উত্তরায় সাড়ে ৮ হাজার ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্প অনিশ্চিত পূর্তমন্ত্রী ক্ষোভ পূর্বাচলে ৭০ প্লটও দালালের নিকট দুর্নীতিবাজ চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীনের শেল্টারে রাজউকে চলছে হরিলুট ও প্লট বাণিজ্য

0
1222

অপরাধ বিচিত্রাঃ
মালয়েশিয়ার সঙ্গে জিটুজি (সরকার থেকে সরকার) পদ্ধতিতে পাঁচ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) উদ্যোগে উত্তরায় আট হাজার ৪০০ ফ্ল্যাট তৈরির প্রকল্প অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। প্রস্তাবটিতে ত্রুটি থাকায় প্রথম দফায় তা আইন মন্ত্রণালয় ফেরত পাঠায়; কিন্তু দ্বিতীয় দফায় আসা প্রস্তাবও একই কারণে ফেরত পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে আইন মন্ত্রণালয়। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং রাজউকের কিছু অসাধু কর্মকর্তার অনিয়মের কারণে আবাসন প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। মানবশক্তি রফতানিকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে দূরত্ব বেড়ে যাওয়ায় মালয়েশিয়া সরকারের অর্থায়ন নিয়েও সংশয়ে রয়েছে মন্ত্রণালয় ও রাজউক। অথচ মধ্যম আয়ের নাগরিকরা পাঁচ বছর ধরে উত্তরায় রাজউকের এই ফ্ল্যাট বরাদ্দের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছেন। গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন দীর্ঘ আলাপকালে বলেন, প্রকল্পটির চূড়ান্ত চুক্তির সারসংক্ষেপ স¤পর্কে আমলারা নানা ধরনের প্রশ্ন তুলেছেন। এর সঙ্গে কয়েকজনের স্বার্থও যোগ হয়েছে। সব মিলিয়ে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিয়েছে। তিনি জানান, কিছু অসাধু কর্মকর্তার কারণেই প্রকল্পটি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। পাঁচ বছর আগে ২০১১ সালের অক্টোবরে মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সময় বলা হয়েছিল, সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটিতে বাংলাদেশ সরকারকে কোনো টাকা খরচ করতে হবে না। মালয়েশিয়া সরকার স¤পূর্ণ অর্থ বিনিয়োগ করবে। পুরো প্রকল্প স¤পন্ন করে দেওয়ার তিন বছর পর তাদের কেবল বিনিয়োগের অর্থ ফেরত দিলেই হবে।
চুক্তিপত্রের সারসংক্ষেপে ত্রুটিঃ
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালের ১৮ অক্টোবর বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া সরকারের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। ২০১৪ সালের ২৯ এপ্রিল মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত দাতো সেরি উতামা ও রাজউকের চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদিন ভূঁইয়া পূর্ত মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সংশোধিত এমওইউ স্বাক্ষর করেন। যাতে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে সব নাগরিক সুবিধাসংবলিত অ্যাপার্টমেন্ট তৈরির কথা বলা হয়। এর পরই রাজউক এ প্রকল্পের চুক্তিপত্রের সারসংক্ষেপ তৈরি করে পূর্ত মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। সেখান থেকে সেটি মতামত (ভেটিং) চেয়ে পাঠানো হয় আইন মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু আইন মন্ত্রণালয় প্রস্তাবটি মূল্যায়নের পর জানায়, বিবেচ্য মাস্টার এগ্রিমেন্ট ও সেলস অ্যান্ড পারচেজ এগ্রিমেন্টের ক্ষেত্রে টাউন ইম্প্রুভমেন্ট অ্যাক্ট-১৯৫৩-এর সংশ্লিষ্ট বিধানসহ সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত আইন-২০০৬ এবং সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত বিধিমালা-২০০৮-এর বিধানগুলো অনুসরণ করা হয়নি। