এক সময় কৃষি ও মাছ চাষ করার জন্য রেলওয়ের জমি লিজ নেওয়া হয়। দীর্ঘদিন নিজেদের দখলে থাকা সেই জমিতে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় প্রভাবশালীদের। ধীরে ধীরে রেলওয়ের জমি বিক্রি শুরু করে তারা।
বসবাস করার জন্য প্লট আকারে চল্লিশ থেকে ষাট হাজার টাকায় বেচাকেনা হচ্ছে সেই জমি। বিক্রি হওয়া জমিতে উঠছে নতুন নতুন ঘর। এই চিত্র ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন এলাকার। গতকাল বুধবার সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন ঘর নির্মাণের কাজ চলছে। নতুন ঘর তুলে বসবাস শুরু করেছেন কালী প্রদ সাহা। তিনি বলেন, আগে তারা পাটবাজার এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। তার ছেলে হিমেল সাহা স্থানীয় হারিছ উদ্দিনের কাছ থেকে জমিটুকু কিনেছে। তিনি শুধু কাগজে স্বাক্ষর করেছেন, কত টাকা দেওয়া হয়েছে সেটি বলতে রাজি হননি তিনি। কিন্তু স্থানীয়রা জানিয়েছেন, প্রতিটি প্লট ৪০ থেকে ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। রেলওয়ে স্টেশনটির বাম দিকের ওই অংশে আরও অন্তত ২০টি বসতবাড়ি করা হয়েছে। এর মধ্যে স্থায়ী পাকা স্থাপনাও রয়েছে। বাম দিকের অংশে কয়েক বছর ধরে স্থাপনা নির্মাণ কাজ চললেও সম্প্রতি ডান দিকের অংশে বেচা কেনার কাজ শুরু হয়েছে। সাদ্দাম হোসেন নামের এক ব্যক্তি তিনটি প্লট বিক্রি করেছেন। এতে ইতিমধ্যে তিনটি বসত বাড়ি হয়েছে। এর মধ্যে একটি ঘর প্রদীপ গৌঁড় নামের এক রিকশাচালকের। দুই মাস আগে স্ত্রীকে নিয়ে বসতি গড়েছেন প্রদীপ। তিনি বলেন, আড়াই শতক জমি ৪০ হাজার টাকা দিয়ে কিনেছেন সাদ্দামের কাছ থেকে। তাকে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর দিয়ে লিখে দেওয়া হয়েছে। তবে হারিছ উদ্দিন জানান, কৃষি জমির জন্য তিনি ৭০ শতক জমি রেলওয়ের কাছ থেকে লিজ নিয়েছিলেন। গরিব লোকজনকে সামান্য টাকার বিনিময়ে এখানে থাকতে দিচ্ছেন। জমি বিক্রি করেননি। সরকার যখন চাইবে তখন তারা এখান থেকে উঠে যাবে। তিনি আরও জানান, রেলওয়ে স্টেট ডিপার্টমেন্টের লোকজনকে ম্যানেজ করেই সব করছেন। সাদ্দাম হোসেন জানান, তার বাবা হাসানুজ্জামান ললিত ভুঁইয়ার নামে ২০ কাঠা জমি লিজ রয়েছে। ভূমিহীন লোকগুলো থাকার জন্য স্থানীয় কাউন্সিলর ও লোকজনের অনুরোধে সেখানে থাকতে দিয়েছেন। জমি বিক্রি করেন নি। রেলওয়ের জমি বেচা-কেনা হওয়ার বিষয়টি নিয়ে ২০১৬ সালের ২৬ মে সমকালের লোকালয় পাতায় ‘রেলওয়ের জমি বিক্রি হচ্ছে’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এতে তোলপাড় শুরু হলে ২৮ মে রেলওয়ে ভূসম্পত্তি বিভাগের সার্ভেয়ার মো. ফায়েজ উদ্দিন ঘটনাটি তদন্তের জন্য সরেজমিনে যান। ওই সময় তিনি ১৭ জন দখলদারের তালিকা করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তার কাছে প্রতিবেদনও জমা দেন। বাতিল করা হয় অভিযুক্ত ইজারাদারের ইজারা। কিছু দিন জমি বেচাকেনার কাজ বন্ধ থাকলেও আবার অপতৎপরতা শুরু হওয়ায় স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ঈশ্বরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার মো. নজরুল ইসলাম বলেন, রেলওয়ের জমিতে ঘর নির্মাণ ও দখল হওয়ার বিষয়টি তিনি নিয়মিত কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে যাচ্ছেন। কর্তৃপক্ষ যদি বিষয়টি নিয়ে ব্যবস্থা না নেয় তবে তাদের কিছু করার নেই। রেলওয়ে ভূ-সম্পত্তি বিভাগের কিশোরগঞ্জ এলাকার সার্ভেয়ার মো. ফয়েজ উদ্দিন জানান, নতুন করে জমি বেচা-কেনার বিষয়টি সরেজমিন গিয়ে তদন্ত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। তিনি আরও বলেন, হারিছ ও সাদ্দামদের লাইসেন্স ইতিপূর্বে বাতিল করা হয়েছে। ঈশ্বরগঞ্জের ইউএনও এলিশ শরমিন বলেন, বিষয়টি আমার দপ্তরের বাইরের। তবুও সরেজমিন বিষয়টি দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

