বিশেষ প্রতিবেদক ঃ
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর থেকেই শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া শুরু হয়। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত হবার হিড়িক পড়ে। এ নিয়ে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। এবার জালিয়াতির মাধ্যমে যুদ্ধাহত সেজে আখের গুছাবার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ মিলেছে। তবে এ সরকারের মেয়াদে নয়; দীর্ঘ তিন দশক ধরেই চলছে অপকর্ম। এ অভিযোগ ওঠেছে খোদ রাজধানীর এক নন্দিত-নিন্দিত মুক্তিযোদ্ধার নামে। রাজধানীর মিরপুর এলাকায় তিনি ‘লাট ভাই’ হিসেবে পরিচিত। তিনি হলেন ঢাকা জেলা সাবেক কমান্ডার এবং বর্তমানে ঢাকা মহানগর ইউনিট কমান্ডার আমির হোসেন মোল্লা। অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বছরাধিককালেও তদন্তের কোনো অগ্রগতি নেই। ভাতা বন্ধ রাখা হলেও তা নিয়ে রয়েছে গুঞ্জন।
অনুসন্ধান আর সংশ্লিষ্টদের অভিযোগে আমির হোসেন মোল্লার যুদ্ধাহতের দাবি আর বৈষয়িক উত্থান নিয়ে চমকপ্রদ তথ্য মিলেছে। জানা গেছে, মুক্তিযোদ্ধা নাম ভাঙ্গিয়েই তিনি একের পর এক অপকর্ম করে চলেছেন। তার বিরুদ্ধে রয়েছে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি আর দখলদারিত্বের অভিযোগ। তার দখলী থাবা থেকে রেহাই পাননি উচ্চ আদালতের বিচারপতিও। এসব ঘটনায় একাধিকবার হাজত খাটলেও তার খাসলত বদলায়নি। বরং যুদ্ধাপরাধ মামলায় সাক্ষি হবার সুবাদে দাম্ভিকতা বেড়েছে শত গুণ। একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে অর্থ লিপ্সা।
দুয়ারীপাড়া ১নং রোডে আমির হোসেন মোল্লার আলীশান বাড়ি
নন্দিত-নিন্দিত
বর্তমান সরকারের একটি অন্যতম কীর্তি হলো একাত্তরের মানবতা বিরোধী অপরাধীদের বিচার। এ কার্যক্রমে অংশ নিয়ে ইতিহাসের খাতায় নাম লিখিয়েছেন আমির হোসেন মোল্লা। তিনি হলেন প্রথম ফাঁসির দন্ডাদেশ পাওয়া জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের ৯ নম্বর সাক্ষি। তার আগে মিরপুরের আলব্দী গ্রামের গণহত্যার অভিযোগে ২০০৮ সালে ২৩ জানুয়ারি আদালতে প্রথম পিটিশন মামলা দায়ের করে তিনি সবার নজর কাড়েন। তবে আলোর নিচে অন্ধকার নীতির ন্যায় আমির হোসেন মোল্লার ব্যক্তি জীবনেও রয়েছে কালিমা। ২০০১ সালের ১৩ ডিসেম্বর অস্ত্রসহ গ্রেফতার হয়েছিলেন। তাছাড়া বর্তমান সরকারের আমলেই ২০১২ সালের মে মাসে হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতির জায়গা দখল করতে গিয়ে ধরা পড়ে কারাভোগ করেন। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভূমিদখল আর সন্ত্রাসের বহু অভিযোগ রয়েছে। তবে সব কিছু ছাপিয়ে গুরুতর অভিযোগ হচ্ছে যুদ্ধাহত হবার দাবি। অভিযোগ মতে, আমির হোসেন মোল্লা কোনো যুদ্ধে আহত হননি। অথচ যুদ্ধাহত সেজেই মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে নিয়মিত ভাতা নিয়েছেন। পেয়েছেন রাষ্ট্রের অনেক সুযোগ-সুবিধা ও আনুকূল্য।
যুদ্ধাহতের জাল সনদ
যুদ্ধাহত হিসেবে ১৯৮৭ সাল থেকে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের ভাতা পাচ্ছেন আমির হোসেন মোল্লা। ভাতা পাবার আবেদনের সঙ্গে তিনি ১৯৭২ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার সনদ জমা দিয়েছিলেন। কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার অভিযোগ, আমির হোসেন মোল্লার যুদ্ধাহত হবার দাবি নিয়ে সন্দেহ ছিল শুরু থেকেই। কিন্তু ধুরন্ধর আমির হোসেনের কৌশলের কাছে কেউ টিকতে পারেননি। মিরপুরে তাদের পরিবারকে বলা হয় সর্বদলীয়। তার এক ভাই আমজাদ হোসেন বিএনপি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আরেক ভাই খলিল হোসেন জাতীয় পার্টি করেন। ফলে আমির হোসেন মোল্লা সব সরকারের আমলেই প্রিয়ভাজন। কাজেই তার জালিয়াতির বিষয়ে অভিযোগ করেও কোথাও প্রতিকার মিলেনি। কথায় আছে-সত্যের কল বাতাসে নড়ে। অনুরূপ বর্তমান সরকারের কাছে অভিযোগ করার পরই থলের বিড়াল বেরিয়ে এসেছে। জানা গেছে, আমির হোসেন মোল্লা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণের যে সনদ জমা দিয়েছেন সেটি মুদ্রণ হয়েছে ১৯৭৫ সালে। অথচ চিকিৎসা করিয়েছিলেন ১৯৭১ সালের ১৮ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭২ সালের ১৯ জুন পর্যন্ত।