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর কোনো সারসংক্ষেপও রাখা হয়নি। ২০১৫ সালের ১৫ অক্টোবর আইন মন্ত্রণালয় মাস্টার এগ্রিমেন্টের এসব ত্রুটি উল্লেখ করে তা ফেরত পাঠায়। এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশ না করার শর্তে পূর্ত মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ওই মাস্টার এগ্রিমেন্টে এমন সুযোগ রাখা হয়েছিল, যাতে মালয়েশিয়ার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এএলএম-গেমিলাং কনসোর্টিয়াম লিমিটেডকে বিনিয়োগ ছাড়াই এ দেশ থেকে ব্যাংক ঋণ নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ পায়। কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি রাজউকের সঙ্গে যোগসাজশে প্রতিষ্ঠানটির জন্য এ সুযোগ তৈরি করে দেন। ওই কর্মকর্তা আরও জানান, মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষে গেমিলাং কনসোর্টিয়ামের প্রতিনিধি বাংলাদেশের একটি প্রভাবশালী চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রাজউকের চেয়ারম্যানের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠকও করেছেন। তারাই অসাধু কর্মকর্তাদের হাত করে মাস্টার এগ্রিমেন্টে এমন সুযোগ রেখেছিলেন।
সংশোধিত চুক্তিপত্রেও স্বার্থহানিঃ
এরপর পূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে দ্বিতীয় দফায় ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো সংশোধিত মাস্টার এগ্রিমেন্টেও আইন মন্ত্রণালয় বেশ কিছু ত্রুটি পেয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা সিনিয়র সহকারী সচিব আরিফুল কায়সার কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তবে আরেকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সংশোধিত এগ্রিমেন্টে এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের স্বার্থহানির ব্যাপক আশঙ্কা রয়েছে। কাজেই আবারও এটা ফেরত যেতে পারে। কারণ প্রকল্পের জমির মালিক রাজউক হলেও অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণের পর এগুলো এএমএল-গেমিলাং কনসোর্টিয়াম লিমিটেড থেকে রাজউককে কিনে নিতে হবে। পাশাপাশি এতে নির্মাণকাজের সময় রাজউকের পক্ষ থেকে কোনো তদারকির ব্যবস্থা রাখা হয়নি। আইন মন্ত্রণালয়ের মতে, এই শর্ত টাউন ইম্প্রুভমেন্ট অ্যাক্ট ১৯৫৩-এর সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ নয়। যদিও পূর্ত মন্ত্রণালয়েরই এসব বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত আইন অনুসরণ এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের অধীন সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের (সিপিটিইউ) মতামত নেওয়াও আবশ্যক।
গেমিলাং কনসোর্টিয়ামের প্রতিনিধিদের পরিচয় নিয়ে সংশয়ঃ
ইতিমধ্যে রাজউকের চেয়ারম্যানের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করা গেমিলাং কনসোর্টিয়ামের প্রতিনিধিদের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। রাজউক তাদের পরিচয় জানতে মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাসে চিঠি পাঠায়; কিন্তু দূতাবাস তাদের ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো উত্তর দেয়নি। ফলে ওই প্রতিনিধি দলের সদস্যরা মালয়েশিয়া সরকারের প্রতিনিধি কি-না, সে ব্যাপারেও সন্দেহ দেখা দেয়। রাজউক মনে করে, মালয়েশিয়ার অনাগ্রহের কারণেও এরকম হতে পারে। এ ক্ষেত্রে মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান না করায়ও সন্দেহ-সংশয় ঘনীভূত হচ্ছে।
