অপরাধ বিচিত্রাঃ অনিয়ম আর দুর্নীতির শীর্ষে অবস্থান করছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। উন্নয়নের নামে রাউজকে প্রতিনিয়তই চলছে হরিলুট। বিষয়টি অনেকটাই ওপেন সিক্রেট। অনিয়ম আর দুর্নীতির বিষয়টি রাজউকের শীর্ষ ব্যক্তিরা জানলেও অজ্ঞাত কারণে নিচ্ছে না কোনো পদক্ষেপ। একে অপরের উপর দোষ চাপিয়ে বহাল তবিয়াতে রয়েছেন দুর্নীতিবাজ এইসব কর্তকর্তা। সূত্র জানা গেছে, রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্পে পৌনে পাঁচশ প্লট বরাদ্দে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছিল সংশ্লিষ্ট বিভাগ। সূত্র মতে, লটারিতে নাম নেই, অনেকে আবেদনই করেননি, তারপরও তারা সরকারি প্লটের মালিক বনে গেছেন। এই প্রকল্পে মিটিয়ে দেয়া হয়েছে মাটিকাটার ঠিকাদারের পাওনা। খোঁজ নেয়া হয়নি আদৌ কাজ হলো কি না। উন্নয়নের নামে কর্মকর্তারা লুট করেছেন সরকারি অর্থ। এলাকাভেদে একই কাজের খরচের ফাঁরাকটা বিস্তর। সংযোগ সড়ক নির্মাণেও হয়েছে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম। পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে এমনই অনিয়ম ও দুর্নীতি খুঁজে পেয়েছে সরকারের পূর্ত নিরীক্ষা অধিদফতর। আর এর নেপথ্যে রয়েছে চেয়ারম্যার জয়নাল আবেদীন। রাজউকের দুর্নীতির বিষয় নিয়েই এ প্রতিবেদন।
রাজধানীর ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, উত্তরা, বারিধারাসহ বিভিন্ন এলাকার ছয় হাজারেরও বেশি আবাসিক ভবনে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। যার মধ্যে ৮৭ শতাংশ ভবনমালিক আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) থেকে কোনো ধরনের অনুমোদন নেননি। এ পরিস্থিতিতে রাজধানীর আবাসিক এলাকাগুলোতে বসবাসের পরিবেশ নষ্ট করার জন্য রাজউকের দুর্বল নজরদারিকে (মনিটরিং) দায়ী করেছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী এবং ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়র। এ ছাড়া ক্ষেত্রবিশেষে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে এই সুযোগ করে দিয়েছেন রাজউকের কর্মকর্তারা। ওইদিন রাজউকের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হকও মন্ত্রীর সঙ্গে সুর মেলান। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ঘুমিয়ে থেকে কিংবা আর্থিক সুবিধার মাধ্যমে ম্যানেজ হয়ে অবৈধ ভবন নির্মাণ বা আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দিচ্ছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক)। সম্প্রতি রাজধানীর গুলশান ক্লাবে উত্তর সিটি কর্পোরেশন আয়োজিত আলোচনা সভায় রাজউকের দুর্নীতিবাজ চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীনের উপস্থিতিতে নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করেন দুজনেই। মন্ত্রী মোশাররফ হোসেন বলেন, রাজউকের অনেক গাফিলতি আছে। সে গাফিলতির সুযোগ নিয়ে আবাসিক এলাকাগুলোতে হাজার হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। চোখের সামনে ১৭-১৮ তলার অনুমতি নিয়ে ২৫-তলা ভবন তোলা হলেও রাজউক বাধা দেয়নি। তবে ঘুমন্ত রাজউককে জাগানোর চেষ্টা চলছে। এর আগে দুর্নীতিবাজ জয়নাল আবেদীনকে উদ্দেশ করে ক্ষোভ প্রকাশ করে মেয়র আনিসুল হক বলেন, কোনো ভবনের রাজউকের অনুমোদন ১৫তলা, সেখানে নির্মাণ করা হচ্ছে ২০তলা। ৪ হাজার বর্গফুটের বিপরীতে নির্মাণ হচ্ছে সাড়ে ৪ হাজার বর্গফুট। এসব কিভাবে হচ্ছে? রাজউকের কি চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা নেই? নাকি তাদেরই যোগসাজশে এসব হচ্ছে? তিনি বলেন, আমাদের কানে আসে, টাকার বিনিময়ে রাজউকের পক্ষ থেকে অনুমোদন দেয়া হচ্ছে। রাজউক ভবন নির্মাণের খবর পেয়ে অনুমোদন দেয়। কিন্তু অনুমোদনের পর কিভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে তা খেয়াল রাখে না। ঢাকা উত্তরের মেয়র বলেন, ২০০৭ সালের পর থেকে আবাসিক এলাকায় ব্যবসার জন্য ট্রেড লাইসেন্স বন্ধ। কিন্তু এরপরও কেন অনুমোদন মিলেছে? যদি অনুমোদন নাও মেলে তবে কি করে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ হচ্ছে? এর সব কিছুরই উত্তর জানেন রাউজক কর্তৃপক্ষ। এ সবের উত্তরে রাজউক দুর্নীকিতবাজ চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন দায় স্বীকার করে বলেন, আমি দায় অস্বীকার করছি না। এসব অনিয়মে রাজউকের সহযোগিতা প্রমাণিত। বলতে পারেন আমাদের যোগসাজশও রয়েছে। তবে ঢাকার আবাসিক এলাকায় কি ধরনের বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করা যাবে- সে বিষয়ে ২০০৯ সালে একটা পরিপত্র জারি করেছিল গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। কিন্তু এর কোনোটাই যে মানা হচ্ছে না, তা নয়। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় ঘটেছে। আলোচনা সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন ঢাকা দক্ষিণ কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সিও মেজবাহুল ইসলাম, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সিও খান মো. বেলাল ও সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এটিএম শামসুল হুদা। গণপূর্তমন্ত্রী বলেন, শুরু থেকেই ঢাকা শহর নিয়ে পরিকল্পনাবিদদের পরিকল্পনায় ভুল ছিল। যখন ধানমন্ডি সৃষ্টি হয়, তখন ঢাকা এতো বৃদ্ধি পেতে পারে তা কেউ ধারণাও করেননি। ফলে শিল্প এলাকা করা হয় তেজগাঁওয়ে। তারা ভেবেছিলেন, তেজগাঁওয়ে বাইরে শিল্প কারখানা যাবে না। এখন ঢাকা বাড়ছে, আরো বাড়বে। তিনি বলেন, ঢাকা শহর স¤পূর্ণ বসবাসের অনুপযোগী হয়ে গেছে। তিনি প্রত্যেক ভবনকে নিজস্ব স্যুয়ারেজ সিস্টেম ও গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থা রাখার আহ্বান জানান। মন্ত্রী বলেন, প্রত্যেক ভবনের নিচে গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থা রাখুন। যারা অনুমতি নিয়েও রাখেননি তাদের বাধ্য করা হবে। তিনি বলেন, বিভিন্ন বাণিজ্যিক এলাকায় ভবন ফাঁকা থাকলেও আবাসিক এলাকাগুলোর অ্যাপার্টমেন্টে অফিস করা হয়েছে। এর অন্যতম কারণ খরচ বাঁচানো। বাণিজ্যিক এলাকায় ভবন ভাড়া কিছুটা বেশি। তিনি ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। আবাসিক এলাকা থেকে বাণিজ্যিক ভবন বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সরাতে শিগগিরই মেয়র ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান মন্ত্রী।
রাজউকের গণশুনানীতে যত
অভিযোগ চেয়ারম্যানের ঘাড়ে
অভিযোগের স্তূপ পড়ে যায় দুদকের দিনব্যাপী গণশুনানিতে। বাদী-বিবাদীর যুক্তিতর্ক চলার সময় সংক্ষুব্ধদের হাততালি আর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় ভিন্ন রকম পরিবেশ সৃষ্টি হয় মিলনায়তন জুড়ে। খানিকটা উত্তেজনাও ছড়িয়ে পড়ে। তবে সঞ্চালকের অনুনয় বিনয় পরিস্থিতিকে শান্ত করে। জায়গার সমস্যা নিয়ে কেউ বছরের পর বছর রাজউকে ঘুরেছেন। সমাধান পাননি। কারো ফাইল হারিয়ে গেছে। কর্মকর্তাদের কেউ কথাই বলেন না। অবশ্য চাহিদা অনুযায়ী অর্থ দিলে অবস্থা ভিন্ন। কর্মকর্তারাও কথা বলেন। ফাইলও চলে দ্রুত। রাজউকের সেবা নিয়ে গণশুনানিতে এভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সেবাবঞ্চিতরা। রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে সম্প্রতি দুদকের গণশুনানিতে ভুক্তভোগীদের একের পর এক অভিযোগে বিদ্ধ হন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন রাজউকে ভোগান্তির বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, রাজউক সঠিকভাবে প্ল্যান করে। কিন্তু দেখা যায়, প্রতিটি বিল্ডিংয়ে তা ঠিকঠাক প্রয়োগ হচ্ছে না। প্রতিটি বাড়ি তৈরির ক্ষেত্রেই তো রাজউক ফিতা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না। এক্ষেত্রে নাগরিকদেরই দায়িত্ব নিতে