যশোরে হঠাৎ করেই চাকুবাজরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। বার্মিজ, পেঙ্গুইন, মাছরাঙা—এই তিন চাকুর নামে শহরে কিশোর তরুণদের কয়েকটি বাহিনী তুচ্ছ কারণেই একে অন্যকে চাকু মারছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দুই দিকে ধারালো বার্মিজ চাকু, তীক্ষ ধারালো পেঙ্গুইন চাকু ও মাছরাঙাসদৃশ চিকন ফলার ধারালো চাকু এই চাকুবাজদের কাছে খুব জনপ্রিয়। ছিনতাইকারী দুর্বৃত্তদের পাশাপাশি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও এসব চাকু ব্যবহার করছে। এসব চাকু পুলিশের পক্ষ থেকে বিক্রি নিষিদ্ধ করা হলেও গোপনে শহরের কয়েকটি দোকানে ৫০০ থেকে এক হাজার টাকার মধ্যে এসব চাকু বিক্রি হচ্ছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে যশোর শহরসহ আশপাশের কয়েকটি এলাকায় চাকুবাজদের হাতে একজন নিহত ও কমপক্ষে ৫০ জন আহত হয়েছে। এদের মধ্যে ৩০ জন হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়েছে। এর আগেও ছিনতাইকারী ও দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে যশোরে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ গত শুক্রবার চাকুবাজরা শহরের পুরাতন কসবা কাজীপাড়া এলাকায় সোহাগ নামের এক যুবককে বিভিন্ন স্থানে ছুরিকাঘাত করে নির্মমভাবে হত্যা করে। রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, ছিনতাই, প্রেম, পারিবারিক ও জমি নিয়ে বিরোধে চাকু মারার ঘটনা ঘটছে। যশোর মেডিক্যাল কলেজের মানসিক রোগ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আমিনুর রহমান জানান, মানসিক রোগ—যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় বাইপোলার অ্যাফেকটিভ ডিস-অর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া ডিপ্রেশন, বিষণ্নতা, মেন্টাল ডিস-অর্ডার ইত্যাদি কারণে মানুষ রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে প্রতিপক্ষকে আঘাত করছে। সেপ্টেম্বরে ঘটে যাওয়া ঘটনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে যশোর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ক্যাম্পাসে ৫ সেপ্টেম্বর দুপুরে ছাত্রদের সঙ্গে বহিরাগতদের সংঘর্ষ হয়। এতে কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতিসহ ১২ জন ছুরিকাঘাতে আহত হয়। একই দিন সন্ধ্যার দিকে শহরের চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডের আব্দুর রাজ্জাক কলেজ গেটের সামনে দুই দল ছাত্রদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় চটপটি বিক্রেতা কামরুল ছুরিকাঘাতে জখম হন। গত ৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় শহরের পৌর পার্কে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় দুর্বৃত্তরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রকে ছুরিকাঘাত করে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি শহরের চাঁচড়া ঈসমাইল কলোনিতে পারিবারিক বিরোধে ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন শাশুড়ি জাহানারা বেগম, জামাই সাগর ও প্রতিবেশী লেবু বেগম। গত ১৭ সেপ্টেম্বর চৌগাছা উপজেলার ফুলসারা সৈয়দপুর গ্রামে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে যুবলীগকর্মী জুলকার নাইম আহত হন। এদিকে গত ১৮ সেপ্টেম্বর যশোর শহরের শংকরপুর এলাকায় প্রতিপক্ষের লোকজনের ছুরিকাঘাতে বাপ্পা হোসেন নামের এক ছিনতাইকারী জখম হয়। গত ১৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার দিকে যশোর সদর উপজেলার নওয়াপাড়া ইউনিয়নের পাঁচবাড়িয়া গ্রামে পৈতৃক জমি ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে একই পরিবারের দুই পক্ষের সংঘর্ষে সাতজন ছুরিকাঘাতে আহত হয়। গত ২০ সেপ্টেম্বর পারিবারিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্ত্রীর ছুরিকাঘাতে স্বামী জখম হন। এদিকে গত ২৩ সেপ্টেম্বর যশোরে ওয়াপদা গ্যারেজ মোড়ে ইন্টানেটের লাইন দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে খড়কি এলাকার হানিফ হোসেন নয়ন ও মণিরামপুর এলাকার আব্দুল মাজেদের ছেলে আল মামুন অভি আহত হন। গত ২৫ সেপ্টেম্বর জমি নিয়ে বিরোধের জের ধরে আপন চাচাতো ভাইয়ের হাতে আল আমীন নামের এক যুবক ছুরিকাঘাতের শিকার হন। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে শহরের বেজপাড়া এলাকায় এক বন্ধুর ছুরািকাঘাতে অন্য তিন বন্ধু আহত হন। হাসপাতালের সার্জারি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ওহেদুজ্জামান আজাদ জানান, যশোরে বিভিন্ন ঘটনায় ছুরিকাঘাতে অর্ধশতের বেশি রোগী হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়েছে। এদের মধ্যে বেশির ভাগ তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছুরিকাঘাতের শিকার হয়েছে। এ ব্যাপারে যশোরের সহকারী পুলিশ সুপার (সদর) জুয়েল ইমরান বলেন, ‘হঠাৎ করেই ছুরািঘাতের ঘটনা বেড়েছে। সামনে নির্বাচন। এ জন্য কিছু দুর্বৃত্ত ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে। আমরা তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছি। কয়েকজনকে ধরা হয়েছে। বাকিদেরও আটক করা হবে।’