কথা বলতে অনাগ্রহী কর্মকর্তারাঃ
এসব বিষয় নিয়ে রাজউকের চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদিন ভূঁইয়া, রাজউক বোর্ড সদস্য আবদুর রহমান, প্রধান প্রকৌশলী রায়হানুল ফেরদৌস, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মঈন উদ্দিন আবদুল্লাহসহ এ প্রকল্পের সঙ্গে স¤পৃক্ত বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়; কিন্তু তারা কোনো কিছু বলতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। এর কোনো কারণও তারা ব্যাখ্যা করেননি। রাজউক চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদিন ও বোর্ড সদস্য আবদুর রহমান বলেন, বিষয়টি আইন মন্ত্রণালয়ে আছে। প্রধান প্রকৌশলী রায়হানুল ফেরদৌস জানিয়েছেন, অত বড় বিষয় নিয়ে তিনি কথা বলতে চান না। পরে এ বিষয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, এমওইউ অনুযায়ী মালয়েশিয়া পুরো টাকা তারা এ কাজে বিনিয়োগ করবে। ৩০ মাসের মধ্যে ফ্ল্যাট তৈরি করে দেবে। প্রতি বর্গফুটের নির্মাণ খরচ ধরা হবে তিন হাজার ৪৩৫ টাকা। নির্মাণ শেষের ৩৬ মাস পর তারা রাজউকের কাছ থেকে টাকা নেবে। এর চেয়ে ভালো প্রস্তাব আর হয় না। এই প্রকল্পের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীরও আগ্রহের কমতি ছিল না বলে উল্লেখ করেন পূর্তমন্ত্রী।
রাজউক কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় ৭০ দালালের মুঠোয় পাঁচ শতাধিক প্লটঃ
প্রতারণা করে শুধু ক্ষতিপূরণের টাকা নয়, প্লট পর্যন্ত হাতিয়ে নিয়েছে দালালরা। পূর্বাচল উপশহর প্রকল্প এলাকার পাঁচ শতাধিক প্লটের মালিক বনে গেছে এভাবে প্রায় ৭০ জন দালাল। তারা এত সংঘবদ্ধ যে তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলে উল্টো জেলে যেতে হয়। জালিয়াতির মাধ্যমে গত ২২ বছরে এরা শুধু মসজিদ-মাদ্রাসা-স্কুলেরই নয়, প্রতিটি মৌজা এবং গ্রামের অসংখ্য জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের টাকা লুট করেছে। এদের জালিয়াতির শিকার হয়েছেন প্রায় এক হাজারের বেশি স্থানীয় বাসিন্দা। সম্প্রতি পূর্বাচলের বিভিন্ন এলাকায় অনুসন্ধানের সময় নানাজনের সঙ্গে কথা বলে এসব ভয়াবহ তথ্য জানা গেছে। জালিয়াতচক্রের কেউ কেউ দিনমজুর থেকে গাড়ি-বাড়ি, ফ্ল্যাট ও কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তাদের এ অনিয়ম-দুর্নীতিতে সহায়তা করেছে ভূমি অফিসের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাদের দুর্বৃত্তায়ন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, সব হারিয়েও সন্ত্রস্ত সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা।
দালালদের প্রতারণার
বিচিত্র কাহিনী ঃ
রূপগঞ্জের মধুখালি গ্রামের মৃত রহিমউদ্দিন মিয়ার ছেলে মো. ইমামউদ্দিন। অভাবের কারণে তিনি ৫ শতাংশ জমি বিক্রি করেছিলেন স্থানীয় হাবিবুর রহমান ওরফে হারেজ মেম্বারের কাছে। জমিটি রেজিস্ট্রি করে নেওয়ার সময় জালিয়াতি করে ৫ শতাংশের জায়গায় হারেজ মেম্বার ৪৪ শতাংশ জমি লিখে নেন। পরে জালিয়াতি করে নেওয়া সেই জমি দেখিয়ে পুনর্বাসনের জন্য প্লট পায় হারেজের শ্যালিকা সুফিয়া বেগম! জালিয়াতি টের পেয়ে ইমামউদ্দিন বাদী হয়ে হারেজের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা করেন। কিন্তু অর্থবিত্ত-প্রতিপত্তি কাজে লাগিয়ে হারেজ মেম্বার উল্টো ইমাম উদ্দিনকেই হয়রানি করেন চাঁদাবাজির মামলায় ঝুলিয়ে। ইমামউদ্দিনের বাড়ি গিয়ে এ নিয়ে কথা বলতে চাইলে তিনি মুখ খোলেননি। প্রতিবেশী কয়েকজন পীড়াপীড়ি করলে তিনি বলেন, চুন খাইয়া মুখ পুড়ছে, অহন দই দেখলেও ডর করে। আপনাগো কাছে হারেজের কথা কইলে আমার জমিডা কি ফিরা পামু? হেয় তো আমার জমি নেয় নাই, জীবনডাই কাইরা নিছেগা। ৫ শতাংশ জায়গা কিনার কথা কইয়া ৪৪ শতাংশ জমি নিছে হারেজ মেম্বার। ওই জমি দেখাইয়া ভোলাব ইউনিয়নের তার শ্যালিকা সুফিয়ার নামে প্লট বাগাইয়া নিছে। কাঁদতে কাঁদতে বলেন তিনি, বাবা রে, হের বিরুদ্ধে মামলাও করছিলাম। এতেও কিছু অয় নাই। উল্ডা (উল্টো) আমাগো নামে মামলা কইরা পুলিশ দিয়া হয়রানি করছে। হেই কষ্টের কথা আর মনে করতে চাই না। অহন আবার কিছু কইলে নতুন ঝামেলায় পড়মু। শুধু ইমাম উদ্দিনই নন, মধুখালি গ্রামের ইসলাম উদ্দিন মিয়া, দড়িগুতিয়াবো এলাকার চান মিয়া, মমিন মিয়াসহ ২০ জনের বেশি স্থানীয় বাসিন্দা হারেজের প্রতারণায় নিঃস্ব হয়ে গেছেন। বুরুলিয়া গ্রামের মৃত তাহের মিয়ার দুই সন্তান মো. রুকন উদ্দিন ও হনুফা আক্তারও প্লট প্রতারণার শিকার। ভোলানাথপুরের সোবহান মিয়ার ছেলে জমির দালাল দিল মোহাম্মদ দিলু ভুয়া একজনকে বাবা সাজিয়ে তাদের তিন কাঠার প্লটটি হাতিয়ে নেয়। প্রতারণার শিকার রুকন উদ্দিন বলেন, কইয়া কী লাভ অইব। যারা নিছে, হেরা এলাকার ক্ষমতাশালী। হেই কথা কইয়া কি আবার নতুন ঝামেলায় পড়মু? রুকন উদ্দিনের মতো এ এলাকার অনেকেই দিলুর প্রতারণার শিকার। ভোলানাথপুর গ্রামের মৃত জয়নব আলীর ছেলে মো. ফকরুদ্দিন মিয়াও তিন কাঠার প্লট জালিয়াতির শিকার। এ স¤পর্কে তিনি বলেন, ‘আমাগো কপালে কেডা ক্যামনে আগুন দিছে, হেইডা এলাকার সবাই জানে। তাগো বিরুদ্ধে কথা কইয়া মামলা খাইতে চাই না। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, একই গ্রামের মৃত নায়েব আলীর ছেলে ইদ্রিস আলীর তিন কাঠা, মৃত মুনসুর আলীর ছেলে মো. জালাল উদ্দিনের তিন কাঠা, ফালু মিয়ার ছেলে মো. হারেজের তিন কাঠাসহ ২০টির বেশি প্লট এখন দিলুর হাতের মুঠোয়। ওদিকে ভোলানাথপুর গ্রামের মৃত আয়েস আলীর ছেলে ফিরোজ মিয়ার তিন কাঠা একটি প্লট জালিয়াতি করে নিয়েছে একই গ্রামের মৃত ফাইজুদ্দিনের ছেলে ওসমান আলী। জালিয়াতির প্রতিবাদ করায় সে উল্টো ফিরোজ মিয়ার বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে হয়রানি করেছে। ফিরোজ তার পরিবার নিয়ে জীবনযাপন করছেন চরম দুরবস্থার ভেতর। ধামচি গ্রামের প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ স¤পাদক মনিরুল হক খসরু, পর্শি গ্রামের প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি প্রয়াত সাদেক মোল্লার ছেলে সামসুল হক ও প্রতিরোধ কমিটির প্রচার স¤পাদক আলাউদ্দিন মুন্সীর ছেলে জাহিদুল ইসলাম জানান, প্রকল্প এলাকাজুড়ে রয়েছে কয়েকশ জমির দালাল। এর মধ্যে ৬৫-৭০ দালাল উপশহর প্রকল্প এলাকার আদি বাসিন্দাদের প্লট নানা কায়দায় হাতিয়ে নিয়ে ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। জমির প্রকৃত মালিকরা থাকার জায়গা হারালেও দালালরা প্রত্যেকেই প্লটের মালিক বনে গেছে।
ক্ষতিপূরণের টাকাও
দালালদের পকেটেঃ
স্থানীয় দালালচক্র তুলে নিয়েছে রূপগঞ্জের দাউদপুর ইউনিয়নের মাঝিপাড়া গ্রামের মাঝিপাড়া ইবতেদায়ি মাদ্রাসা, মসজিদ ও ঈদগাহ মাঠের ৬১ শতাংশ জমির ক্ষতিপূরণের টাকা! মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি হাজি আকিমউদ্দিন সর্দার বলেন, আমাদের এলাকা এখন জালিয়াতচক্রের আস্তানা। দালালদের পথে বসাচ্ছে তারা। ওরা মানুষের জমির বিল তুলে নিচ্ছে, কেউ বা ভুয়া কাগজপত্র বানিয়ে দখল করছে প্লট। জালিয়াতি করে আল্লাহর ঘর মসজিদ ও মাদ্রাসার টাকাও তুলে নিয়ে গেছে ওরা। গুতিয়াব গ্রামের আবদুল করিম মিয়ার ছেলে সাঈদ মিয়া বলেন, আমার জমির বিল জালিয়াতি করে তুলে নিয়েছে সমরউদ্দিন প্রধান সমু। আমরা প্লটও পাইনি। ভোলানাথপুর গ্রামের সুরুজ উদ্দিন মিয়ার ছেলে আবদুস সাত্তার মিয়ার সাত বিঘা জমি ও ভিটেমাটি ছিল ইউসুফগঞ্জ মৌজায়। পুরো জমিই সরকার অধিগ্রহণ করে; বিলও হয় জমির হিস্যা অনুযায়ী। কিন্তু সেই বিল আবদুস সাত্তার মিয়া তুলতে পারেননি। জালিয়াতি করে দালালরা বিল তুলে নেয়। ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি জমির প্লট থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন তিনি। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে তিনি বলেন, আমারে পথে ভিখারি করে ফেলেছে পূর্বাচল উপশহরের দালালরা। ওরা জালিয়াতি করে জমির বিল নিয়ে গেল, কীভাবে নিল, কারা নিল কিছুই জানতে পারি নাই। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, দালাল বাদল মিয়া ও ওসমান মিয়া প্রতারণা করে ভূমি অফিস থেকে ক্ষতিপূরণের টাকা হাতিয়ে নেয়।
আঙুল ফুলে কলাগাছ দালালদেরঃ
স্থানীয় দালালচক্রের ক্ষমতার অন্যতম উৎস রাজউকের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা। পূর্বাচল উপশহরের পরিচালক আহসান ইকবালসহ কয়েক কর্মকর্তার সহযোগিতায় দালালচক্রটি অসংখ্য স্থানীয় বাসিন্দাকে সর্বস্বান্ত করেছে। অনেকেই এখন পথের ফকির। শেষ পর্যন্ত জালিয়াতির অভিযোগে রাজউকের এই পরিচালকসহ চার কর্মকর্তা বরখাস্তও হন। কিন্তু দালালদের কিছু হয়নি। জালিয়াতি আর অনিয়ম করে তাদের অনেকেই বরং বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে বসেছেন, বড় বড় কো¤পানির মালিক বনে গেছেন। ভোলানাথপুর গ্রামের বৃদ্ধ সোলায়মান মিয়া বলেন, পূর্বাচলের কারণে শত শত মানুষ ফকির হইছে আর কিছু লোক আঙুল ফুলে কলাগাছ হইছে। দুই দশক আগেও যারা এলাকায় গুড় বেচে আর দর্জিগিরি করে, বাজারে সবজি বিক্রি করে সংসার চালাতথ হেরাই এখন ৩০টির বেশি প্লটের মালিক। দামি গাড়িতে চলে, সুন্দর দালানে থাকে। হেগো নাম নিলে আমাগো মুহে টেপ লাগাইয়া দিব। গোবিন্দপুরের আবদুর রহমান বলেন, পূর্বাচলে ছোট-বড় মিলিয়ে শতাধিক জমির দালাল আছে, যারা প্রত্যেকেই ১০ থেকে ৫০টির বেশি প্লটের মালিক। মাঝিপাড়া গ্রামের মিজানুর রহমান বলেন, জমি জালিয়াতি করে নেওয়া দালালদের বিরুদ্ধে কথা বলে অনেকেই জেলের ভাত খেয়েছেন। ওদের সরকারদলীয় নেতাদের সঙ্গেও স¤পর্ক ভালো। কেউ আবার সরাসরি যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।
জনপ্রতিনিধিদের ভাষ্যঃ
রূপগঞ্জ সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু হোসেন ভূঁইয়া রানু বলেন, প্লট জালিয়াতি নিয়ে প্রায়ই আমি বিচার-সালিশ করি। অনেকেই ভুয়া কাগজপত্রে ক্ষতিপূরণের টাকা হাতিয়ে নেয়। ইউনিয়ন পরিষদের কাছে বিচার নিয়ে এলে বিষয়টি আমরা সমাধানের চেষ্টা করি। কী বলব! অনেক দালালই মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আজ কোটিপতি হয়ে গেছে। এ রকম স্থানীয় দালালদের নাম জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমার কিছুই বলার নেই। এলাকার মানুষের কাছে গেলেই তারা বলবে। দাউদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নূরুল ইসলাম জাহাঙ্গীর বলেন, পূর্বাচলে এখন দালালদের রাজত্ব চলছে। আদি বাসিন্দাদের অনেকেই এদের প্রতারণার শিকার হয়ে পথে বসেছে। যারা প্লট পেয়েছিল, তাদের নানা ভুল তথ্য দিয়ে এরা সেসব প্লট কম দামে কিনে নিয়েছে। ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমেও অনেকের প্লট নিয়েছে। এদের সঙ্গে রাজউকের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তাও আছে। প্রশাসনের উচিত বিষয়টির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।
