দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের বিদ্যমান আইন ‘দ্য চিটাগং পোর্ট অথরিটি অর্ডিন্যান্স-১৯৭৬’ সংশোধন প্রক্রিয়া এখন শেষ পর্যায়ে। প্রস্তাবিত আইনে বন্দরের বিভিন্ন ধরনের টোল, ফি, মাশুল বা ক্ষতিপূরণ ফাঁকিচেষ্টার দণ্ড দ্বিগুণ বাড়িয়ে এক লাখ টাকা ও এক মাসের কারাদণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে। আর চট্টগ্রাম বন্দর এলাকার পানি ও নদী দূষণের দণ্ড পাঁচগুণ বাড়িয়ে দেশি জাহাজের জন্য পাঁচ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর বিদেশি জাহাজের জন্য তা ৫০ গুণ বাড়িয়ে পঞ্চাশ লাখ টাকা করা হয়েছে।
পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ দেয়ার বাধ্যবাধকতাও রাখা হয়েছে। এ ছাড়া খসড়া আইনে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে। বন্দরের টোল, ফি, জরিমানা পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত মওকুফ করতে পারবে কর্তৃপক্ষ। বার্থ, টার্মিনাল বা শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর নিয়োগের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। বন্দরের কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার্থে যে কোনো কমিটি গঠনের এখতিয়ার কর্তৃপক্ষের হাতে দেয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম বোর্ডের সার্বক্ষণিক সদস্য সংখ্যা ৪ জন থেকে বাড়িয়ে আটজন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। যদিও এ বিধান নিয়ে বন্দর প্রশাসনের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। নৌ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। আইন সংশোধনের বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান কমডোর জুলফিকার আজিজ যুগান্তরকে বলেন, বন্দরের কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং অনেক বেড়েছে। পাশাপাশি বন্দরে পণ্য আমদানি ও রফতানিও বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আইন যুগোপযোগী করতে বেশকিছু ধারা-উপ-ধারায় সংশোধনীর প্রস্তাব চট্টগ্রাম বন্দর বোর্ড অনুমোদন করে তা নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত আইনে বেশ কয়েকটি ধারায় দণ্ডের বিধান কঠোর করা হয়েছে। জানা গেছে, প্রস্তাবিত ‘চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন-২০১৮’-এর খসড়া চূড়ান্ত করে তা মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এতে ৬৩টি ধারা রয়েছে। এর মধ্যে ৯টি ধারা নতুন সংযোজন করা হয়েছে; যেখানে ১০টি নতুন সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিদ্যমান ‘দ্য চিটাগং পোর্ট অথরিটি অর্ডিন্যান্স-১৯৭৬’-এর ১৯টি ধারা হুবহু বাংলা অনুবাদ করে প্রস্তাবিত আইনে রাখা হয়েছে। ওই অর্ডিন্যান্সের ৩৫টি ধারায় সংশোধনী আনা হয়েছে। এতে বন্দর আইনের যে কোনো ধারা ও উপ-ধারা লঙ্ঘনের ঘটনায় সাজাও বাড়ানো হয়েছে। প্রস্তাবিত আইনের ৪২ ধারায় আইন ও বিধি লঙ্ঘনকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে ৬ মাস কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। বর্তমানে এ অপরাধে ৬ মাস কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। দূষণের দণ্ড বাড়িয়ে আইনের ৪৩ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির দেশীয় জাহাজ যদি বন্দর সীমানার মধ্যে পানিতে, সৈকতে, তীরে বা ভূমিতে কোনো ছাই, বর্জ্য বা তেলজাতীয় কিছু নিক্ষেপ করায় দূষণ হয় তবে পাঁচ লাখ টাকা অর্থ দণ্ডে দণ্ডিত হবে এবং ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবে। অপরদিকে বিদেশি জাহাজ এ অপরাধ করলে সর্বনিু পাঁচ লাখ ও সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা জরিমানা ও ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিধান রাখা হয়েছে। আইনের ৪৪ ধারায় বন্দরের প্রাপ্য ভাড়া, ফি, টোল, রেট, মাশুল বা ক্ষতিপূরণ ফাঁকি দেয়ার চেষ্টা করলে সর্বোচ্চ এক মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আরও জানা গেছে, বিদ্যমান অধ্যাদেশের ৬ ধারা সংশোধন করে চট্টগ্রাম বন্দরের বোর্ডে সার্বক্ষণিক সদস্য সংখ্যা ৮ জন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে তিনজন মেম্বার ও একজন চেয়ারম্যান নিয়ে বোর্ড রয়েছে। বন্দরের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বোর্ডের সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বোর্ডসভার কোরাম মোট সদস্যের এক-তৃতীয়াংশ করা হয়েছে। যদিও এ ধারা নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর ও নৌ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। বন্দর সংশ্লিষ্টরা জানান, মেম্বার ৮ জন করা হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেবে। এতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হতে পারে। এর প্রভাব পড়বে বন্দরের পণ্য আমদানি-রফতানি প্রক্রিয়ায়। বর্তমান পলিসি অনুসারে তিনজন মেম্বার যথেষ্ট বলে মনে করেন তারা। অপরদিকে আরেকটি পক্ষ মনে করে, মেম্বার সংখ্যা বাড়ানো হলে কাজের গতি বাড়বে। অনেক ছোটখাটো সমস্যা মেম্বাররা সমাধান করতে পারবেন। এ ছাড়া প্রস্তাবিত আইনের ৫ ধারায় বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রাম ও শাখা কার্যালয় ঢাকাসহ যে কোনো স্থানে স্থাপনের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। ৯ ধারায় বন্দরের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য বিভিন্ন কমিটি গঠনের ক্ষমতা বন্দর কর্তৃপক্ষকে দেয়া হয়েছে। ১৩ ধারায় বন্দরকে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণায় প্রথমবারের মতো ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এতে সর্বসাধারণের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রস্তাবিত আইনেও বন্দরের ভাড়া, জরিমানা, কর, টোল মাশুলসহ অন্যান্য পাওনা পরিশোধ না করলে অথবা পণ্যের মালিক পাওয়া না গেলে দুই মাস সময়ের পর নির্দিষ্ট পন্থা অবলম্বন করে ওইসব পণ্য নিলামে বিক্রির মাধ্যমে টোল আদায়ের বিধান বহাল রাখা হয়েছে। বন্দরের পাওনা পরিশোধ না করলে যে কোনো জাহাজ ত্যাগে নিষেধাজ্ঞার বিধানও রাখা হয়েছে।
