি নিতে হয়। এ কারণে স্কুলে কোনো হোম ওয়ার্ক দেওয়া হলেও তা করা হয় না। শিক্ষকদের ম্যানেজ করে নিতে হয়। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটি এবং শিক্ষকদের প্রাইভেট কোচিং মূখিকেই দায়ী করেছেন অভিভাবকরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেজাল্ট ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে এই অবস্থা তৈরী হয়েছে। শেখার জন্যে শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরী হওয়া দরকার। শিক্ষার্থীরা কি শিখল এটা এখন গুরুত্ব পায়না, গুরুত্ব পায় সে কতটা ভাল ফল করেছে। আর ভাল ফলের জন্য ছুটছে এক কোচিং থেকে অন্য কোচিংয়ে।
তাহমিনা আক্তার। পরশুরাম এর একটি মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষার্থী। স্কুল সময় সকাল ১১টা থেকে বিকাল ৪টা। এরপর তার বাসায় ফেরার কথা। কিন্তু সে বাসায় ফেরে রাত্রে। স্কুল শেষে তাহমিনা স্কুলের পাশেই একটি কোচিং সেন্টারে যায়। কোচিংয়ে দেয়া হোমওর্য়াক ও পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটে তার। এই শিক্ষার্থীর বক্তব্য ”স্কুলে লেখাপড়া হয়না। স্যারেরা তেমন গুরুত্ব দিয়ে পড়ান না। তাই কোচিংয়ে আসতে হয়। স্কুলে গুরুত্ব দিয়ে পড়ালে কোচিংয়ে আসতো হতো না”। এই একই বক্তব্য সায় দিলো রাহেলা, মনোয়ারা ও রাসেল সহ উপস্থিত অনেকে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শিক্ষক জানান, একটি শ্রেণি কক্ষে ৬০ থেকে ৭০জন ছাত্র-ছাত্রী থাকে। ঐ সব শিক্ষার্থীদেরকে ৩০-৪৫ মিনিটে কি শিখানো যাবে। হাজিরা নিতেই তো সময় চলে যায়। সময়ের অভাবে ছাত্র-ছাত্রীরা যা জানতে চায় তা জানানো যায় না। তাই বাধ্য হয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা কোচিং সেন্টারে ছুটছে। এই ব্যাপারে পরশুরাম উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষাকর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান ”আমি সকল স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের বলে দিয়েছি কোন শিক্ষক যেন কোচিং এ জড়িত না হন”। পরশুরাম মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও নরনীয়া মাধ্যমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক জয়নাল আবেদীনের কাছে এই ব্যাপারে জানতে চাইলে  তিনি মুটোফোনে জানান ”সরকার কোচিং বন্ধে আইন করেছেন। শহর এলাকায় ওই সব শিক্ষকদের তালিকা হচ্ছে, ক্রমান্বয়ে মফস্বলেও এটা চালু হবে। তবে প্রধান শিক্ষকের অনুমতিক্রমে স্কুল সময়ের পরে বাড়তি ক্লাশ করানো যেতে পারে”।
কোচিং প্রাইভেট বানিজ্য বন্ধে সরকার ২০১২ সালে কোচিং বানিজ্য বন্ধ নীতিমিালা জারি করে। ওই নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষকদের নিজ প্রতিষ্টানের শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়ানোর সুযোগ নেই। কিন্তু এ নীতিমালা কাগজেই বন্দি। আলোর মুখ দেখেনা।

Advertisement
Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here