তত্বাবধায়কের দলীয় প্রভাব আর ঠিকাদারদের মামলা জটিলতায় চাঁদপুর ২৫০ শয্যার হাসপাতাল

0
430

এম শাহীন আলম : (১ম পর্ব) খোদ তত্বাবধায়কের সরকার দলীয় প্রভাব সকল টেন্ডারে অনিয়মের মধ্য দিয়ে নিজস্ব আধিপত্য আউটসোর্সিং লোক নিয়োগে ঠিকাদারদের সাথে যোগসাজশ সহ আদালতে মামলা/রিট জটিলতায় সহ নানান সমস্যা আর অনিয়মের মধ্যে চলছে চাঁদপুর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতাল। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো থাকায় চাঁদপুরের বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী লক্ষীপুর এবং শরিয়তপুরের বেশ কয়েকটি উপজেলার রোগীরা এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। এতে প্রতিদিন ব্যাপক রোগীর চাপ থাকে। এরকম পরিস্থিতিতে রোগী সেবার নামে বাণিজ্য, দালাল নির্ভরতা,রোগীর সঙ্গে নার্সদের দুর্ব্যবহার,কতিপয় কিছু চিকিৎসকের ইচ্ছামতো হাসপাতালে আসা ও চলে যাওয়া নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা যায়,চিকিৎসক ও কর্মকর্তারা কেউ কেউ রুমে না থাকলেও তাদের রুমের এসি-ফ্যান অনবরত চলতে থাকে। ওষুধের স্লিপ পেয়েও ওষুধ না পেয়ে রোগীর ফেরত যাওয়ার ঘটনা অহরহ ঘটছে, কোন নিয়মনীতি ছাড়াই দেদারছে ঔষধ কোম্পানীর লোকদের পদচারণা আধিপত্য এবং ঔষধের স্লীপ/ব্যবস্হাপত্র নিয়ে টানটানিতে অতিষ্ঠ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী এবং তাদের স্বজনেরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও কাঙ্খিত চিকিৎসা সেবা না পাওয়ার অভিযোগ প্রতিদিন, অফিস চলাকালীন সময়ে প্রায় চিকিৎসকদের তার চেয়ারে না থাকার বিষয়টিও চোখে পড়ার মতো।

Advertisement


এছাড়াও চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অভিযোগ,চাঁদপুর জেলার ২৬ লাখ মানুষের চিকিৎসা সেবার বৃহৎ এই হাসপাতালটি। প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক হাজারের অধিক রোগী অউটডোরে চিকিৎসা নিচ্ছে। ২৫০ শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন গড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ রোগী ভর্তি হচ্ছে যার অধিকাংশ রোগীকে মেঝেতে থাকতে হচ্ছে।  পাশাপাশি এ হাসপাতালে রোগীর চাপে অবস্থা এমন হয়েছে একজন রোগীকে শত শত মানুষের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কাটতে হচ্ছে। টিকিট কাটার পর চিকিৎসক দেখানোর জন্য ফের লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘন্টা। সরেজমিনে দেখা যায,আউটডোর/বর্হিবিভাগে প্রায় চিকিৎসকরা বেলা ১১টার আগে হাসপাতালে আসেন না। অনেকেই ১২টার পরও আসেন।

সব সহকর্মীর একই উত্তর চিকিৎসক রাউন্ডে আছেন। সদর হাসপাতালের আউটডোরে নিয়মিত রোগী না দেখলেও তাদের ব্যক্তিগত চেম্বারে চিকিৎসকরা খুব গুরুত্বসহকারে সময়মতো রোগী দেখেন। এছাড়াও দেখা যায় ডাক্তারদের কেউ কেউ হাসাপাতালে সরকারি ভাবে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদেরও প্রাইভেট হাসপাতালের ভিজিটিং কার্ড হাতে ধরিয়ে দিয়ে পরবর্তী সাক্ষাৎ করতে জানিয়ে দেয়, হাসপাতালে নানা রোগের পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকার পরও রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য হাসপাতালের সামনের ডাক্তারদের নির্ধারিত ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানো হচ্ছে।

 আর এসব প্যাথলজি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ইচ্ছামতো নানা পরীক্ষা করার অভিযোগও রয়েছে। হাসপাতালে আসা একাধিক রোগী অভিযোগ করে বলেন,ডাক্তারদের পচন্দের ডায়াগণস্টিক সেন্টারে প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা না করালে তারা মন-ক্ষুন্ন হয়ে থাকে ভালো ভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষার কাগজ দেখতেও অনীহা প্রকাশ করে নানান কথা বার্তা বলেন,

চাঁদপুর বাবুরহাট থেকে টিউমার রোগ নিয়ে আসেন শাহাআলম পাটোয়ারী। তার অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় তিনি হাসপাতালের বেডে কাতরালেও সার্জিক্যাল চিকিৎসক ওই রোগীকে সিরিয়াল মতো দু-সপ্তাহ পরে অপারেশন করবেন বলে জানিয়ে দেন। বাধ্য হয়ে ওই রোগীর স্বজনা শহরের প্রাইভেট হাসপাতালে রোগীকে নিয়ে দ্রুত অপারেশন করান।

