এখন তারা কৌশল পাল্টিয়ে গোপনে চালাচ্ছে মাদক কারবার

0
592

পুরনো চেহারায় ফিরেছে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের চিহ্নিত মাদক স্পট জেনেভা ক্যাম্প। চার মাস ধরে দেশজুড়ে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানের মধ্যে ফের সেখানে শুরু হয়েছে মাদক কারবার। আগের মতো খোলামেলা না হলেও এখন তারা কৌশল পাল্টিয়ে গোপনে চালাচ্ছে মাদক কারবার।

Advertisement

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ গলাতে তারা নিচ্ছে নানা কৌশল। কয়েক দফা যাচাইয়ের পর নিশ্চিত হলেই শুধু গ্রাহকের হাতে উঠছে মরণনেশা ইয়াবা। সরেজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেনেভা ক্যাম্পের বাতাসে এখনো ওড়ে মাদকের ধোঁয়া। নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে কিছুটা চোর-পুলিশ খেলার মতোই চলছে জেনেভা ক্যাম্পের মাদকবিরোধী অভিযান। কারবারিদের কাছে অভিযানের আগেই খবর পৌঁছে যায়। শীর্ষ কারবারিরা ধরা না পড়ায় আত্মগোপনে থেকেই তাদের সহযোগীরা চালিয়ে যাচ্ছে মাদকের বিকিকিনি। সম্প্রতি কয়েক দফা বিহারি ক্যাম্পে গিয়ে মাদক কারবারের নানা কীর্তি চোখে পড়ে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে বিহারি ক্যাম্পে যেতেই দূর থেকে মানুষের কর্মব্যস্ততা চোখে পড়ে। এর মধ্যেই কিছু ছদ্মবেশী কিশোরকে দেখা গেল। তাদের দিকে আঙুল তুলে একজন একজনকে ইশারা করল। তাদের এই ইশারার কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা গেল, ক্যাম্পের প্রায় সবকটি গেটেই এরা সার্বক্ষণিকভাবে দাঁড়িয়ে থেকে ইয়াবা বিক্রি করে। আলো আঁধারের মধ্যে সেখান থেকে কিছুদূর যেতেই আরো কয়েকজন নারীর দেখা মেলে। চেহারায় উসকোখুসকো এসব নারী শাড়ির ভাঁজে ইয়াবা রাখে। ঘুরে ঘুরে ইয়াবা, গাঁজা এমনকি ফেনসিডিল ও হেরোইনও বিক্রি করে। শাড়ি পরে ফুটপাতে তারা সবজিও বিক্রি করে। যাতে সহজে তাদের কেউ সন্দেহ না করে। এরপর সুযোগমতো মাদকসেবীরা তাদের কাছ থেকে ইয়াবা কিনে নেয়। কেউ মাদক কিনতে ক্যাম্পে ঢুকলেই তারা বুঝে যায়। কারণ ক্রেতাদের অনেকে প্রায়ই তাদের কাছ থেকে ইয়াবা কিনে থাকে। ক্রেতাদের সঙ্গে চোখের ইশারায় তারা একে অপরের ভাব বুঝে নেয়। এরপর সতর্কতার সঙ্গে নিরাপত্তারক্ষীদের ফাঁকি দেয় তারা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ধোঁকা দিতে মাদক হস্তান্তরের জায়গাও তারা কিছু সময় পরপরই পাল্টিয়ে নেয়। ক্রেতাকে কয়েক গলিপথ পার করে নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পরই নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে মাদক হস্তান্তর করে কারবারিরা। তবে সাম্প্রতিক অভিযানের কারণে কিছুটা দাম বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে চার রঙের ইয়াবা বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৭০০ টাকায়। খোঁজ নিয়ে আরো জানা যায়, ইশতিয়াক আত্মগোপনে থাকলেও তার ঘনিষ্ঠ ১৯ সহযোগীর মধ্যে আরশাদ, তানভীর, নাদিম, সেলিম, মনির, আরিফ, মুন্না, সীমা, বিল্লাল, রাজা, আরমান, রাকিব, মুক্তার, গুড্ডু, চন্নু কসাই ও সোলেমানকে দিয়ে এখনো মাদক কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেনেভা ক্যাম্পের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জেনেভা ক্যাম্পে অভিযান চালানো হয়েছে অনেকবার। এর পরও কেন ইয়াবা বিক্রি বন্ধ হয় না? তার মানে সরষের মধ্যেই ভূত আছে। রক্ষক যখন ভক্ষক হয় তখন ইয়াবা কারবার কেন বন্ধ হবে! আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সোর্সরাও মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত। তাদের কারণেই ইয়াবা কারবারিরা বেপরোয়া। র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, এখনো কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে নিয়মিত মাদক ঢাকায় আনছে কারবারিরা। এরপর ঢাকা থেকে সারা দেশে এসব মাদক সরবরাহ করা হচ্ছে। ঢাকার মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে বেশ কয়েকবার অভিযান চালিয়ে শতাধিক মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।  এর পরও বিচ্ছিন্নভাবে সেখানে মাদক কারবার চলতে পারে। তবে ফের অভিযান চালানো হবে সেখানে। বিহারি ক্যাম্পে গঠিত মাদকবিরোধী কমিটির শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মোহাম্মদপুর  জেনেভা ক্যাম্পসহ আশপাশের এলাকায় এখনো চলছে ইশতিয়াক বাহিনীর মাদক কারবার। বিশেষ করে গাঁজা শাকিলের ইয়াবা বাণিজ্য চলছে এখন। এতে জড়িয়ে পড়ছে বিহারি ক্যাম্পের বাসিন্দাসহ আশপাশের এলাকার স্কুল-কলেজের ছেলেরা। শাকিল বিহারি ক্যাম্পে মাদক বাণিজ্যের সূচনাকারীদের মধ্যে অন্যতম। বেশ কয়েক দফা মাদকবিরোধী অভিযান চললেও ইশতিয়াক ও শাকিল গ্রেপ্তার হয়নি। এরা গ্রেপ্তার হলে এলাকায় মাদক কারবার অনেক কমে আসবে। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নিত্য নতুন কৌশলে কারবারিরা এখন মাদক ঢাকায় আনছে। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে মাদক পাচারের জন্য ট্রানজিট রুট হিসেবে রাজধানীকে ব্যবহার করছে তারা। ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, ‘বিহারি ক্যাম্পে অতীতে আমরা অনেক রেইড দেওয়ার ফলে এখন মাদক কারবার অনেক কমেছে।  এর পরও বিচ্ছিন্নভাবে মাদক কারবার চলতে পারে। তবে পুরোপুরি নির্মূল হয়নি এটা সত্য।’

Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here