কুসিক নির্বাচন দলীয় প্রার্থী কে এখনো জানেন না বিএনপির উপদেষ্টা মনিরুল হক চৌধুরী!

0
766

জামাল উদ্দিন স্বপন, কুমিল্লা:
নির্বাচনের আর মাত্র ৭ দিন বাকি । কিন্তু এখনো বিএনপির দলীয় প্রার্থী কে, কাকে দেওয়া হয়েছে ধানের শীষের প্রতীক তা জানেন না বিএনপির উপদেষ্টা কমিটির অন্যতম সদস্য ও সাবেক এমপি মনিরুল হক চৌধুরী। এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও কুসিক নির্বাচনের বিএনপি দলীয় প্রার্থীর প্রধান সমন্বয়কারী নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, মনির চৌধুরী সাহেব আমাদের কেন্দ্রীয় নেতা। এত দিন ধরে প্রচার প্রচারণা চলার পরও তিনি জানেন না দলীয় প্রার্থী কে , তা কি করে হয়। এদিকে, দিন যত ঘনিয়ে আসছে ততই সদর দক্ষিণের  কোন্দলে বিপর্যন্ত হচ্ছে বিএনপি। মনিরুল হক চৌধুরী আর এন্ট্রি মনিরুল হক চৌধুরী এই দুই গ্রুপে বিভক্ত হওয়ায় ধানের শীষের ভোট ব্যাংক হিসেবে খ্যাত এই ৯টি ওয়ার্ডে কঠিন পরীক্ষায় পড়তে পারে বিএনপি দলীয় প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু। আর অপর দিকে, বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামীলীগ সকল বিভেদ ভুলে এখন ঐক্যবদ্ধ ভাবে দলীয় প্রার্থী আঞ্জুম সুলতানা সীমার নৌকা প্রতীকের পক্ষে কাজ করছে। কুমিল্লা দক্ষিণের এই ৯টি ওয়ার্ডে রয়েছে সাড়ে ৬০ হাজার ভোটার। অভিজ্ঞ মহলের মতে, বিএনপির মনিরুল হক সাক্কুকে মেয়র হতে হলে অবশ্যই এই ৯টি ওয়ার্ডে তাকে দলীয় কোন্দল মিটিয়ে ঐক্যবদ্ধ করে ৬০ ভাগ ভোট পেতে হবে।
কুমিল্লা জেলা এবং সদর দক্ষিণ উপজেলা বিএনপি এবং এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, সদর দক্ষিণ উপজেলা বিএনপির কোন্দল বর্তমানে সাবেক এমপি ও কেন্দ্রীয় বিএনপির উপদেষ্টা  মনিরুল হক চৌধুরীকে  কেন্দ্র করে। কারণ, উপজেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব সিদ্দিকুর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক মাহবুব চৌধুরীর নেতৃত্বে  গঠিত উপজেলা বিএনপি জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মোবাশ্বের  আলম ভূঁইয়ার অনুসারী হিসেবে পরিচিত। মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া সর্বশেষ ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা ১০ নির্বাচনী এলাকার বিএনপি দলীয় প্রার্থী ছিলেন। নাঙ্গলকোট এবং সদর দক্ষিণ উপজেলা নিয়ে গঠিত কুমিল্লা-১০ নির্বাচনী এলাকা। মনিরুল হক চৌধুরীর বক্তব্য, সদর দক্ষিণ উপজেলায় বর্তমানে বিএনপির কোন কমিটি নেই। কারণ, চৌদ্দগ্রামের একটি হোটেলে বসে জেলা বিএনপি ৭/৮ জনকে নিয়ে কমিটি ঘোষণা করে। অপর দিকে, উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহবুব চৌধুরী বলেছেন, মনিরুল হক চৌধুরী মিথ্যা কথা বলেছেন। সম্মেলনের মাধ্যমে আমাদের এ কমিটি গঠন করা হয়েছে। বর্তমানে সদর দক্ষিণ উপজেলা বিএনপির দেখাশোনা করেন জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া। ফলে দীর্ঘদিন ধরে এখানে মনির চৌধুরী গ্রুপ আর মোবাশ্বের  গ্রুপে বিভক্ত হয়ে আছে। যদিও কোন রাজনৈতিক কর্মকান্ডের মনিরুল হক চৌধুরী কিংবা তার গ্রুপে কোন দৃশ্যমান উপস্থিতি নেই। রাজনৈতিক কর্মকান্ডের দৃশ্যমান না থাকলেও  সদর দক্ষিণে মনিরুল হক চৌধুরীর একটি ভোট ব্যাংক রয়েছে। একজন প্রার্থীর জয় পরাজয়ে এই ভোট ব্যাংক যথেষ্ট বলে মনে করেন সচেতন মহল।
আগামী ৩০ মার্চ অনুষ্ঠিত হবে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের দ্বিতীয় নির্বাচন। আনুষ্ঠানিক প্রচার প্রচারণার আর রয়েছে মাত্র ৬ দিন। গত ১৫ মার্চ থেকে বিএনপির কেন্দ্রীয় থেকে শুরু করে আশেপাশের জেলার প্রায় সকল শীর্ষস্থানীয় অসংখ্য নেতাকর্মী ধানের শীষের পক্ষে গণসংযোগ করলেও একেবারে নিরব ভূমিকা পালন করে আছেন সদর দক্ষিণের প্রভাবশালী নেতা ও কেন্দ্রীয় বিএনপির উপদেষ্টা মনিরুল হক চৌধুরী। বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা হওয়া সত্ত্বেও কি কারণে তিনি দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন না, দলীয় প্রতীকের জন্য জনগণের কাছে ভোট চাচ্ছেন না তা জানতে মঙ্গলবার দুপুরে তার সেল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী কে, ধানের শীষ কে পেয়েছে আজ পর্যন্ত আমাকে দলীয়ভাবে জানানো হয়নি। আমি জানি না, কে আমাদের দলীয় প্রার্থী। কিভাবে কেন্দ্র থেকে প্রার্থী করিয়ে এনেছে এটাও আমি জানি না। আমাকে জানানো হয়নি। তারা মনে করছে আমি মেয়র প্রার্থী হবো তাই তাড়াতাড়ি করে জেলা বিএনপির সাধারণ  সম্পাদক হাজী ইয়াছিন সাক্কুকে নিয়ে গিয়ে প্রার্থী করিয়ে এনেছে। ভাল কথা। প্রার্থী সাক্কু হয়েছে। গেলবার আমি তার জন্য কাজ করে দক্ষিণের ৯ ওয়ার্ডের সবগুলো কেন্দ্র থেকে তাকে বিজয়ী করেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই মনিরুল হক সাক্কু পর্যন্ত আমাকে একটি ফোনও করেনি। জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে হাজী ইয়াছিনও আমাকে কিছু জানায়নি, বলেনি। কুমিল্লায় অবস্থানরত ন্থায়ী কমিটির সদস্য ও কুসিক নির্বাচনের বিএনপি দলীয় সমন্বয়কারী নজরুল ইসলাম খান কিংবা কোন কেন্দ্রীয় নেতা কথা বলছে কিনা জানতে চাইলে বিএনপি চেয়ারপার্সনের এই উপদেষ্টা বলেন, না। আমার সাথে আজ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় বা স্থানীয় কোন নেতা এমনকি দলীয় প্রার্থী পর্যন্ত কোন যোগাযোগ করেনি, কথা বলেনি। আমি কেন্দ্রের কথা ছাড়া কাজ করব না।  গেল রাতে(সোমবার) মনিরুল হক সাক্কুর স্ত্রী ও তার ভাই রিংকু (এড.কাইমুল হক রিংকু) আমার কাছে এসেছিল। আমি পরিষ্কার বলে দিয়েছি, তোমরা অনেক দেরি করে ফেলছো। এখন আর আমার করার কিছুই নেই। ধানের শীষ প্রতীক হিসেবে যে ভোট পাওয়ার তা পাবে। আর সদর দক্ষিণ উপজেলার বিএনপি প্রসঙ্গে তিনি এ  প্রতিবেদককে বলেন, এখানে বিএনপির কোন কমিটি নেই। চৌদ্দগ্রামের একটা হোটেলে বসে ৭/৮ জনকে নিয়ে এ কমিটি করা হয়েছে। এদের কোন লোকও নেই, ভোটও নেই। এরা কখনো জাকারিয়া তাহের সুমন, কখনো আবদুল গফুর ভূঁইয়া আবার এখন মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়াকে বিক্রি করে খাচ্ছে। এদের নিয়ে কথা বলে লাভ নেই। এ প্রসঙ্গে সদর দক্ষিণ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহবুব চৌধুরী বলেছেন, মনির চৌধুরী মিথ্যা কথা বলেছে। আমাদের কমিটি সম্মেলনের মাধ্যমে হয়েছে। আর সদর দক্ষিণ উপজেলা হলো বিএনপির ঘাঁটি। এখানে মনির চৌধুরী বা কোন বিশেষ ব্যক্তি ফ্যাক্টর না। এখানে জনগণ ভোট দিবে ধানের শীষকে। তারা শহীদ জিয়াকে ভালোবাসে, খালেদা জিয়াকে ভালোবাসে। আর মনির চৌধুরীর আগের সেই ইমেজ নেই। সব শেষ হয়ে গেছে। এই এক ব্যাক্তি নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারবে না ইনশাল্লাহ।
কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাজী আমিন উর রশীদ ইয়াছিন বলেছেন, মনির ভাই আমাদের মুরুব্বী। তিনি যদি এখন ভুলে যান তাহলে আমরা কি করতে পারি। মনোনয়নের আগে আমাদের কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু ভাইয়ের সাথে যে বৈঠকটি হয়েছিল সেখানে মনির ভাই ছিলেন। সেখানে সাক্কুর বিষয়ে আলাপ হয়েছে। আর কেউ নির্বাচন করবেন বলে সেখানে কোন আলোচনাই হয়নি। আর তিনি তো কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা। তিনি এত বড় একটি পদে থেকে কেউ তাকে বলবে তারপর তিনি গণসংযোগ করবেন, এটা তো একজন সিনিয়র নেতার কথা হতে পারে না। তিনি নিজেই তো আমাদের আদেশ নির্দেশ দিবেন। এখন মনিরুল হক চৌধুরী যদি কেন্দ্রের নির্দেশের অপেক্ষায় গণসংযোগ না করেন, ধানের শীষের পক্ষে কথা না বলেন, তাহলে এটা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বই ভাল বলতে পারবেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ও কুসিক নির্বাচনের দলের সমন্বয়কারী নজরুল ইসলাম খান বলেন, আমরা কেউ কথা বলেনি এটা যদি মনিরুল হক চৌধুরী বলে থাকেন, তাহলে আমি কি বলব। তিনি একজন সিনিয়র লিডার। আমি নিজে তার সাথে কথা বলেছি। তিনি আমার সাথে অনেক মান অভিমানের কথা বলেছেন, অভিযোগ করেছেন। তারপরেও যদি তিনি বলেন, আমরা কথা বলিনি, তাহলে বলব, অসুবিধা কি? তিনি তো আমাদের দলের নেতা। আর কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব না বললে তিনি কাজ করবেন না, এটা তো কথা হতে পারে না। এই যে আমরা বিভিন্ন জেলা থেকে এতগুলো লোক এতদিন ধরে কাজ করছি, কেন করছি, কারণ, এটা দলীয় নির্বাচন, ধানের শীষের নির্বাচন। তারপরেও যদি তিনি বলেন, কেন্দ্র থেকে উনাকে বলতে হবে তাহলে বলবে  অসুবিধা নেই। কেন্দ্রীয় বিএনপির উপদেষ্টা কমিটির অন্যতম সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করা মনিরুল হক সাক্কু বলেন, আমার ছোট ভাই এড. কাইমুল হক রিংকু তার কাছে গিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, চেয়ারপার্সন বা মহাসচিব না বললে তিনি কাজ করবেন না। আমি এই খবর আমাদের সমন্বয়কারী নজরুল ইসলাম খানকে জানিয়েছি, এখন এটা কেন্দ্র দেখবেন, কেন্দ্রের বিষয়। আর তিনি তো আমার মুরুব্বি। তিনি যদি অভিযোগ করেন আমি আর কি করতে পারি। এ দিকে, সদর দক্ষিণের ৯ ওয়ার্ডের সাড়ে ৬০ হাজার ভোটে লিড নেওয়ার জন্য আদাজল খেয়ে মাঠে নেমেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ। এখানে জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও পরিকল্পনা মন্ত্রী লোটাস কামাল তার ছোট ভাই সদর দক্ষিণ উপজেলার চেয়ারম্যান গোলাম সারওয়ারকে দায়িত্ব দিয়েছেন এই ৯টি ওয়ার্ড দেখার জন্য। সোমবার মন্ত্রীর মেয়ে ও কুিমল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের চেয়ারম্যান নাফিসা কামাল নিজে এসে দক্ষিণের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ব্যাপক গণসংযোগ করেছেন। পরিকল্পনা মন্ত্রী লোটাস কামাল  কুসিক নির্বাচনকে এতই গুরুত্ব¡ দিয়েছেন যে, ৯ ওয়ার্ডে আওয়ামীলীগের একক কাউন্সিলর প্রার্থী পর্যন্ত দিয়েছেন। যদিও কিছু কিছু বিদ্রোহী  প্রার্থীও রয়েছে। এক দিকে, দল ক্ষমতায় অপর দিকে দল হিসেবে আওয়ামীলীগ দক্ষিণে অত্যন্ত শক্তিশালী। এই দুই শক্তির বিপরীতে মনিরুল হক চৌধুরীর মত একজন জাদরেল নেতাকে বাইরে রেখে বা অভ্যন্তরীণ কোন্দল রেখে ধানের শীষ কিভাবে তাদের ভোট ব্যাংক ধরে রাখবে আর নৌকা কিভাবে ধানের শীষ বাক্স ভোট তার বাক্স নিবে সেটাই এখন দেখার বিষয়।
উল্লেখ্য, কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার এই ৯ ওয়ার্ডে এবার মোট ভোটার সংখ্যা ৬০ হাজার ৬২৯টি। গেলবার নির্বাচন মনিরুল হক সাক্কু এই ৯ ওয়ার্ডে আওয়ামীলীগ দলীয় প্রার্থী অধ্যক্ষ আফজল খানকে ৪ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছিলেন।

Advertisement
Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here