রোববার গভীর রাতে এ ঘটনায় ওই গৃহপরিচারিকা বাদী হয়ে ৮জনের বিরুদ্ধে মুরাদনগর থানায় মামলা দায়ের করেছে।
অভিযোগে জানা যায়, জেলার মুরাদনগর উপজেলার কামাল্লা গ্রামের ব্যবসায়ী মোছলেহ উদ্দিনের বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন একই গ্রামের দিনমজুর আবদুল হকের মেয়ে শামসুন নাহার (১৬)। গত বৃহস্পতিবার রাতে কর্তা মোছলেহ উদ্দিন মাটির ব্যাংকে রাখা এক লাখ ৭০ হাজার টাকা চুরি হয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন। গৃহপরিচারিকা শামসুন নাহার ওই টাকা চুরি করেছে বলে কর্তার পরিবারের লোকজন দাবি করেন। পরদিন শুক্রবার সকালে শামসুন নাহার, তার মা শাহানা বেগম (৪০), ছোট ভাই রবিউলকে (১০) কয়েকজন লোক দিয়ে বাড়ি থেকে ধরে আনা হয়। এর আগে তাদের ঘরে ব্যাপক তল্লাশি করা হয়। তল্লাশি করে গৃহকর্তার লোকজন শামসুন্নাহানদের ঘরে টাকা খুঁজে পায়নি।
এ সময় স্থানীয় মোড়ল ইউপি চেয়ারম্যান পুত্র আবুল বাশার মাস্টার, আল-হেলাল চৌধুরী সিন্দাবাদ, সাবেক মেম্বার বজলু মিয়া, দরবেশ চৌধুরীর ছেলে আরিফ, মোছলে উদ্দিনের ভাগিনা আনিস চৌধুরী, মোছলেম মুন্সি মেম্বার, জজ মিয়া ও আরিফের উপস্থিতিতে তাদেরকে মোছলেহ উদ্দিনের বাড়ির একটি কক্ষে আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন করা হয়। বাঁশের লাঠি দিয়ে পা থেকে কোমর পর্যন্ত পিটিয়ে থেঁতলে দেয়া হয়। এ ছাড়াও বৈদ্যুতিক শক দেয়ার ভয় দেখানো হয়।
এছাড়া শামসুন নাহারসহ তার পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে জোরপূর্বক টাকা চুরির স্বীকারোক্তি আদায় করে মোবাইল ফোনে ভিডিও করে রাখা হয়। এ সময় কয়েকটি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প এবং সাদা কাগজে স্বাক্ষর ও টিপসই রাখা হয়।
শুধু তাই নয়, ‘চুরি’ যাওয়া টাকা আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে পরিশোধ করতে না পারলে তাদের ভিটাবাড়িটি মোছলেহ উদ্দিনের নামে লিখে দেয়ার শর্তে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। বিষয়টি এলাকায় কাউকে অবহিত করলে তাদেরকে গ্রামছাড়া করে দেয়া হবে বলেও হুমকি দেয়া হয়।
গৃহপরিচারিকা শামসুন্নাহার অভিযোগ করে বলেন, তাদের মা-মেয়ের দুই হাত পেছনে ঘরের পিলারের সঙ্গে আর পা দুটি সামনের পিলারে টান করে বাঁধা হয়। এরপর শুরু হয় পিটুনি। ভয়াবহ এ নির্যাতনের একপর্যায়ে তারা অজ্ঞান হয়ে পড়েন। এ সময় স্থানীয় গ্রাম্য চিকিৎসক এনে চিকিৎসা দেয়া হয়। জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর মা-মেয়ের সামনে বড় সুই, ডিম, বরফের খণ্ড, কাঁচিসহ আরো অনেক কিছু দেখতে পান। তাদের বলা হয় এক লাখ ৭০ হাজার টাকা চুরির কথা স্বীকার না করলে নির্যাতনের এসব উপকরণ প্রয়োগ করা হবে। এরপর নির্যাতনের ভয়ে তারা টাকা চুরি করেছেন বলে স্বীকার করেন। স্বীকারোক্তি নিয়ে স্ট্যাম্পে ও সাদা কাগজে স্বাক্ষর রাখা হয়। শর্ত দেয়া হয় পাঁচ দিনের মধ্যে টাকা না দিলে তাদের ভিটা লিখে দিতে হবে।
নির্যাতিত গৃহপরিচারিকা বলেন, স্বাক্ষরের পর জিম্মিদশা থেকে সাত ঘণ্টা পর মুক্তি দেয়া হয়। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় মা মেয়েকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এ বিষয়ে স্থানীয় মোড়ল আল-হেলাল চৌধুরী সিন্দাবাদ নির্যাতনের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, মা ও মেয়ের চরিত্র খারাপ, তাই তাদের গ্রামছাড়া করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় স্থানীয় বৈঠকে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ফেরদৌস চৌধুরী বলেন, চুরির অপবাদ দিয়ে মা-মেয়েকে নির্যাতন করা হচ্ছে এমন খবর শুনে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে এর প্রতিবাদ জানাই। তিনি বলেন, ছোট্ট একটি মাটির ব্যাংকে এক লাখ ৭০ হাজার টাকা রাখা কি সম্ভব? আর সেই টাকা চুরি হওয়ার বিষয়টি খুবই সন্দেহজনক।
অভিযুক্ত গৃহকর্তা মোছলেহ উদ্দিন বলেন, আমার ঘর থেকে কাজের মেয়ে শামসুন্নাহার ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা চুরি করেছে, তাকে জিজ্ঞাসা করায় প্রথমে স্বীকার করেনি, পরে গ্রাম সাহেব সরদারগণ মিলে চাপ প্রয়োগ করায় চুরির কথা স্বীকার করেছে।
তিনি বলেন, টাকা ফেরত দিতে না পারলে আগামী মঙ্গলবার শাহানা বেগম তার বাড়ির সাত শতাংশ জায়গা লিখে দেবেন মর্মে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর দিয়েছে। আমি তাদেরকে পুলিশে দিতে চেয়েছিলাম কিন্তু চুরির কথা স্বীকার করায় গ্রামবাসীর কথায় ছেড়ে দিয়েছি।
এ বিষয়ে কথা হলে মুরাদনগর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আবু জাহের বলেন, মা-মেয়েকে ভয়াবহ নির্যাতন করা হয়েছে। বিশেষ করে হাঁটুর ওপর থেকে কোমর পর্যন্ত থেঁতলে দেয়া হয়েছে। চিকিৎসা চলছে। সোমবার দুপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসেলুল কাদের চিকিৎসাধীন মা মেয়েকে দেখে আইনগত পদক্ষেপ নেয়ার আশ্বাস দিয়ে গেছেন।
মুরাদনগর থানার ওসি মিজানুর রহমান জানান, এ ঘটনায় নির্যাতিত গৃহপরিচারিকা শামসুন্নাহার বাদী হয়ে রোববার রাতে মামলা দায়ের করেছে। আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।
