বাংলাদেশের বিচার বিভাগের অর্জিত স্বাধীনতা আবার খর্ব হলো। অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির আচরণ ও শৃঙ্খলাবিধিমালার গেজেট প্রকাশ বহুল আলোচিত মাসদার হোসেন মামলার রায়ের নির্দেশনা ও সংবিধান বহির্ভূত বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট আইনজ্ঞরা। তাদের মতে, প্রকাশিত এই গেজেটে সরকারের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক
মন্ত্রণালয়ের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। তারা বলেন, প্রকাশিত গেজেটের বিধিতে জুডিশিয়াল সার্ভিসকে সংবিধানের ১৩৩ অনুচ্ছেদের অধীনে নেয়া হয়েছে। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে অধস্তন বিচারকদের চাকরির আচরণ ও শৃঙ্খলাবিধির সম্পূর্ণ বিষয়টি রাষ্ট্রপতির উপর ন্যস্ত থাকার কথা রয়েছে। কিন্তু প্রকাশিত গেজেটের বিধিটি সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তৈরি করা হয়নি। অথচ মাসদার হোসেনের মামলার রায়ের নির্দেশনায় ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এই বিধি করার কথা ছিল। এখানে আইন মন্ত্রণালয় বিধি তৈরি করার ব্যাপারে ১৩৩ অনুচ্ছেদের বরাত দিয়ে যে রেফারেন্স দিচ্ছেন সেটা সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য। আইনজ্ঞদের মতে, ২০১৭ সালের প্রকাশিত এই গেজেটের বিধির গোড়াতেই গলদ রয়েছে। অধস্তন আদালত একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। সেই জায়গায় তাদেরকে যদি সরকারি কর্মচারী বিধিবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয় সেটি হবে দুর্ভাগ্যজনক এবং মাসদার হোসেন মামলার রায় ও নির্দেশনার পরিপন্থী। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে অধস্তন জুডিশিয়াল সার্ভিসের (বিচারক) নিয়োগ, বরখাস্ত, সাময়িক বরখাস্ত, অপসারণ ও পদোন্নতির বিষয়টি রাষ্ট্রপতির অধীনে (ক্ষমতা) ছিল। কিন্তু ২০১৭ সালের প্রকাশিত এই গেজেটের বিধিতে ওই ক্ষমতা এখন রাষ্ট্রপতির বদলে আইন মন্ত্রণালয়ের ওপর ন্যস্ত হবে। বিচার বিভাগের অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলাবিধির ওপর সরকারের নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ আরো বাড়বে। সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতাও খর্ব হবে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলেন, অধস্তন আদালতের শৃঙ্খলাবিধির ওপর কার্যত সরকারেরই নিয়ন্ত্রণ থাকছে। কারণ সার্ভিস সদস্যদের প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় বলতে আইন মন্ত্রণালয়কেই বোঝানো হয়েছে। : ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম : বহুল আলোচিত মাসদার হোসেন মামলার আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম বলেছেন, অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির আচরণ ও শৃঙ্খলাবিধিমালার যে প্রক্রিয়ায় গেজেটটি হয়েছে, সেই প্রক্রিয়াটিই সংবিধানবহির্ভূত। এই প্রক্রিয়ার গোড়াতেই গলদ রয়েছে। তিনি বলেছেন, এই বিধিমালা করতে গিয়ে আইন মন্ত্রণালয় অধস্তন আদালতের বিচারকদের নির্বাহী বিভাগের অধীনস্থ করে ফেলেছেন। সংবিধান যে মতা রাষ্ট্রপতির উপর ন্যস্ত করেছে সেই জায়গায় : রাষ্ট্রপতির পরিবর্তে আইন মন্ত্রণালয় হতে পারে না। রাষ্ট্রপতির ভূমিকা আইন মন্ত্রণালয় পালন করতে পারে না। : গতকাল মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের কাছে এই মন্তব্য করেন ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা দিয়ে আমীর-উল ইসলাম বলেন, সম্পূর্ণ বিষয়টি রাষ্ট্রপতির উপর ন্যস্ত। রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে আলোচনা করে এটি করবেন। এই অনুচ্ছেদে বলা ছিল এই বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয় বা আইনমন্ত্রী রাষ্ট্রপতির ভূমিকা