রাজউকের কর্মকর্তাদের বক্তব্যঃ
পূর্বাচল উপশহর প্রকল্পের উপপরিচালক ও রাজউকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আবদুল হামিদ মিয়া বলেন, অনেক আদিবাসীই প্লটের অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন, যারা পরে তা দালালদের কাছে এক লাখ কিংবা দুই লাখ টাকায় বিক্রি করে দিয়েছেন। এখন প্লটের মূল্যে বেশি দেখে বিক্রেতা আদি বাসিন্দারা অভিযোগ করছেন যে দালালরা জালিয়াতি করে প্লট হাতিয়ে নিয়েছে। কিন্তু আপনার প্লট আর আপনার অ্যাওয়ার্ড কপি যদি কাউকে না দেন, বিক্রি না করেন, তা হলে তো কেউ নিতে পারে না। আবার অনেক সহজ-সরল লোক আছেন, নিজেরা কিছু বোঝেন নাথ তারা স্থানীয় প্রতিবেশী কিংবা আত্মীয়র কাছে অ্যাওয়ার্ড কপি দিয়েছেন। এর ফলে তার প্লট হাতছাড়া হয়ে গেছে। এভাবে প্রকল্প এলাকায় অনেক দালাল হয়তো একাধিক প্লটের মালিক হয়ে থাকতে পারেন। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) দুর্নীতিবাজ চেয়ারম্যান জিএম জয়নাল আবেদীন ভূঁইয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, দেখুন, জমির দালালি এখন একশ্রেণীর মানুষের ব্যবসা। অনেকেই তাদের মাধ্যমে প্রতারিত হন। তবে রাজউকের কোনো কর্মকর্তা এসব জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকলে আমরা তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিই। যেমন পূর্বাচল উপশহরের পরিচালকসহ চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। যে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ ধরনের জালিয়াতি কিংবা দালাল সিন্ডিকেটের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগ উঠলে প্রাথমিক তদন্ত ছাড়াই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
দালালদের বক্তব্য ঃ
একাধিক প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে দালালদের বিরুদ্ধে। কিন্তু তারা সেসব মানতে নারাজ। যেমন হাবিবুর রহমান হারেজ বললেন, যারা এমন অভিযোগ করছে, তারা রেজিস্ট্রি করে জমি বিক্রি করে দিয়েছে। পরে এসব নিয়ে মামলা-মোকদ্দমাও হয়। এখন সেই ঝামেলা শেষ করা হয়েছে। উপজেলা চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় গণ্যমান্যরা বসে এসব সমস্যার সমাধান করেছেন। তিনি উল্টো জানতে চান, এখন কি কেউ নতুন করে কোনো অভিযোগ করেছে? তিনি বলেন, ‘এখনও যারা অভিযোগ করছেন, তারা হিংসা করে বলছেন। এদের কাজ হলো মিথ্যা বলে আমাদের সম্মানহানি করা। দিল মোহাম্মদ দিলুও তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, আমার প্রতিপক্ষরা এলাকার দরিদ্র মানুষকে দিয়ে অভিযোগ করিয়ে হয়রানির চেষ্টা চালাচ্ছে। পূর্বাচল উপশহর থেকে কত নামিদামি লোককে আমি প্লট কিনে দিয়েছি! সবাই জানে, আমি কোনো প্রতারণায় জড়িত নই। এটা ঠিক, আমি প্লট বেচাকেনার সঙ্গে আছি। কিন্তু কাউকে ঠকানোর প্রশ্নই আসে না। আমার বাবা ও চার ভাই পাঁচটি পেয়েছিলেন, আমি চারটা অ্যাওয়ার্ড কিনেছিলাম। সেই সুবাদে আমার চারটি প্লটও আছে। এক লাখ টাকায় অ্যাওয়ার্ড কিনেছি। এখন জমির দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেকে অভিযোগ করছে। কিন্তু সব অভিযোগই সত্য নয়। ওখানে একটা টাউট গ্রুপ আছে। তারা দু-একজন লোককে দিয়ে এসব অভিযোগ করাতে পারে।’

Advertisement
Advertisement

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here