জালিয়াতি ফাঁস হলো যেভাবে
যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে রাষ্ট্রের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা আদায় আর একের পর এক অপকর্মের কারণে আমির হোসেন মোল্লাকে নিয়ে আলোচনা দীর্ঘদিনের। তবে নানা কৌশল আর ম্যানেজ প্রক্রিয়ায় সব কিছু ধামাচাপা রেখেই মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর ছড়ি ঘুরিয়েছেন তিনি। তার অবৈধ অর্থ আর কূটচালে অসহায় ছিল প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা। তবে বর্তমান মন্ত্রী আ.ক.ম. মোজাম্মেল হক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেয়ার পরই সাহস ফিরে পান বিক্ষুব্ধ মুক্তিযোদ্ধারা। তাদের ভরসা ছিল মুক্তিযোদ্ধাবান্ধব মন্ত্রীর ন্যায়নিষ্ঠ আর সততা। এর উপর ভর করেই ঢাকা মহানগর ইউনিট কমান্ডের ডেপুটি কমান্ডার (রাষ্ট্রীয় সম্মানী ভাতাপ্রাপ্ত যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা) মোঃ লুৎফর রহমান ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। এতে মিথ্যা তথ্যের মাধ্যমে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা সেজে সরকার প্রদত্ত সুযোগ-সুবিধা গ্রহণের সুষ্ঠু তদন্ত এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
এদিকে আমির হোসেন মোল্লার চিকিৎসা সনদ যাচাইয়ের জন্য ওই বছরের ১৫ নভেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বরাবর আবেদন করেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ওই আবেদনের জবাব দেয় ২০১৫ সালের ১০ ডিসেম্বর। ঢামেক হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. মোঃ আবদুল গনি স্বাক্ষরিত ঢামেকহা/রেকর্ড/১৫/২০২৬৯ স্মারকমূলে জবাবে বলা হয়, “আমির হোসেন, পিতা মোহাম্মদ সুজাত আলী মোল্লাহ, গ্রাম-দুয়ারীপাড়া (দাসপাড়া), ডাকঘর-মিরপুর মাজার শরীফ, জেলা ঢাকার নামে উপস্থাপিত ছাড়পত্রটি পর্যালোচনা ও যাচাই করে দেখা যায় যে, ছাড়পত্রটি বাংলাদেশ সরকারী মুদ্রণ হইতে নং-ইডি (ওএন্ডএন)-৭৭/৭৫-৫১৪, তাং ৮-৫-৭৫, বা.স.মূ.(জে) ৬ক নং ১০২৫৯/৭৪-৭৫-৮,০০,০০০ কপি ১৯৭৫ সালে ছাপানো হয়। কিন্তু ছাড়পত্রটিতে উল্লিখিত রোগী অত্র হাসপাতালে ১৮.১২.১৯৭১ খ্রি. তারিখ হইতে ১৯.০৬.১৯৭২ খ্রি. পর্যন্ত ভর্তি দেখানো হয়েছে। এমতাবস্থায় কিভাবে ছাড়পত্র অথবা চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন তা বোধগম্য নহে।”
অন্যদিকে ২০১৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৃথক অভিযোগ দায়ের করা হয়। তাতে ঢাকা মহানগর ইউনিট কমান্ডার আমির হোসেন মোল্লার ক্ষমতার অপব্যবহার, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বানানো, মিরপুর মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের জমি দখল ও প্লট আকারে বিক্রি, কলেজ গেটের মুক্তিযোদ্ধা আবাস-১ এ ফ্ল্যাট অবৈধভাবে অমুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে দখল প্রদান ও নিজে অবৈধভাবে দখলসহ নানা অপকর্মে জড়িত থাকার বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানানো হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ২০১৬ সালের ১০ জানুয়ারি তদন্ত করে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনাসহ অভিযোগটি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সচিবের কাছে পাঠানো হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক মোঃ নূরুল আলম স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত পত্র সংখ্যা হচ্ছে ০৩.