হবে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর গণশুনানির কার্যক্রম শুরু হয়। এতে মঞ্চের বামদিকে বসেন ভুক্তভোগী জনগণ। ডানপাশে ছিলেন রাজউকের কর্মকর্তারা। মাঝে বসে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আখতার হোসেন ভুঁইয়া। গণশুনানি চলাকালে দর্শক সারিতে ছিলেন দুদকের চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামান ও রাজউকের চেয়ারম্যান জি এম জয়নাল আবেদীন ভূঁইয়া। উপস্থিত ছিলেন দুদকের কমিশনার (তদন্ত) মোঃ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু, কমিশনার (অনুসন্ধান) নাসিরউদ্দীন আহমেদ, সচিব আবু মোঃ মোস্তফা কামাল, মহাপরিচালক জিয়াউদ্দীন আহমেদ, মহাপরিচালক ড. মোঃ শামসুল আরেফিন, ঢাকা বিভাগীয় পরিচালক মোঃ নাসিম আনোয়ারসহ কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সম্প্রসারিত উত্তরা আবাসিক এলাকায় প্লট বরাদ্দ নিয়ে ভুক্তভোগী সাবেক সরকারি কর্মকর্তা আবদুর রশিদ খান অভিযোগ করে বলেন, উত্তরায় রাজউকের তৃতীয় প্রকল্পে ১৭ এইচ প্লট বরাদ্দ পাই। কিন্তু প্রায় ২০ বছর ঘুরেও প্লট বুঝে পাইনি। তিনি বলেন, সরকার থেকে পেনশনের যে টাকা পেয়েছি তা প্লটের পেছনে শেষ করেছি। রাজউকের প্রতিটি ফ্লোরে ঘুরেও কোনো সমাধান পাইনি। রাজউকের প্রতি টেবিলে টেবিলে টাকা ঢালতে হয়। রাজউকে একটি নথি দেখতে ৬০ হাজার টাকা লাগে। আবদুর রশিদের এমন বক্তব্যে সঞ্চালক রাজউকের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে তার প্লটের বিস্তারিত তথ্য নিয়ে মাস দুয়েকের মধ্যে সমাধানের আশ্বাস দেয়া হয়। ২০০০ সালে রাজউকের উত্তরা প্রকল্পের ৪১ নম্বর প্লট পান প্রবাসী ডা. রেজাউল আহসান। জমির খাজনা ও দখল থাকা সত্ত্বেও তিনি দেশে এসে দেখেন, তার প্লটে ৪৩ নম্বর প্লটের মালিক ছয়তলা ভবন করে ফেলেছেন। তিনি বলেন, রাজউকের কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ করেও কোনো সুরাহা পাইনি। এ বিষয়ে উপস্থিত ওই এলাকার দায়িত্বে থাকা রাজউকের উপ-পরিচালক বাবুল মিয়া বলেন, আমি সরেজমিনে গিয়ে দেখেছি। ওই এলাকায় একটি মসজিদ নির্মাণের সময় বেশি জমি নেয়ায় সকলের প্লট সরে যায়। ফলে একটি প্লট নষ্ট হয়ে গেছে। সে জন্যই এ সমস্যা তৈরি হয়েছে। তাই এখন তাকে অন্য জায়াগায় প্লট দেয়া ছাড়া উপায় নেই। বাড্ডা অঞ্চলের বাসিন্দা মোঃ শহিদুল্লাহ ক্ষতিগ্রস্ত মালিক হিসেবে প্রাপ্ত প্লট বুঝে না পাওয়ার অভিযোগ তুলে ধরে বলেন, ১৯৮৭ সালে ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে আমাদের রাজউক থেকে বাড্ডা এলাকায় প্লট পাওয়ার কথা ছিল। তৎকালীন সময়ে সরকার আমাদের জমি অধিগ্রহণ করে নিয়ে রাউজক থেকে আড়াই কাঠা প্লট বুঝিয়ে দেয়ার কথা। কিন্তু ২৮ বছর পার হলেও রাজউক প্লট বুঝিয়ে দেয়নি। আমার শ্বশুর ওই প্লটের জন্য রাজউকের দ্বারে দ্বারে ঘুরে মারা গেছেন। এখন ওয়ারিশরাও কি বঞ্চিত হবেন? এ সময় রাউজকের পক্ষে উপ-পরিচালক ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী বলেন, বাড্ডা এলাকায় ঢাকা ডিসি অফিসের সঙ্গে রাজউকের জমি নিয়ে কিছু ঝামেলা থাকার কারণে রাজউক এখনও ওই এলাকার জমি বুঝে পায়নি। অপেক্ষা করুন। শিগগিরই প্লট বুঝিয়ে দেয়া হবে। এর উত্তরে মোঃ শহিদুল্লাহ বলেন, ২৮ বছর পার হয়ে গেছে, আর কতো বছর অপেক্ষা করতে হবে? উত্তরা থেকে আসা হুমায়ুন কবির বললেন, শুধু আশ্বাস দিলে হবে না। দুদককে গণশুনানির পর ফলোআপ রাখতে হবে। তা না হলে এগুলো কেবল সমাধানের আশ্বাসে থাকবে, বাস্তবায়ন হবে না। গণশুনানিতে রাজউক অফিসে প্লটের অর্থ জমা দেয়া সত্ত্বেও প্লটের দখল পেতে হয়রানি, ভূমির ছাড়পত্র বা নকশা অনুমোদনে হয়রানির শিকার হওয়া, ক্রয়সূত্রে বা উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা হন্তান্তর বা নামজারির ক্ষেত্রে হয়রানিসহ বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরেন ভুক্তভোগীরা।