চাঁদপুর পুরান বাজার এলাকার বাসিন্দা রফিক বলেন, আমি আউটডোরে টিকিট কেটে আমার মেয়েকে এক মেডিক্যাল অফিসার ডাক্তারকে দেখাই তিনি এক্সে পরীক্ষা দিয়ে হাসপাতালের বাহিরে ফেমাস ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠান এক্সরে করার জন্য। সেখানে আমার কাছ থেকে একটি এক্সের জন্য ১১শ টাকা রাখে,তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমরা সরকারি হাসপাতালে আসি টাকা কম খরচ হবে বলে,কিন্ত এখানে চিকিৎসা নিতে এসে ডাক্তাররা অহেতুক পরীক্ষা নিরীক্ষা দেওয়ার কারণে প্রাইভেট হাসপাতালের মতোই টাকা খরচ করতে হয়, তিনি আরো জানান ব্যবস্থাপত্র ফ্রি দিলেও বিভিন্ন প্যাথলজি টেস্ট দিয়েই রোগীদের সর্বশান্ত করে দেয় চাঁদপুর সদর হাসপাতালের ডাক্তাররা।

সরেজমিন দেখা যায়,ডাক্তাররা রোগীদের ফ্রি চিকিৎসা সেবা দিলেও প্যাথলজি টেস্ট দিয়ে রোগীদের সর্বশান্ত করে দেয়,বেশ কয়েকজন রোগী এবং তাদের স্বজনরা অভিযোগ করে বলেন,কোন রোগীকে পরীক্ষা ছাড়া ঔষধ লিখেন না চাঁদপুর সদর হাসপাতালের ডাক্তাররা, তারা রোগীদের প্যাথলজিক্যাল টেস্ট দিয়ে তাদের পচন্দের ফেমাস ও মিম ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে পরীক্ষা করারও পরামর্শ দেন। চাঁদপুর সদর হাসপাতালের ইনডোরে কিছু সময় থাকলে বুঝা যাবে ফেমাস এবং মীম ডায়াগণস্টিক সেন্টার গুলো যেন চিকিৎসক আর নার্সদের নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা যায়,হাসপাতালটির তত্বাবধায়ক এ কে এম মাহাবুবুর রহমান আসার পর থেকে তার নিজ জেলা চাঁদপুর হওয়ায় তিনি সরকার দলীয় প্রভাব খাঁটিয়ে সরকারি নিয়ম-নীতির  তোয়াক্কা না করে তার ইচ্ছা মতো হাসপাতালের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে,এবং সব জায়গায় শিক্ষামন্ত্রীর খুব কাছের স্বজন বলে দাবী করে,এবং হাসপাতালের সকল টেন্ডারে তার পচন্দের লোকদের অনিয়মের মাধ্যমে বার বার নিয়ে দেওয়া সহ বেশ কয়েকটি অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে,

সরেজমিনে অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, এই হাসপাতালে গত অর্থ বছরে আউটসোর্সিং এ নিয়োগে প্রাপ্ত ওয়ার্ড বয়,দারোয়ান আয়া,পরিচ্ছন্নকর্মীর মতো ৪র্থ শ্রেণির প্রায় অর্ধশতাধিক লোক নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন,এসব লোকজন নিয়মিত কাজ করলেও একাধিক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের টেন্ডার ভাগাভাগি নিয়ে আদালতে মামলা/রিট জটিলতার কারণে গত বেশ কয়েক মাস ধরে তারা বেতন না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন,চাঁদপুর সদর হাসপাতালে কর্তব্যরত আউটসোর্সিং এ পূর্বে নিয়োগপ্রাপ্ত বর্তমানে কর্তব্যরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন কর্মী জানান,আমরা যারা এখানে কাজ করছি প্রত্যেকেই যে যার মতো বিভিন্ন মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ভবিষ্যতে চাকুরী স্থায়ী করণ প্রলোভনে পড়ে চাকুরী নেই,চাকুরী নেওয়ার পর দেখি এটা একটা প্রতারণা, তারপরও পেটের দায়ে নিয়মিত ডিউটি করে যাচ্ছি,
বেতনের বিষয়ে জানতে চাইলে তারা বলেন, যখন আমাদের নিয়োগ দেয় তখন বলেছিলেন সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ১৬,১৩৫ বেতন দিবেন,কিন্তু মাস শেষে বেতনের ম্যাসেজ পাই সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তবে আমাদের কাছ থেকে আগেই কোন কিছু লিখা ছাড়া (ব্লাইং ব্যাংক চেক) সাক্ষর নিয়ে থাকেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরে তারা চেক দিয়ে টাকা উঠিয়ে হাতে হাতে প্রতি মাসে মাত্র ১০ হাজার টাকা বেতন দেন,এই দশ হাজার টাকা বেতনও গত কয়েক মাস ধরে আমরা পাচ্ছি না,ভোক্তভোগী কর্মীরা জানান, টিকাদারদের নিয়মিত টেন্ডার ভাগাভাগিতে আদালতে মামলা/রিট জটিলতার কারণে আমরা গরীব মানুষের পেটে লাথি,আমরা বর্তমানে বেশ কয়েক মাস ধরে ডিউটি করলেও বেতন না পেয়ে পরিবার নিয়ে খুব কষ্টের মধ্যে দিন পার করছি,


সরেজমিনে সার্বিক বিষয়ে জানতে চেয়ে চাঁদপুর সদর হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. এ কে এম মাহবুবুর রহমান এর চেম্বারে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি সারাদিন তার অপেক্ষায় বসে থেকে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলেও তিনি গণমাধ্যম প্রতিনিধির সাথে সরাসরি দেখা করে প্রথমে রাজি হননি পরক্ষণে তিনি মোবাইল ফোনে জানান,তার সাথে দেখা করতে হলে পর দিন আসার জন্য,এই হাসপাতালের বিষয়ে কোন নিউজ না করতে অপরাধ বিচিত্রা’র সম্পাদক এস এম মোরশেদ সাহেবকে মোবাইল ফোনে একাধিকবার তদবির করা হয় বলে জানা যায়, অনুসন্ধান অব্যাহত, অনিয়মের বিস্তারিত পরের সংখ্যায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করা হবে।

Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here