০৭৭.০১.০২৭.০০.০২.২০১৩ (অংশ-১)-০৬। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ.ক.ম. মোজাম্মেল হক নির্দেশনা দেন ১৬ জানুয়ারি ২০১৬। এরপর থেকে ওই নির্দেশনার আর কোনো অগ্রগতি নেই। তবে মন্ত্রীর নির্দেশে গত বছরের এপ্রিল থেকে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট আমির হোসেন মোল্লার ভাতা প্রদান বন্ধ করে দিয়েছে।
আরো যতো অভিযোগ
আমির হোসেন মোল্লা ২০১০ সালের ২৬ জুন ঢাকা মহানগর ইউনিট কমান্ডার নির্বাচিত হন। এরপর থেকেই তার স্বোচ্ছাচারিতা আর অপকর্ম কয়েকগুণ বেড়ে গেছে বলে ঘনিষ্ঠদের অভিযোগ। কমান্ডার নির্বাচিত হবার পর প্রথমেই কুনজর পড়ে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্মিত মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স। সহযোগী মোস্তফা কামালের সাথে যোগসাজশ করেই কমপ্লেক্সের জমি দখল এবং পরে তা প্লট আকারে বিক্রি করে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। কমান্ডার হবার সুবাদেই ‘মুক্তিযোদ্ধা’ বানাবার দোকান খুলে বসেন আমির হোসেন মোল্লা। মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে তিনি অনেক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাকে সাময়িক সনদ পাইয়ে দেন। এমনকি অনেকের নাম গেজেটভুক্ত করিয়েছেন। আলোচিত ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের একজন হচ্ছেন ঢাকার ধামরাই উপজেলার মৃত আবদুল হাই মিয়ার ছেলে আবু সাঈদ মিয়া। কয়েক লাখ টাকার বিনিময়ে তাকে প্রথমে সাময়িক সনদ এবং পরে লাল মুক্তিবার্তার তার নাম ওঠিয়ে দেন। ২০১৪ সালের ৪ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অংশ নিয়ে আবু সাঈদ ঢাকা জেলা কমান্ডের কমান্ডার নির্বাচিত হন। এছাড়া চিহ্নিত রাজাকার মিরপুরের ক্যাপিটাল টাওয়ার ও দক্ষিণ বিশিল বিদ্যা নিকেতনের মালিক মহসিনকে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে মুক্তিযোদ্ধা বানান আমির হোসেন মোল্লা। এ সুবাদে দক্ষিণ বিশিল বিদ্যা নিকেতনের অংশীদার বনেন তিনি। পরে ওই স্কুলের তহবিল থেকে প্রায় দেড় কোটি টাকা আত্মসাত করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া টাকার বিনিময়ে মুন্সীগঞ্জের সেলিমসহ আরো অনেককে মুক্তিযোদ্ধা বানান মোল্লা। অবৈধ টাকায় প্রভাব বৃদ্ধি ছাড়াও ব্যাপক বৈষয়িক সম্পদ গড়ে তুলেছেন তিনি। দুয়ারীপাড়ায় কালো টাকার ডিপোর মালিক আমির হোসেনের রয়েছে আলীশান বাড়ি। প্রদর্শিত আয়ের সঙ্গে তার স্থাবর অস্থাবর সম্পদের বাস্তবসম্মত মিল নেই। দুর্নীতি দমন কমিশন বা রাষ্ট্রায়ত্ব দায়িত্বশীল সংস্থার সৎ কর্মকর্তারা তার অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করলে চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে স্থানীয়দের দাবি।
মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ.ক.ম. মোজাম্মেল হক বলেন, অভিযোগ যাচাইয়ে সত্যতা পাবার পর গত বছরের এপ্রিল থেকে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে আমির হোসেন মোল্লার ভাতা প্রদান বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এর আগে গত বছরের ১৬ জানুয়ারি সংশ্লিষ্ট বিভাগকে দেয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা। ওই নির্দেশনার আর কোনো অগ্রগতি না হওয়ার কারণ সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, ুধঅপরাধ সন্ধেহাতিতভাবে প্রমাণিত হলে পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই মন্ত্রণালয় কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

