অপরাধ বিচিত্রা ডেস্কু ঃ
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে সম্প্রতি নামোল্লেখ না করে কাল্পনিক তথ্য দিয়ে ঠিকানাবিহীন একটি চিঠি পাঠানো হয়, যার প্রেক্ষিতে রাজস্ব বোর্ড থেকে ২ অক্টোবর চট্টগ্রাম কাস্টমস বরাবরে সতর্কতামূলক নির্দেশনা জারি করা হয়। রাজস্ব বোর্ডের এই নির্দেশনার বিপরীতে চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার কর্তৃক গত ১৬ অক্টোবর অফিস আদেশমূলে (নং : ২০৬) ডিটেইলড প্যাকিং লিস্ট প্রদানের নির্দেশনা দিয়ে পরীক্ষণ কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়।
চট্টগ্রাম বন্দর-কাস্টমসে কায়িক পরীক্ষার নামে যা চলছে তাতে আনস্টাফিং কর্মকর্তা, এআইআর, শুল্ক গোয়েন্দা এবং বন্দরের জেটি পরীক্ষণ কর্মকর্তা, এসিদের ঘুষ দুর্নীতি, হয়রানি বেড়েছে আগের চেয়ে বেশি। শতভাগ কায়িক পরীক্ষণকালে এসব কর্মকর্তারা সহস্রভাগ পরীক্ষা করছে। একটি এফসিএল কন্টেইনারে আমদানি পণ্যে একাধিক পণ্য এবং ডিটেইলড প্যাকিং লিষ্ট থাকলেও যদি সব পণ্য জায়গার অভাবে বাহির করা না যায় তাহলে পণ্য পরীক্ষার রিপোর্ট দেওয়া হয় আংশিক পরীক্ষণের। চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনার থেকে সব মালামাল বাহির করে রাখলে একদিকে জায়গার সংকট আর অন্যদিকে চুরি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। ছোট-খাটো দামি পণ্য থাকলে একদিকে চুরি হওয়ার ভয় অন্যদিকে বন্দরের কর্মকর্তা, কাস্টমস কর্মকর্তাদের আবদার মেটাতে হয়। শতভাগ কায়িক পরীক্ষা ও ডেলিভারীর সময় ছোট দামি মালামাল চুরি হচ্ছে বন্দরের ভিতরেই।
ইতিমধ্যে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকৃত অনেক গার্মেন্টস শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে এবং আরো প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার পথে। এখন আমদানীকারক/ব্যবসায়ীরা আমদানী পণ্য শুল্কায়ন-ছাড়করণ প্রসেসিংয়ে চট্টগ্রাম বন্দর-কাস্টমসকে হয়রানির প্রধান কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করছেন। চট্টগ্রাম বন্দর-কাস্টমস দিয়ে আমদানি পণ্য ডেলিভারি নিতে সবচেয়ে বেশি ঘুষ প্রদান এবং হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। বাংলাদেশের গার্মেন্টস, কমার্শিয়াল-ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রতিষ্ঠান রক্ষায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে চলেছে চট্টগ্রাম বন্দর-কাস্টমসের কর্মকর্তা নামধারি দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু অসৎ কর্মকর্তা। আমদানিকারক, ব্যবসায়ীরা ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর, কাস্টমসকে ঘুষ বাণিজ্য, দুর্নীতি, হয়রানির প্রধান সদর দপ্তর হিসেবে ধরে নিয়ে তাদের এলসি অনেকাংশে কমিয়ে দিয়েছেন। শতভাগ কায়িক পরীক্ষায় আমদানিকৃত পণ্যের সবগুলো বের করে আইটেমভিত্তিক রাখতে শ্রমিকদের প্রতি কন্টেইনারের দ্বিগুণ মূল্য রশিদ সাপেক্ষে দেওয়ার পর বখশিশ দিতে হয় রশিদের সমান। বন্দরে প্রতি কাভার্ড ভ্যান, গাড়ী, আনচেসিস কন্টেইনারে হেড ডেলিভারী, চেকার, ইনচার্জকে প্রতি ডকুমেন্টসে গার্মেন্টস পণ্য হলে পাঁচশ, কমার্শিয়াল হলে এক হাজার, এসআই গার্মেন্টসে পাঁচশ, কমার্শিয়ালে ১২’শ, গেইট সার্জেন্টকে গার্মেন্টস পণ্যে পাঁচশ, কমার্শিয়াল পণ্যে এক-দুই হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়। আনস্টাফিং কর্মকর্তাকে প্রতি গার্মেন্টস-বন্ড ডকুমেন্টসে পাঁচশ, কমার্শিয়ালে এক-তিন হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়। এআইআর কর্মকর্তাকে এর থেকে বেশি ঘুষ দিতে হয়। শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তা তো দ্বিগুণ পরিমাণ ঘুষ দাবি করে। শতভাগ কায়িক পরীক্ষার রিপোর্টে এআরও গার্মেন্টসে পাঁচশ, কমার্শিয়াল দুই হাজার টাকা থেকে শুরু, এসি সর্বনিন্ম শুরু এক হাজার থেকে এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত। এফসিএল ডকুমেন্টসে একের অধিক কন্টেইনার বেশি থাকলে তাকে ঘুষের পরিমাণ গাণিতিক হারে বাড়িয়ে প্রদান করতে হয়। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস থেকে শুল্কায়নকৃত প্রতিটা আমদানি ডকুমেন্টসে বন্দরে যখন ডেলিভারী নিতে সিএন্ডএফ প্রতিনিধি প্রসেস করতে যায় তখন পরীক্ষণ কর্মকর্তা, এসি, এআইআর, আনস্টাফিং কর্মকর্তা, শুল্ক গোয়েন্দা, বন্দরের চেকার, হেড ডেলিভারী, ইনচার্জ, এসআই, গেইট সার্জেন্টরা পুণরায় দ্বিতীয়বার শুল্কায়নের নামে সময়ক্ষেপণ, ঘুষের দরদাম করতেই থাকেন। এইচএস কোড, সিপিসি কোড, পণ্যের বর্ণনা, গ্রস-নেট ওজন, পরিমাণ আরো অন্যান্য অপ্রোয়জনীয় বিষয় নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে থাকেন তারা। বর্তমানে কমিশনারের ডিটেইলড প্যাকিং লিষ্টের নির্দেশনা তারা মানছেন ভিন্নভাবে। যেমন-রপ্তানীকারক/ সাপ্লাইয়ারের আমদানিকারকের নাম-ঠিকানা, ফোন, ফ্যাক্স, ই-মেইল থাকতে হবে। ডিডেইলড প্যাকিং লিষ্টে কার্টুন নং থাকতে হবে যা কার্টুনের গায়ে লেখা থাকবে এবং মালামালের বর্ণনা, কান্ট্রি অব অরিজিন, গ্রস-নেট ওজন, বিন-টিন নম্বর অবশ্যই থাকতে হবে। সর্বমোট পরিমাপের একক হিসাব থাকতে হবে। তবে নির্দেশনার বাইরেও অনেক নিয়ম-নীতি মানতে বাধ্য করা হচ্ছে সিএন্ডএফ প্রতিনিধিদের। বন্দর, কাস্টমস কর্মকর্তাদের কথামতো ঘুষ প্রদান না করলে কিংবা দর কষাকষি করলে গাড়ি থেকে মালামাল পরীক্ষণের নামে হয়রানি, কষ্ট দেয়া হয় সিএন্ডএফ প্রতিনিধিদের। এফসিএল ডকুমেন্টসে সার্টিফাইকৃত কন্টেইনার বাস্তবে সংশ্লিষ্ট ইয়ার্ডে গিয়ে না পেলে সংশোধনী নিতে এবং কন্টেইনারটি খুঁজতে এক হাজার টাকা এবং হয়রানির শিকার হতে হয়। কাস্টমস কর্মকর্তাদের পোস্টি অনেক সময় মালামাল পরীক্ষণ করতে গড়িমসি করে থাকেন। পণ্যের ডিউটি ট্যাক্স যদি ইউনিটেও দেওয়া হয় তবুও বন্দর, কাস্টমস কর্মকর্তারা ডিটেইলড প্যাকিং লিষ্ট অনুসারে পণ্যের কার্টুন নং অনুযায়ী পণ্যের বর্ণনা, গ্রস-নেট ওজন দেখবেই। অন্যদিকে ওজন অনুসারে ডিউটি ট্যাক্স দিলেও তাতে পণ্যের ইউনিট অবশ্যই দেখবে। চট্টগ্রাম বন্দর, কাস্টমসে জনবল নিয়োগ যদি ঘুষ, দুর্নীতিমুক্ত, হয়রানিবিহীন, স্বজনপ্রীতি না করে নিরপেক্ষভাবে মেধা-যোগ্যতার ভিত্তিতে করা হয় তবে এসব অনিয়ম অনেকটা বন্ধ হয়ে যাবে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে চাইলে এগিয়ে আসতে পারে। বন্দর নিরাপত্তা বিভাগে লাইসেন্স শাখায় সিএন্ডএফ প্রতিনিধি বা জেটি সরকারকে লাইসেন্স ট্রান্সফার করতে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়, পুলিশি তদন্তে বন্দর থানা এবং সংশ্লিষ্ট স্থায়ী ঠিকানায় থানাকে প্রতিটা তদন্ত রিপোর্টের জন্য প্রায় বিশ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয় এবং সাথে রয়েছে হয়রানি ও সময়ক্ষেপন। সহকারীদের অস্থায়ী গেইট পাশ নিতে সকল চাহিদা মোতাবেক ডকুমেন্টস ফটোকপি দিয়েও দিতে হয় বাড়তি টাকা। এমনিতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ কমে আসছে এই ঘুষ বাণিজ্য, হয়রানি, দুর্নীতির কারণে। এনবিআর, কাস্টমস কমিশনার কর্তৃক নির্দেশনা, অফিস আদেশ জারি করা হলে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের জন্য ঘুষ বাণিজ্য, হয়রানি করতে বেশি সুবিধে হয়। সিইপিজেড শতভাগ রপ্তানীমুখী এ ক্যাটাগরীর বিদেশী মালিকাধীন ষ্টিল মেরিন চেইন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটি বাৎসরিক অডিট করাতে গিয়ে প্রায় ত্রিশ লক্ষ টাকা খরচ হয়ে যায়, যার পরিণামে প্রতিষ্ঠানটি এখন বন্ধ হয়ে গিয়েছে। গার্মেন্টস, কমার্শিয়াল, ইন্ডাষ্ট্রিয়াল প্রতিষ্ঠান রক্ষায় এখনই জরুরি পদক্ষেপ না নিলে, দুর্নীতিবাজদের বেপরোয়া কর্মকান্ড লাগাম টেনে না ধরলে ভবিষ্যতে আরো ভয়াবহ পরিস্থিতি হবে। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যে ঘুষ, দুর্নীতি, হয়রানি বন্ধ হয়েছিল তা বর্তমানে পূর্বের থেকেও বেশি ভয়াবহ আকার ধারণ হয়েছে। দুদক, টিআইবি, র্যাব, সেনাবাহিনী, এনএসআই এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের যৌথ প্রয়াসে বিশেষ টিম থাকলে বন্দর কাস্টমসে অভিযোগ দিয়ে প্রতিকার পাবে সিএন্ডএফ প্রতিনিধিরা।