পালন করতে পারেন না। তিনি বলেন, আমাদের সংবিধানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার যে বিষয়টি ছিল সেটা মন্ত্রণালয় থেকে দূরে রাখার জন্য। কিন্তু এখন সেই বিষয়ে মন্ত্রণালয় এবার চেপে বসেছে। ফলে সাংবিধানিক ওই প্রক্রিয়াটি ব্যাহত হয়েছে। আমীর-উল ইসলাম বলেন, এই বিধি করতে গিয়ে আইন মন্ত্রণালয় বিচারকদের নির্বাহী বিভাগের অধীনস্থ করে ফেলেছেন। : জয়নুল আবেদীন: সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের বর্তমান সভাপতি সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন আইনজীবীদের পক্ষ থেকে বলেন, বিচার বিভাগের অর্জিত স্বাধীনতা আবার খর্ব হলো। এতদিন অধস্তন বিচারকদের চাকরির আচরণ ও শৃঙ্খলা বিষয়টি প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলোচনা করে রাষ্ট্রপতি সিদ্ধান্ত নিতেন। কিন্তু সম্প্রতি প্রকাশিত গেজেট কার্যকর হলে সেই আগের রেওয়াজটি আর থাকবে না। প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ নেয়ার বাধ্যবাধকতা আর থাকবে না। ফলে আইন মন্ত্রণালয়ের একচেটিয়া ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বৃদ্ধি পাবে। : ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ: সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, আগে বিধি ছিল না, এখন বিধি হয়েছে। তাতে অধস্তন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলা সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রণের মতা যদি মন্ত্রণালয়ের হাতেই থাকে তবে বিধি করার প্রয়োজন কী ছিল। তিনি বলেন, মাজদার হোসেন মামলার রায় অনুযায়ীও নিম্ন আদালতের বিচারকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সুপ্রিম কোর্ট সে বিষয়ে বলে দেবেন কাকে দিয়ে তদন্ত করতে হবে। ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ মতো নিম্ন আদালতের বিচারকদের বিষয়ে পদপে নেবেন। : মনজিল মোরসেদ: হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের সভাপতি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ সাংবাদিকদের বলেন, মাজদার হোসেন মামলার রায়ে বিচার বিভাগের পূর্ণ মতা সুপ্রিম কোর্টের ওপর থাকবে। কিন্তু সরকারের হাতে মতা রেখে আইনের বিধির গেজেট প্রকাশ অত্যন্ত দুঃখজনক। : এদিকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী নিম্ন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধিতে যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে তাতে উচ্চ আদালতের মর্যাদা বেড়েছে। যারা সমালোচনা করছেন তারা গেজেট না পড়ে, না বুঝেই সমালোচনা করছেন। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে বিচারকদের আচরণবিধি প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন আইনমন্ত্রী। আনিসুল হক বলেন, ১৯৭৬ থেকে শুরু করে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সংবিধান নিয়ে অনেকেই ফুটবল খেলছেন। এখন সংবিধান নিয়ে আর ফুটবল খেলতে দেয়া হবে না। : নিম্ন আদালতের বিচারকদের আচরণবিধি নিয়ে উচ্চ আদালতের সঙ্গে টানাপড়েন হয়েছে বলে বিএনপিসহ যারা যে বক্তব্য দিচ্ছেন তার সমালোচনা করেছেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, আপিল বিভাগের বিচারপতিদের সঙ্গে বসার পর এ আচরণবিধি তৈরির সিদ্ধান্ত হয়েছে। তারা যখন এটা অনুমোদন করেছেন, তখন আমরা এটা করেছি। তারা এতে সমর্থন দিয়েছেন। আচরণবিধি নিয়ে উচ্চ আদালতের সঙ্গে টানাপড়েন হলো কীভাবে? : তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে বলা আছে, আচরণবিধি সংক্রান্ত মতা রাষ্ট্রপতির কাছে থাকবে। তিনি (রাষ্ট্রপতি) সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করে ১৮ অনুচ্ছেদ তৈরি করেছেন। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদকে রা করতেই এ আচরণবিধি।

