দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ান রাজউক পূর্বাচল সেল স্টাইল

0
1170

মোঃ আবদুল আলীমঃ
রাজউকের দুর্নীতির লাগাম ধরে রাখা যাচ্ছে না। যতই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠছে ততই অভিযোগকারীকে হয়রানি করা হচ্ছে। অভিযোগ করার কারনে ঘুষের রেটও লাগাতার বেড়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি দুদকের গণশুনানি থেকে এমনই চিত্র ওঠে এসেছে। দুই দফা দুদকের গণশুননিতে যেসব ভূক্তভোগী রাজউকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন তাদেরকে রাজউক হয়রানি ও ঘুষের রেট বৃদ্ধির টর্গেটে পরিণত করেছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম নিয়ে বছরের শুরুতে ২৭ জনুয়ারি অনুষ্ঠিত গণশুানিতে অভিযোগ জমা পড়েছিল ৭৭ টি। সেদিন ৩০ টির বেশি অভিযোগের শুনানিতে রাজউকের কর্মকর্তারা খুব শিঘ্রই ভূক্তভোগীদের সমস্যাগুলো সমাধানের আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু বছর চলে গেলেও অধিকাংশ ভূক্তভোগী কোন প্রতিকার পাননি। রাজউকের সেবাপ্রার্থীর হয়রানি ও ভোগান্তি তো কমেইনি, বরং বেড়েছে অনাস্থা ও ক্ষোভ।
গত ১৪ ডিসেম্বর রাজধানীর কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনষ্টিটিউশন মিলনায়তনে রাজউকের কার্যক্রম নিয়ে ফলোআপ গণশুনানিতে এমনই ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে। গণশুনানির সময় দর্শকদের সারি থেকে রাজউকের কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে নানা মন্তব্য আসে ও প্রচন্ড হই চই শুরু হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে দুদকের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও উপস্থিত কর্মকর্তাদের বেশ বেগ পেতে হয়। ভূক্তভোগীদের অভিযোগের মধ্যে যেসব বিষয় ছিল তার মধ্যে প্ল্যান ও নকশা পাশে হয়রানি ও ঘুষ দাবি এবং জমির ছড়পত্র নিয়ে একই হয়রানি। সবচেয়ে অভিযোগ রয়েছে রাজউকের পূবাচল সেলকে কেন্দ্র করে। ভূক্তভোগীদের অভিযোগের মধ্যে ছিল টাকা জমা দেয়ার পরও প্লট দখল  না পাওয়া, ঘুষের বিনিময়ে একজনের প্লট অন্যজনের নামে বরাদ্দ দেয়া, লটারিতে বিজয়ী হয়েও প্লট না পাওয়া, অবৈধ স্থাপনা ভাঙার আবেদন করার পরও ভবন মালিকের সাথে যোগসাজসে তা না ভাঙা, ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে প্লট পাওয়ার কথা থাকলেও তাকে প্লট না দিয়ে বছরের পর বছর হয়রানি করা ও নামজারি নিয়ে পাইকারি হয়রানি করা। আমমোক্তারনামা গ্রহন, দলিল রেজিষ্ট্রি, নকশায় ছাড়পত্র ইত্যাদি ক্ষেত্রেও মোটা অংকের উৎকোচ দিতে হয়। পূর্বাঞ্চল সেলে প্লটের আকার ভেদে টাকা দিতে হয়। অভিযোগর য়েছে সহকারী পরিচালক, উপ-পরিচালক, পরিচালক ও মেম্বার (সদস্য-এস্টেট) পর্যন্ত ঘুষের টাকার ভাগ বাটোয়ারা হয়। এই সেলে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন সহকারী পরিচালক সদরুল আলম ও মেহেদউজ্জামান, অফিস সহকারী নাছির, শুনেন বাবু, খোকন, জহরুল আলম ও জাহাঙ্গীর। রাজউক সূত্রে জানা গেছে সহকারী পরিচালক মেহেদউজ্জামান বিশাল সম্পত্তি ও বাড়ি গাড়ির মালিক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজউকের একাধিক কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে জানান, সহকারী পরিচালক (ভূমি ও এস্টেট-৩) মেহেদউজ্জামানের সম্পত্তির পরিমান প্রায় ১০ কোটি টাকার ওপরে। দুর্নীতি দমন কমিশন তার সম্পত্তির হিসাব নিলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে। পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-২) শেখ শাহীনুল ইসলাম নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ট লোক বলে পরিচয় দিয়ে অফিসে প্রভাব বিস্তার করেন। তার সহকারীরা একই প্রভাব বিস্তার করে সকল শ্রেনীর লোকদের সাথে যচ্ছেতাই আচরন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গণমাধ্যম কর্মীদের সাথে অসদাচরন ও হুমকি দেয়ার অপরাধে ইতিমধ্যে সহকারী পরিচালক (ভূমি ও এস্টেট-৩) মেহেদউজ্জামানের বিরুদ্ধে ঢাকা মহানগরির মতিঝিল থানায় জেনারেল ডাইরি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যা বর্তমানে  তদন্তাধীন। গত ১৪ ডিসেম্বর কাকরাইলে দুদকের গণশুনানিতে আবদুল্লা নামে একজন ভূক্তভোগী অভিযোগ করেন, ২৭ জানুয়ারিতে গণশুনানিতে বাড্ডা পূনর্বাসন প্রকল্পে তার একটি প্লট এক মাসের মধ্যে অবমুক্ত করে দেয়ার কথা ছিল। দীর্ঘ দিন পরও তা দেয়া হয়নি। দুদকের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এ ব্যাপারে রাজউকের কাছে ব্যখ্যা চাইলে সংস্থাটির একজন কর্মকর্তা বলেন, “বিষয়টি খুব সহজ নয়। সমস্যাটি সমধান করতে একটু সময় লাগবে।” রাজউকের কর্মকর্তার এমন বক্তব্যে দুদকের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ক্ষোভের সাথে বলেন,“গত ২৭ তারিখে গণশুনানির সময়ও আপনারা একই কথা বলেছেন। দীর্ঘ দিন পার করেও আপনারা এখনও বলছেন একটু সময় লাগবে। দীর্ঘ ১০ মাসে আপনারা সমস্যাটির কোন সমাধান করতে পারলেন না। অর্থাৎ আপনারা সেবা গ্রহনকারীদেরকে শুধু আশ্বাসের ওপর রেখে হয়রানি করে যাবেন। জনগনের প্রতি আপনাদের কোন দায়বদ্ধতা নেই ?” এমন প্রশ্নের জবাব না দিয়ে রাজউকের উক্ত কর্মকর্তা নিরব হয়ে বসেছিলেন। প্রবাসী এক চিকিৎসক রেজাউল ইসলাম ২৭ জানুয়ারি অভিযোগ করেছিলেন, তার নামে বরাদ্দ হওয়া উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের ১৭ নম্বর সড়কের ৪১ নম্বর প্লটটিতে অন্য এক লোক বাড়ি করছেন। উক্ত তারিখে শুনানিতে তাকে অন্য একটি প্লট সৃজন করে দেয়ার আশ্বাস দিয়েছিল রাজউক।  কিন্তু ১৪ জানুয়ারি শুনানিতে যুক্তরাজ্য থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তিনি বলেন, রাজউকের আশ্বাস দেয়ার পরও আজও আমি প্লট বুঝে পাইনি।” নাসির খান নামে এক ব্যক্তর অভিযোগ, উত্তরায় এমন একটি প্লট বুঝে পেতে রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান তার কাছে ২ কোটি টাকা ঘুষ চেয়েছিলেন। এ সময় দুদকের কমিশনার (তদন্ত) এ এফ এম আমিনুল ইসলাম রাজউক কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্য করে বলেন, “এই যে রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ উঠল, এতে কি আপনাদের মাথা হেঁট হয়ে যায় না ?”
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতির কারনে কিছুদিন পর পরই একজন করে ধরে নিয়ে যাচ্ছে দুদক। সেবা গ্রহনকারীদেরকে জিম্মি করে ওরা টাকা ও সম্পদের পাহাড় বানাচ্ছে। বছরের পর বছর চলছে ওদের লগামহীন দুর্নীতি ও হয়রানি। এর সর্বশেষ উদাহারন হচ্ছে রাজউকের সহকারী পরিচালক (আইন) ইকবাল পারভেজ। প্রায় ২০০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক এই কর্মকর্তা বর্তমানে কারাগারে আছেন। রাজউকের দুর্নীতি বিশেষ করে পূর্বাচল সেল নিয়ে অপরাধ বিচিত্রার তদন্ত অব্যহত আছে। পরবর্তি সংখ্যায় এ ব্যাপারে আরও বিস্তারিত থাকছে। (চলবে)

Advertisement
Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here